
মায়ের হাতের স্নেহ কি কোনও আক্ষরিক প্রদীপ দিতে পারে কখনও
মা-ও যেন কবিতা লেখেন / জয় গোস্বামী
পাঁচপ্রদীপের শিখার ওপর হাত
পাতায় নিয়ে সামান্য ওমটুকু
তোদের মাথায় ছোঁয়াই খোকাখুকু
কিন্তু কখন কেউ জানে না কবে
এ হাতখানি পঞ্চপ্রদীপ হবে
মাথার ওপর থমকে দাঁড়ায় রাত
টেবিলবাতির তলায় খোকাখুকুর
স্বাধীন বই, চিরস্বাধীন মুকুর
বইয়ের দুটি হাতের মধ্যে ওম
ছেলেমেয়ের মনের ওপর থেকে
দূর হয়ে যা যক্ষ রক্ষ যম!
ভোর-ভোর ঘুম থেকে উঠে পড়েছে বাবা। বাগান বলতে যে একফালি মাটি, সেখানকারই দু’তিনটে কলাগাছ থেকে কেটে এনেছে পাতা। সকাল ছ’টায় কলে জল এলে ধুয়েমুছে দিয়ে আসবে রান্নাঘরে। ওদিকে রান্নাঘরে ঠাম্মার তখন হাজারো ব্যস্ততা। নারকেলের তক্তি আর তিলের নাড়ু আগেই করে রেখেছিল, এখন খিচুড়ি চাপিয়ে দিয়েছে উনোনে। পাশেই আরেকটা কাঁসার গামলায় বিভিন্ন সবজি কেটে রাখা। নারকেল কুড়নোর একরকমের বঁটি হয়, সেটা পা দিয়ে চেপে একটা মালা মন দিয়ে কুড়ে যাচ্ছে তখন। নারকেল ঘণ্ট হবে। আর আমি ঘুম-ঘুম চোখে দাঁড়িয়েছি এসে রান্নাঘরের দরজায়, কেননা কুড়নোর সময় নারকেলের কোনও ছালি যদি বারকোশের বাইরে লাল মেঝেতে ছিটকে পড়ে, সেটা আমার বরাদ্দে। মাটিতে পড়ে যাওয়া জিনিস ঠাকুরকে দিতে নেই। ঠিক তেমনিই আলাদা করে রাখা কিছু কড়াইশুঁটি, হাত বাড়িয়ে নিতে যেতেই ‘ছুঁইস না ছুঁইস না’ বলে ঠাম্মা আলগা করে ওগুলো ফেলে দিল আমার হাতের তালুতে। টপাটপ মুখে পুরে উঁকি দিলাম পশ্চিমঘরে, মা সেখানে স্নান-টান সেরে বইপত্র গুছিয়ে রাখছে, হলুদ মালা পড়ানো হয়ে গেছে কখন, দুটো দোয়াতে ঘন দুধ আর খাগের কলম ভরে রাখা হয়েছে মূর্তির দু’পাশে, কোশাকুশি আর মঙ্গলঘট ঠিক সামনেটিতে। আমি আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে একটু দূরে খাটে গিয়ে বসলাম, দেবীর আশীর্বাদমুদ্রার সোজাসুজি। আজ পড়তে বসতে বলবে না কেউ। আজ সরস্বতীপুজো।
উপরের কবিতাটির সঙ্গে কোনও সম্পর্কই নেই এই ঘটনার। তবু কবিতাটি পড়তে পড়তে আমার কেন জানি মনে পড়ল এসব। কেন? খুঁজতে খুঁজতে দেখি, কারণ পঞ্চপ্রদীপ। এখনও আছে সেই প্রদীপটা, পিতলের, মাঝেমধ্যে বের করা হয় পুজোর সময়। রং অনেকটাই ময়লা হয়ে এসেছে, তবু পঞ্চপ্রদীপ তো! গড়নটাও অদ্ভুত। একটা মেয়ে, দেবদাসী অথবা নর্তকী, হাত দিয়ে ধরে আছে প্রদীপের পাঁচটা মুখ। পাঁচটা মুখ থেকে পাঁচরকমের আলো। কোনওটার সলতে একটু বেশি ভিতরে চলে গেছে, কোনওটার তেলে টান পড়েছে। আমি ধূপকাঠি দিয়ে সেই সলতে ঠেলে-ঠেলে আবার বের করে দিতাম। ওই প্রদীপ দিয়ে যখন আরতি করতেন অদ্যুত গোঁসাই, কিংবা পরের দিকে বাবা, বাঁ-হাতে ঘণ্টা নড়ছে, আর ডানহাতে দেবীর উদ্দেশ্যে কী অদ্ভুত পারদর্শিতায় ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে আরতি, আমি খাটের ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে তাল-ছন্দের তোয়াক্কা না করে তারস্বরে কাঁসর পিটিয়ে কবজি ব্যথা করে ফেলতাম। লোকজন যেতে-যেতে দক্ষিণদিকের খোলা জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখত, কী তাণ্ডবই না হচ্ছে ঘরের ভিতর! পুজো শেষ হলে পর, মা বা ঠাম্মা, আমার সামনে নিয়ে আসত সেই পঞ্চপ্রদীপের আলো। একেবারে ছোটবেলায় বুঝতাম না, কী করতে হয় ওটা দিয়ে। কখনও মা, কখনও ঠাম্মা আগুনের আঁচ নিয়ে বুলিয়ে দিত মাথায়। বড় ভালো লাগত এই আচারটুকু। প্রদীপের আশীর্বাদ নয়, তাদের আদর যদি ওমের অছিলাতেই মাথায়-কপালে ছুঁয়ে যায়, ক্ষতি কী! একটু বড় হয়ে নিজেই হাতের মুঠোয় লুকিয়ে ফেলতাম সেই ওম, আর গুঁজে দিতাম চুলের ফাঁকে-ফাঁকে, কোত্থাও যেন না পালাতে পারে!
