শুধুই ডিগ্রিধারী শিক্ষক, তোমার মন নাই?

শিক্ষক যখন ‘ভিলেন’, দোষ আমাদের সবার

সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় এক জন শিক্ষক হিসেবে খুবই লজ্জিত বোধ করছি।

কলকাতার একটি প্রাইমারি স্কুলের এক দিদিমণির বিরুদ্ধে অভিযো্গ, তিনি তাঁর খাওয়ার এঁটো থালা মাজতে বাধ্য করতেন একজন ছাত্রীকে। দিন কয়েক করার পর ছাত্রীটি কোনও কারণে ওই কাজ করতে অস্বীকার করলে হিন্দি সিনেমার ভিলেনদের স্টাইলে মুখে কাপড় গুঁজে, হাত পিছমোড়া করে বেঁধে ওই ছাত্রীকে মারেন তিনি। এমনটাই অভিযোগ ওই শিক্ষিকার বিরুদ্ধে।

আইন অনুসারে করপোরাল পানিশমেন্ট নিষিদ্ধ। ছাত্র-ছাত্রীদের মারধর করা, মানসিক নির্যাতন করা বেআইনি। এটা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ।অভিযুক্ত দিদিমণি দোষী প্রমাণিত হলে শাস্তি নিশ্চিত। ইতিমধ্যেই সাসপেণ্ড করা হয়েছে তাঁকে। টেলিভিসনে ওই শিশুটি এবং তার মা যেভাবে বিবৃতি দিয়েছেন, তাতে মনে হয় অভিযোগ অনেকটাই সত্যি। এই খবর টিভিতে দেখার পর থেকে, খবরের কাগজে পড়ার পর থেকে বারবার মনে প্রশ্ন জেগেছে, এই শিশুটির প্রতি শিক্ষিকার কি কোনও ব্যক্তিগত ক্রোধ ছিল? শিশুটি ওই স্কুলের সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে আর্থসামাজিক ভাবে বেশি পিছিয়ে থাকা পরিবার থেকে আসছে বলে তার উপর এই অবিচার? শিশুটি কি কোনও বৈষম্যের শিকার? দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে শিক্ষকদের মধ্যে এমন বৈষম্যমূলক চিন্তা ভাবনার উপস্থিতি কখনও যে চোখে পড়েনি এমন কথা তো জোর দিয়ে বলতে পারব না। তাই প্রথমেই এই প্রশ্নগুলো মনে এল। যদিও এর উত্তর হয়তো এখনই পাওয়া যাবে না। হয়তো ভবিষ্যতে পাও্য়া যাবে। আর যদি তদন্তকারীরা এই দিকটায় নজর না দেন, তা হলে হয়তো কোনও দিনই পাওয়া যাবে না।

আজকের শিক্ষাব্যবস্থায় একটা বড় ত্রুটির প্রতি আমরা বহু দিন ধরেই নজর দিচ্ছি না। হয়তো আমাদের মতো ‘হা চাকরির দেশে’ এমনটাই হয়। বিষয়টা এই। একজন ব্যক্তি শিক্ষিকের চাকরি পান বি.এড/প্রাইমারি শিক্ষক ডিগ্রির জোরে।এখন বি.এড ডিগ্রি/ প্রাইমারি শিক্ষণ এর ডিগ্রি থাকলেই তিনি ‘শিক্ষক’, নতুবা নয়। আমার দেখা অনেক শিক্ষক আছেন যাদের এই তকমা নেই কিন্তু তাঁরা প্রকৃত অর্থে শিক্ষক। অর্থাৎ, শিক্ষকের কাজের জন্য কেবলমাত্র ডিগ্রি-নির্ভরতা ক্ষতি করে দিচ্ছে না তো? বিশেষ করে শিশুদের পড়াতে যে মনের প্রয়োজন, শুধু ডিগ্রি দিয়ে কি তা পূরণ করা সম্ভব? শিক্ষকের চাকরির ক্ষেত্রে এই ‘মন’ ব্যাপারটাকে যতটা প্রয়োজন, ততটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কি? যে শিক্ষক ওই ছাত্রীটিকে ওই ভাবে মেরেছেন, তাঁর যতই ডিগ্রি থাক, তিনি শিশুদের পড়ানোর যোগ্যতা অর্জন করেননি। কিন্তু এই ফাঁকটা তাঁকে চাকরি দেওয়ার সময় ধরা পড়েনি, বা বলা যায় শিক্ষকের চাকরি পাওয়ার যে পদ্ধতি, তাতে এই ফাঁকটি ধরা পড়ার কথা নয়।

শিক্ষকের আসল কাজ হল শিক্ষার্থীর মনকে সম্মান করা। তাকে সময় দেওয়া। সংবাদ মাধ্যমে চোখ রাখলেই দেখা যাবে, সেই কাজে থেকে প্রায়শই অনেক শিক্ষক পিছিয়ে পড়ছেন। দিদিমনি-মাস্টারমশাইরা কি ‘অসহিষ্ণু’ হয়ে উঠছেন? কেন? তার উত্তর কি আমরা খুঁজছি? খুঁজতে আগ্রহী? না কি এই ধরনের ঘটনা একের পর এক ঘটে যাবে আর টিভিতে ফলাও করে খবর হবে, আর আমরা শুধু একটু নিন্দে মন্দ করে পরের ঘটনার জন্য অপেক্ষা করব।

এমন অভিযোগ নতুন নয়।শিক্ষক আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া শিশুদের তেমন যত্ন করেন না। আসলে বি.এড-এ শিশু-মনের কথা বোঝার কথা বললেও, শিশুর মনের যত্নের কথা কী খুব স্পষ্ট ভাবে বলা আছে? নাকি শিক্ষক শিক্ষণবিভাগের পরীক্ষায় কত ভাল নম্বর পেয়েছেন সেটাই প্রধান হয়ে যায়? আসলে শিক্ষক নিয়োগে তার নম্বরকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। শিক্ষকের অনেক দায়বদ্ধতা আছে এই সমাজের প্রতি। শিক্ষকেরাই অভিভাবকের স্থানটি গ্রহণ করেন। তারাই স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের বাবা/মা। দিনের অনেকটা সময় শিশুরা স্কুলে থাকে, তাই তাদেরকে অন্তর দিয়ে চেনা শিক্ষকের প্রধান কাজ।

Developed by DXDasia