
১৯৭১ সালের এই দিনেই স্বাধীনতার ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু
সফিক রহমান
২৬ মার্চ ১৯৭১। মহান স্বাধীনতা দিবস। লাখো শহিদের রক্তে রঞ্জিত জাতীয় দিবস। বিশ্বের বুকে লাল সবুজের পতাকা ওড়ানো দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনতা পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনা করে। আর এই দিনেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছিল। তাই ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। দেশমাতৃকাকে মুক্ত করার লক্ষ্যে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় বিজয়ের লাল সূর্য।
এই দিনটি আসার পেছনের ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখতে পাই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার মানুষ তথা বাঙালিদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু করে। প্রথমেই বাঙালিদের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানে। সমগ্র পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে এককভাবে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়। গর্জে ওঠে বাঙালি, গড়ে তুলে ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে বাংলার দামাল তরুণদের জীবন দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বাঙালিদের রাজনৈতিক ঐক্য যুক্তফ্রন্ট বিজয় অর্জন করে। কিন্তু পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী ষড়যন্ত্র করে অল্পকালের মধ্যেই ভেঙে দেয় প্রাদেশিক যুক্তফ্রন্ট সরকার। অল্পকালের মধ্যেই গড়ে ওঠে ছয়দফা ও এগার দফা আন্দোলন। আন্দোলন ক্রমেই গণআন্দোলনের রূপ লাভ করে। আর এরই মধ্যে আগুনে ঘি ঢাকার মতো ঘটনা ছিলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সংগঠিত হত্যাকাণ্ড। এবার গণআন্দোলন গণবিস্ফোরণে পরিণত হয়। আন্দোলনের মুখে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পদত্যাগ করলেন। ক্ষমতায় আসলেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসেই নির্বাচন দিলেন।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বাঙালিদের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু বিজয়ী দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয় না। শুরু হয় ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র। ইয়াহিয়া তথা সরকারপক্ষ আলোচনায় বসতে চাইলেন এবং বসলেন। এবার শুরু হল আলোচনার নামে কালক্ষেপণ। এতসব ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এ বিশাল জনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে বললেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। ২৫ মার্চ রাতে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর। পৃথিবীর ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাকাণ্ড চালায় অপারেশন সার্চলাইট নাম দিয়ে। তখন থেকেই এ দিনটি স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। ১৯৮০ সালের ৩ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার দিনটিকে জাতীয় দিবস হিসেবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
২৬ মার্চ, রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের সূচনার দিন। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক দুঃশাসন আর শোষণ-বঞ্চনার অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়ার দিন। ১৯৭১ সালে এই দিনে দেশকে হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত করার ডাক এসেছিল। শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানি শোষকের হাত থেকে প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করতে সেদিন থেকেই রণাঙ্গণে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাংলার দামাল ছেলেরা। এরই ধারাবাহিকতায় ৯ মাস বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা আর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল আমাদের স্বাধীনতা।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা শুরুর পরই মধ্যরাতে অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির অবিসংবাদিত নেতা স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ধানমন্ডির বাসভবন থেকে বঙ্গবন্ধুর সেই ঘোষণা তৎকালীন ইপিআরের ওয়্যারলেস থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হয় দেশের বিভিন্ন জেলায়। বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন – ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিতে পিলখানার ইপিআর ঘাঁটি, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে এবং শহরের লোকদের হত্যা করছে। ঢাকা, চট্টগ্রামের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে। আমি বিশ্বের জাতিগুলোর কাছে সাহায্যের আবেদন করেছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সাথে মাতৃভূমি মুক্ত করার জন্য শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ্র নামে আপনাদের কাছে আমার আবেদন ও আদেশ দেশকে স্বাধীন করার জন্য শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। কোনো আপস নেই, জয় আমাদের হবেই। আমাদের পবিত্র মাতৃভূমি থেকে শেষ শত্রুকে বিতাড়িত করুন। সকল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিক ও স্বাধীনতাপ্রিয় লোকদের এ সংবাদ পৌঁছে দিন। আল্লাহ আপনাদের মঙ্গল করুন, জয় বাংলা।’
আরও পড়ুন