জয় গোস্বামীর কবিতাটি পড়তে পড়তে নিজের চেনাজানা দৃশ্যগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ল তাই। জয়ও, কী আশ্চর্য কবিত্বে আসল করে তুললেন মায়ের আদরটুকুনি। কবিতার প্রথম লাইন, ‘পাঁচপ্রদীপের শিখার ওপর হাত’। শুধু ছন্দরক্ষার খাতিরেই ‘পাঁচপ্রদীপ’ লিখলেন তিনি? আমার তা মনে হয় না। তাঁর মতো কবি চাইলে অনায়াসেই ‘পঞ্চপ্রদীপ’ লিখে অন্য কোনও দিক দিয়ে ব্যালেন্স করতে পারতেন লাইনটি। তাহলে ‘পাঁচপ্রদীপ’ লিখলেন কেন? কারণ এখানে প্রদীপ তো শুধু প্রদীপই! প্রদীপের শিখার ওপর হাত, খুব স্বাভাবিক একটা দৃশ্য। ঠিক এর পরের স্তবকেই, সেই প্রদীপ থেকে ওম পুষে নিয়ে মায়ের হাত স্থাপিত হল সন্তানের মাথায়। সম্পূর্ণ হল বৃত্ত। ‘এ হাতখানি পঞ্চপ্রদীপ হবে’ – সন্তানের মাথায় মায়ের হাতের যে ঘুরপাক, তা যেন আরতির মতোই শৈল্পিক। হাতই যখন পঞ্চপ্রদীপ হয়ে উঠছে, প্রথমে ‘পাঁচপ্রদীপ’ বললে সমস্যা নেই তো! মায়ের হাতের স্নেহ কি কোনও আক্ষরিক প্রদীপ দিতে পারে কখনও!
এর পরের স্তবকে একটাই লাইন – ‘মাথার ওপর থমকে দাঁড়ায় রাত’। মনে হল, আমাদের পশ্চিমঘরে যেন লক্ষ্মীপুজো বা জন্মাষ্টমীর পুজো চলছে। সন্ধে যখন রাতের দিকে এগোয়, এ-দুটো পুজোই সাধারণত পঞ্চপ্রদীপ জ্বালানোর কারণ হয়েছে। পূর্ণিমায় সত্যনারায়ণ পুজো বা পৌষসংক্রান্তির পুজো বা ঠাম্মার দুধপুকুর ব্রতের সময় পঞ্চপ্রদীপ জ্বালাতে দেখিনি কোনওদিন। আমি যদি জন্মাষ্টমী ধরেই এগোই, শেষ-সন্ধের দিকে পড়াশুনায় খুব একটা যে ফাঁকি দিতে পারতাম, তা নয়। পরেরদিন স্কুল থাকলে বই খুলে বসতেই হত। কিন্তু তখন কী আর পড়তে ইচ্ছে করে! পাশের ঘর থেকে তালের বড়ার গন্ধ ভেসে আসছে, সে-সময় বিজ্ঞান পড়া বড় যন্ত্রণার। কখনও-কখনও তাই সেই বিজ্ঞান বইয়ের নিচেই লুকিয়ে রাখতাম ভূতের গল্প, কিংবা ফেলুদার কোনও পাতলা বই। বিজ্ঞান বইয়ের কোণ তুলে-তুলে সেইসব অ্যাডভেঞ্চার খুব সাবধানে পড়তে হত, কান খাড়া রাখতাম সবসময়, যাতে কারোর পায়ের শব্দ পেলেই চটজলদি ‘পড়াশুনা করছি’ দেখাতে পারি। ‘টেবিলবাতির তলায় খোকাখুকুর / স্বাধীন বই, চিরস্বাধীন মুকুর’ – লুকিয়ে পড়া সেই ভূতের গল্প বিজ্ঞানের একঘেয়েমি ছিঁড়ে যে স্বাধীনতা নিয়ে আসত, আমার ভীতু স্বভাবকে যেভাবে শব্দআয়নার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিত, তা কীভাবে বুঝতে পারলেন জয়? ‘বইয়ের দুটি হাতের মধ্যে হোম’ – এখানে হোম মানে কী ধরব, যজ্ঞ? হ্যাঁ, তা একরকম যজ্ঞই তো বটে! এ-যজ্ঞে আহ্বান না পেলে হাজির হব কী করে! কিংবা, বইয়ের দুটো মলাটের মধ্যে যেন মিশে ছিল জন্মান্তরের রহস্য, যা লুকিয়ে পড়তে হচ্ছে বলেই আরও উত্তেজনার। আমি সে-যজ্ঞকুণ্ডে ঝাঁপ দিয়েছি কতবার। কখনও বা বিভূতি মেখে নিয়েছি কপালে।
‘ছেলেমেয়ের মনের ওপর থেকে
দূর হয়ে যা যক্ষ রক্ষ যম!’
