
সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ৩৯
রাজ্যের গ্রাম কেন্দ্রিক এলাকার শিক্ষা প্রসারে, মেয়েদের স্কুল শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষার উন্নতির লক্ষ্যে রাজ্য সরকারের ভূমিকা প্রশংসনীয়। কন্যাশ্রী প্রকল্প অনেকাংশেই রাজ্যের মেয়েদের শিক্ষাক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে সহায়কের ভূমিকা পালন করছে। তাছাড়া রয়েছে স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড। স্কুল ছাত্রছাত্রীদের পোশাক, জুতো, বই থেকে শুরু করে মিড ডে মিল সবই এখন স্কুলে উপলব্ধ। তার পরেও রাজ্যের কোনও কোনও জেলার কোনও কোনও অঞ্চলে শিক্ষার প্রতি সেখানকার মানুষদের অনীহা, আর্থিক দুরাবস্থা সেই অঞ্চলের মানুষদের শিক্ষাবিমুখ করে রেখেছে। তবে সর্বত্র এই ছবিটা যে একই রকম তা নয়। অনেক অঞ্চলেই স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা অভিভাবকদের কাছে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলে, সমস্যা জেনে, সেইসব পরিবারের ছেলেমেয়েদের স্কুলমুখী করছেন।
সেরকমই একটি স্কুল দক্ষিণ ২৪ পরগনা-র ডায়মন্ড হারবার এলাকার পঞ্চগ্রাম প্রমথনাথ হাইস্কুল। স্কুলের ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ১৭০০-র চাইতে কিছু বেশি। সরকার অনুমোদিত শিক্ষক-শিক্ষিকা মিলিয়ে সংখ্যা ১৮ জন এবং অশিক্ষক কর্মচারি ১ জন। এছাড়া প্যারা টিচার ৪ জন, ৫ জন পার্ট-টাইম টিচার এবং একজন আইসিটি অর্থাৎ কম্পিউটার শিক্ষক। শুধু শিক্ষকতার চাকরিই নয়, তার পাশাপাশি এই সময়ে দাঁড়িয়ে পঞ্চগ্রাম প্রমথনাথ হাইস্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা সামাজিক দায়িত্বও পালন করে চলেছেন। অভিভাবকদের এই স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা বোঝাচ্ছেন, কেন তাঁদের সন্তানদের স্কুলে পাঠান প্রয়োজন।

পঞ্চগ্রাম প্রমথনাথ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আবু শাহিদ হালদারের সঙ্গে। তাঁর কথায় অনেকটা আক্ষেপ ধরা পড়ল। তিনি বললেন, “সরকার সহায়তা দেওয়ার পরও এই গ্রামের স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের একটা অংশ যেন স্কুলে আসতে চায় না। সংখ্যাটা খুব বেশি নয়। তবে স্কুলে আসতে না চাওয়ার ক্ষেত্রে ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্ররা যেন একটু বেশি মাত্রায় সক্রিয়। দেখা যাচ্ছে, মাধ্যমিক পাশ করার পর অনেক ছাত্ররাই পড়া ছেড়ে দিচ্ছে। আমরা বছরে তিন থেকে চারবার অভিভাবকদের সঙ্গে এই বিষয়গুলি নিয়ে বৈঠক করি। পাড়ায় পাড়ায় মাইক নিয়ে স্কুলে পড়ার উপযোগিতা সম্পর্কে প্রচার চালাই। তার পরেও কোথায় যেন একটা শিক্ষার প্রতি অনীহা থেকেই যাচ্ছে।”
প্রধান শিক্ষকের মতে, এই অনীহার নেপথ্য কারণ প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়ারা এই স্কুলে বেশি ভর্তি হয়। এদের অভিভাবকরা লেখাপড়া করেননি। তাছাড়া আর্থিক অসামর্থও এই শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরি না হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়কের ভূমিকা পালন করে। তবে পঞ্চগ্রাম প্রমথনাথ হাইস্কুলের ১৭০০-র বেশি ছাত্রছাত্রীর মধ্যে লেখাপড়ার প্রতি অনীহা বা মাধ্যমিকের পরে আর পড়তে না চাওয়ার সংখ্যাটা শতকরা হিসাবে ধরতে গেলে ২ থেকে ৩ শতাংশ। কিন্তু এখন স্কুল শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলা মাধ্যম সরকার পোষিত স্কুলে কোনও খরচই সেই অর্থে লাগে না। “শুধু স্কুলে এলেই একজন ছাত্র বা ছাত্রীকে পড়িয়ে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দিতে পারি, কিন্তু সেটা সব ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ সাফল্য আমরা পাই না। সেটাই আক্ষেপ। এক্ষেত্রে ছেলেরা মাধ্যমিকের পর ছোটোখাটো কাজে ঢুকে পড়ছে পারিবারিক আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে, অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে এ ছাড়া বিকল্প পথ খোলাও থাকে না। তবে ছাত্রীদের ক্ষেত্রে যেহেতু কন্যাশ্রীর মতো প্রকল্প আছে, তাই মেয়েদের মধ্যে চট করে স্কুল ছেড়ে দেওয়া, বাড়ি থেকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া – এসবের হার কমেছে। এটা একটা ভালো দিক।” বলেন প্রধান শিক্ষক।

