বাংলায় প্রথম মহাভারত অনুবাদে ফুটে উঠেছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা

‘পরাগলি মহাভারত’ নামে এটি পরিচিত

মুর্শিদাবাদ চিত্রকলায় মহাভারত, বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের আরেক নিদর্শন

মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের এক সমৃদ্ধ ধারা ছিল অনুবাদ সাহিত্য। আমাদের সংস্কৃতি যে প্রাগাধুনিক যুগে কোনোভাবেই বদ্ধ ছিল না, অনুবাদ সাহিত্যই তার প্রমাণ। মূলত সংস্কৃত, আরবি, ফার্সি ও হিন্দি ভাষার সাহিত্য থেকে তখন বাঙালি কবিরা মণিরত্ন তুলে এনে আমাদের উপহার দিয়েছেন। তবে, সেই অনুবাদ ছিল ভাবানুবাদ, কখনই আক্ষরিক অনুবাদ নয়। মূল কাহিনিকে ভিত্তি করে বাংলার কবিরা নিজেদের মনের মাধুরী মিশিয়ে তা পরিবেশন করেছেন। অনেক ক্ষেত্রেই আবার একই গ্রন্থের অনুবাদ করেছেন একাধিক কবি। যেমন প্রাচীন মহাকাব্য রামায়ণের অনুবাদ করেছিলেন কৃত্তিবাস ওঝা, কৈলাস বসু, ভবানীদাস, জগৎরাম রায় এবং আরও কয়েকজন। 

গৌড়েশ্বরের নির্দেশে বাংলায় প্রথম রামায়ণ অনুবাদ করেছিলেন কৃত্তিবাস ওঝা। ইতিহাসবেত্তাদের একাংশ বলেন, এই গৌড়েশ্বর ছিলেন রুকনউদ্দিন বরবক শাহ। আবার কেউ বলেন, বাংলার সুলতান জালালউদ্দিন মুহম্মদ শাহ ছিলেন কৃত্তিবাসের পৃষ্ঠপোষক। আবার এরকম মতও প্রচলিত আছে যে এই গৌড়েশ্বর ছিলেন রাজা গণেশ। আর পরাগল খানের উৎসাহে বাংলায় প্রথম মহাভারত অনুবাদ করেছিলেন কবীন্দ্র পরমেশ্বর।

বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের লস্কর বা সেনাপতি ছিলেন পরাগল খান। হুসেন শাহ চট্টগ্রাম জয় করে পরাগলকে সেখানকার শাসনকর্তা নিয়োগ করেন। পরাগলের সভাকবি ছিলেন কবীন্দ্র পরমেশ্বর। একবার পরাগল খান মহাভারতের যুদ্ধের কাহিনি শুনে মুগ্ধ হন। সভাকবি পরমেশ্বরকে তিনি নির্দেশ দেন, একদিনে শোনার উপযোগী সংক্ষিপ্ত আকারে মহাভারত অনুবাদ করতে হবে। কবীন্দ্র পরমেশ্বর মহাভারতের তত্ত্বকথাগুলি বাদ দিয়ে মূল কাহিনিগুলিই অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর এই গ্রন্থের নাম ‘পাণ্ডববিজয়’ অথবা ‘বিজয়পাণ্ডব’। পরাগল খানের নাম অনুসারে এটি ‘পরাগলি মহাভারত’ হিসেবেও পরিচিত। সুকুমার সেনের মতে এই কাব্য রচনার সময়কাল ১৬ শতকের দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় দশক। 

কবীন্দ্র পরমেশ্বর তাঁর কাব্যে সুলতান হুসেন শাহ এবং পরাগল খানের স্তুতি করেছেন। কিন্তু নিজের সম্পর্কে বিশেষ কিছুই বলেননি। কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, তাঁর আসল নাম পরমেশ্বর, তাঁকে ‘কবীন্দ্র’ উপাধি দিয়েছিলেন পরাগল খান। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, ডঃ সুশীলকুমার দে, বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতো পণ্ডিতেরা মনে করেন, মহাভারতের আরেক অনুবাদক কবি শ্রীকর নন্দীরই উপাধি ছিল ‘কবীন্দ্র পরমেশ্বর’। পরাগলের ছেলে ছুটি খানের নির্দেশে শ্রীকর নন্দী ‘অশ্বমেধ পর্ব’-র অংশ নিয়ে বাংলায় মহাভারত রচনা করেন, যা ‘ছুটি খানি মহাভারত’ নামে পরিচিত। সুকুমার সেন জানিয়েছেন, কবীন্দ্র পরমেশ্বর এবং শ্রীকর নন্দী দু’জন ভিন্ন ব্যক্তি। গৌরীনাথ শাস্ত্রীর মতে, কবীন্দ্র ছিলেন কোচবিহারের রাজা নরনারায়ণের মন্ত্রী। তাঁর আসল নাম বাণীনাথ। ‘কবীন্দ্র’ তাঁর উপাধি। মন্ত্রী ছিলেন বলে তিনি ‘কবীন্দ্রপাত্র’ নামেও পরিচিত হন। সুকুমার সেনের মতে, কবীন্দ্র পরমেশ্বর উত্তরবঙ্গেরই লোক। 

বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতি চিরকালই সম্মিলন এবং সম্প্রীতির ঐতিহ্য বহন করছে। মুসলমান শাসক পরাগল খানের নির্দেশে বাংলায় প্রথম মহাভারত অনূদিত হওয়া তাই কোনোভাবেই আশ্চর্যের বিষয় নয়। তবে, বাংলায় সবচেয়ে জনপ্রিয় মহাভারত অনুবাদক ছিলেন কবি কাশীরাম দাস। 

তথ্যসূত্র –
১. বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস (আদি হইতে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত), সুকুমার সেন।
২. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, অধ্যাপক মাহবুবুল আলম।  

 

Developed by DXDasia