জামাইষষ্ঠীর দিন, আমাদের পরিবারে একই সঙ্গে প্রচলন আছে ‘সন্তানষষ্ঠী’র। জানি না, অন্যান্য পরিবারেও এটা হয় কিনা। সন্তানের মঙ্গলকামনার জন্য মায়ের পক্ষ থেকে এই আচার। একটা পাত্রে জলে ভিজিয়ে রাখা কাঁচা সুপুরির পুঁটুলি, যার মাথায় দুর্বার ছড়া বাঁধা, সেখান থেকে দুর্বা ছিঁড়ে মাথায় দেয়ার পর ওই জল থেকে কয়েকটা চালের দানা তুলে আমার হাতে দেয় মা, টুকুস করে গিলে নিই। এরপর ডানহাতে ষষ্ঠীর সুতো বেঁধে দেয় আর তালপাতার পাখা দিয়ে হাওয়া করে। ‘দূর হয়ে যা যক্ষ রক্ষ যম’ পড়ে আমার এই অনুষ্ঠানটার কথা মনে পড়ল কেন জানি। মায়ের স্নেহ আর প্রার্থনা মিশে আছে লাইনটির অক্ষরে-অক্ষরে। একই সঙ্গে, ‘যম’ শব্দটা শুনে আমার মনে পড়ল ভাইফোঁটার সকাল। সাধারণত ফোঁটা দেয়ার সময় যে চার লাইন বলে দিদিরা, তা হল – ‘ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা / যমের দুয়ারে পড়ল কাটা / যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা / আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা’। ঠাম্মা এবং একমাত্র ঠাম্মাই, এই চারটে লাইন বলার আগে ময়মনসিংহের ভাষায় আরও বেশ কিছু লাইন বলত, একটা স্তবক যেন বা। আমার পুরোটা মনে নেই। শুধু শুরু আর শেষের লাইনটা মনে আছে। শুরুতে ‘স্বর্গে হুলুস্থুলু, মর্ত্যে জোকার’ আর শেষে ‘যম না লইয়ো ভাইরে আমার’। ভাইফোঁটার গতানুগতিক চারটে লাইনের থেকেও আমার বুকে বেশি মোচড় মারে ‘যম না লইয়ো ভাইরে আমার’ লাইনটা। যেটা আমায় ঠাম্মা ছাড়া আর কেউ বলেনি কখনও, ভবিষ্যতেও কারোর কাছে শুনতে পাওয়ার আশা নেই আর। অথচ যতবারই কোথাও পড়ি বা শুনি ‘যম’ শব্দটা, আমার মনে পড়ে কাঁপ-কাঁপা গলায় ঠাম্মার প্রার্থনা। কপালে আবির, চন্দন আর ঘি মিলেমিশে ঠান্ডা-ঠান্ডা একটা স্পর্শ পাই যেন।
কবিতাটি আমায় এভাবে স্মৃতির অলিগলিতে ঘুরিয়ে নিয়ে এল কেন? পুরনো সব মনে পড়ে যাওয়ায় ব্যথাও জাগে যে! ফিরে না-আসার ব্যথা। মায়ের গণ্ডি পেরিয়ে ঠাম্মা পর্যন্ত আমাকে পৌঁছে দিলেন জয়, একটিমাত্র কবিতার হাত ধরে।
আজ আমি সত্যি-সত্যি বিশ্বাস করি – জয় গোস্বামী হলেন সেই পুরোহিত, আঙুলের ডগায় রক্তচন্দন আর শ্বেতচন্দন নিয়ে ছিটিয়ে দেবেন ফুলের ওপর, আর ‘এতে গন্ধপুষ্পে’র যোগ্য হয়ে উঠবে তারা…