বড়ো স্কুল ভবন, ২৩/২৪টি শ্রেণিকক্ষ, ভূগোলের ল্যাবরেটরি, মাল্টি জিম, খেলার মাঠ, সিসি টিভির নজরদারি, সোলার পাওয়ার জেনারেশনের ব্যবস্থা সবই স্কুলে আছে। তবে এই সব জিনিসকে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত হওয়া বা সন্তান সন্ততিদের স্কুলে যেতে আগ্রহী করার তাগিদটা তুলনামূলকভাবে পঞ্চগ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে এখনও কম। এলাকাটা প্রধানত কৃষিভিত্তিক। যারা পড়তে আসে পঞ্চগ্রাম প্রমথনাথ হাইস্কুলে তাদের বড় অংশই পিছিয়ে পড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ৷ তাদের বাবা, মা উভয়ই শ্রমজীবী। সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের যারা এই স্কুলে পড়তে আসে তাদের সংখ্যাটা কম। তারাও পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষ। কাজেই লড়াইটা এখানেই।
প্রধান শিক্ষক বলছিলেন, “আমরা অভিভাবকদের স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাই। তাদের সঙ্গে আলাদা করে বৈঠক করি। লক্ষ্য একটাই অভিভাবকদের বুঝিয়ে তাঁদের সন্তানদের স্কুলমুখী করা এবং স্কুল শিক্ষায় অভ্যস্ত করে উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে দেওয়া। সেটা যে হয়নি বা হয় না তা নয়। আমাদের অনেক ছাত্রছাত্রী এখন প্রতিষ্ঠিত, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে। আমরা সবসময় চাই ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়া ছাড়াও অন্য ক্ষেত্রে তাদের প্রতিভা বা যোগ্যতার উন্মেষ ঘটাতে। স্কুলে মেয়েদের ফুটবল খেলা সেই লক্ষ্য নিয়েই শেখানো শুরু হয়েছে। ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে মেয়েদের ফুটবল টুর্নামেন্টে আমাদের স্কুলের মেয়েরা খেলেছে। ইন্টার স্কুল ফুটবল টুর্নামেন্টে নাম দিচ্ছে, খেলছে। স্কুলের ছেলেদের মধ্যেও স্পোর্টসের প্রতি আগ্রহ বাড়াবার জন্য আমরা যথেষ্ট উদ্যোগ নিচ্ছি। জেলা স্তরে দৌড় প্রতিযোগিতায় পুরস্কারও পেয়েছে আমাদের স্কুলের এক ছাত্র।”
১৯৫৯ সালে স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য পঞ্চগ্রাম কায়স্থ পাড়ার প্রমথনাথ দেব স্কুল তৈরির জন্য জমি দিয়েছিলেন। তাই তাঁর নামেই স্কুলের নাম পঞ্চগ্রাম প্রমথনাথ হাইস্কুলের নামকরণ হয়েছে। প্রথমে প্রথমিক স্কুল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৯৮১ সালে অষ্টম শ্রেণি, ২০০০ সালে মাধ্যমিক ও ২০১২ সালে উচ্চমাধ্যমিকে স্কুল হিসাবে এই স্কুল অনুমোদন পায়।

এখন ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ ছাত্রছাত্রী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। চলতি বছরে প্রথম বিভাগে এবং স্টার পেয়ে মাধ্যমিক পাশ করেছে ৫ থেকে ৭ জন ছাত্রছাত্রী। পঞ্চগ্রাম প্রমথনাথ হাইস্কুলের শিক্ষকরা তাই শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য শিক্ষকতার চাকরি করছেন তা নয়, তাঁরা পঞ্চগ্রামের শ্রমজীবী মানুষগুলোকে বোঝাচ্ছেন, হাড়ভাঙা খাটুনির থেকে নিজেদের এবং পরবর্তী প্রজন্মকে বার করে নিতে হলে শিক্ষার প্রতি নিজেদের আগ্রহী হতে হবে, সন্তানদের স্কুলমুখী করতে হবে। স্কুলে এখন উচ্চমাধ্যমিকে শুধু কলা বিভাগ পড়ান হয়। বাণিজ্য ও বিজ্ঞান বিভাগ চালু এখনও হয়নি, তবে সেই ইচ্ছা নিয়ে স্কুলকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সবসময় চেষ্টা চালাচ্ছেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক, ও সহশিক্ষক-শিক্ষিকারা। তাঁদের আশা একটাই – শিক্ষার মধ্যদিয়ে কঠিন পরিশ্রম করে বেঁচে থাকা মানুষগুলোকে মুক্তির পথ দেখানো।
তথ্যসূত্র : আবু শাহিদ হালদার, প্রধান শিক্ষক, পঞ্চগ্রাম প্রমথনাথ হাইস্কুল,
স্থানীয় বাসিন্দা
ছবি: সংগৃহীত
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।