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ
২৭ মার্চ সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান, বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা পাঠ করেন।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি হওয়ার আগমুহূর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণার একটি লিখিত বাণী চট্টগ্রামের জহুর হোসেনসহ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। চট্টগ্রাম বেতারকেন্দ্র এ সময় বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। ২৬ মার্চ কালুরঘাট ট্রান্সমিশন সেন্টার থেকে সর্বশক্তি নিয়ে হানাদার বাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য আহ্বান জানানো হয়। উল্লেখ্য যে, এ ঘোষণা প্রচারের সময় বেতার কেন্দ্রের নাম ছিল স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র কিন্তু পরে বিপ্লবী শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। এ বেতার কেন্দ্র থেকেই ২৭, ২৮ ও ৩০ মার্চ পর পর তিনটি ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে স্বাধীনতার কথা জানিয়ে দেওয়া হয়। শুরু হয় স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, সেনা ছাউনিগুলোতেও।
হানাদারদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করতে প্রতিরোধ শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। কিন্তু ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধুর তাৎপর্যপূর্ণ নির্দেশনামূলক উদাত্ত আহ্বানে গোটা জাতি মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে প্রত্যক্ষভাবে।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বিকেল ৩টায় রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিব এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। দেশের ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে শেখ মুজিবের এই ভাষণ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রেসকোর্সের বিশাল জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘোষণা করেন : এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। রক্ত যখন দিয়েছি তখন রক্ত আরও দেব, দেশকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, আমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।
এ ভাষণের পরিপ্রেক্ষিতে ৮ মার্চ থেকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। ৯ মার্চ পল্টন ময়দানে জনসভায় জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী চূড়ান্ত স্বাধীনতার লক্ষ্যে সংগ্রাম সূচনার আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশে জাতীয় সরকার গঠনের দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ বাংলাদেশে অসামরিক প্রশাসন চালু করার জন্য শেখ মুজিব ৩৫টি বিধি জারি করেন। অবস্থা খারাপ দেখে ঐদিন ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন। ৬ মার্চ রাষ্ট্রপতির ভবনে ইয়াহিয়া খান ও শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। আলোচনার শুরুতে ইয়াহিয়া পূর্বে সংগঠিত সকল ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেও আলোচনার গতি সন্তোষজনক না মনে করে তিনি টিক্কা খানকে কর্মপন্থা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন। আলোচনার নামে ১০ দিন ধরে চলতে থাকে সময়ের অবক্ষয় ও প্রহসন।
বলাবাহুল্য, এ সময় সামরিক বাহিনী সর্বাত্মক আন্দোলনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল। কড়া সামরিক প্রহরাধীনে ঢাকা বিমান বন্দরে ও চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে নতুন নতুন পাকিস্তানি সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র আনা হচ্ছিল। ২৩ মার্চ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ড. কামাল হোসেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সহযোগীদের হাতে তুলে দেন খসড়া শাসনতন্ত্র। এই শাসনতন্ত্রে দ্বি-খণ্ডিত পাকিস্তানের কথা উল্লেখ ছিল। ঢাকায় পাকিস্তানি পতাকার পরিবর্তে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য চাপ দিতে থাকে। দেশের অস্বাভাবিক পরিস্থিতিই শেখ মুজিবের জন্য ক্ষেত্র তৈরি করে দিচ্ছিল এবং তিনি অখণ্ড পাকিস্তানের পরিবর্তে সম্ভবত স্বাধীন বাংলাদেশের কথাই ভাবছিলেন।
১০ এপ্রিল সৈয়দ নজরুল ইসলামকে প্রেসিডেন্ট এবং তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী করে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। কর্নেল আতাউল গণি ওসমানীকে যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়। হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচার, হত্যাযজ্ঞের মুখে বাংলাদেশি মুক্তিযোদ্ধারা গড়ে তোলে প্রতিরক্ষা ব্যূহ। দেশের প্রায় এক কোটি লোক প্রাণের ভয়ে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয় ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, চাকুরে, ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের লোক। ক্রমে মুক্তিযুদ্ধ ভয়াবহ রূপ লাভ করে। হানাদার বাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণে।
শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসর্মপণ করে। শত্রুমুক্ত হল দেশ। জন্ম হল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হয়। তারপর থেকে প্রতিবছর দিনটি একটি স্মরণীয় দিবস হিসেবে জাতীয় মর্যাদার সাথে পালিত হয়ে আসছে।
(ঋণ – এডুকেশন টুডে)&
