‘নারীদিবস’-এ রইল এমন একজন মহিলার কথা, যিনি পুরুষ-অধিকারের পক্ষে কথা বলেন

এবিএমএফ-এর প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি নন্দিনী ভট্টাচার্য

“নবীন থেকে প্রবীন, যেকোনও বয়সের পুরুষদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার জন্য, ২০১৭ সালে বাংলায় প্রথম একটি কেন্দ্র স্থাপিত হয়- অল বেঙ্গল মেনস ফোরাম (এবিএমএফ)। প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ, মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী।

থেরাপি অ্যান্ড কাউন্সেলিং

পিয়ার সাপোর্ট

লিগাল ক্লিনিক

ফাদারিং প্রোগ্রাম

মেন্টরশিপ অ্যান্ড সাপোর্ট সার্ভিসেস ফর মেল ভিক্টিমস অফ ট্রমা অ্যান্ড ভায়োলেন্স

পুরুষদের যাবতীয় সমস্যার দিকগুলি বিবেচনা করে গবেষণা, আইনি সাহায্য, প্রচার, জনশিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে আমরা পরিষেবা দিয়ে থাকি।”

এভাবেই 'অল বেঙ্গল মেনস ফোরাম'-এর ওয়েবসাইটে পরিষেবা-বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। এটি সম্ভবত বাংলার একমাত্র সংগঠন, যা পুরুষ-অধিকারের সমস্ত দিক নিয়ে কথা বলে। কিন্তু, আন্তর্জাতিক মহিলা দিবস উপলক্ষে এই বিষয়ে লিখছি কেন? কারণ, এই প্রতিষ্ঠানের (এবিএমএফ) শীর্ষস্থানে রয়েছেন একজন মহিলা। তিনি এবিএমএফ-এর প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি নন্দিনী ভট্টাচার্য; নিয়মের বাইরে বেরিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের নারী-ক্ষমতায়ন প্রদর্শন করছেন তিনি।

সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং কর্মী ও শিল্প ব্যবস্থাপনায় এমবিএ করা নন্দিনী ২০১৭ সালে এবিএমএফ স্থাপনের আগে ‘পিআর’ এবং ‘এইচআর’ হিসাবে বেশ কয়েক বছর কাজ করেছেন। “আমরা এরকম অনেক মায়েদের মুখোমুখি হয়েছি, যাঁরা বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে, বিশেষত সন্তানকে কাছে রাখার ক্ষেত্রে, প্রাক্তন স্বামীদের কাছ থেকে আইনানুয়ায়ী দাবি জানিয়ে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে, তাঁরা সন্তানদের ‘ব্ল্যাকমেলিং’-এর সরঞ্জাম হিসাবে ব্যবহার করেন, এমনকি অধিকারের সুযোগ নিয়ে সন্তানের বাবার কাছে টাকা বা সম্পত্তি আদায়ের চেষ্টা করেন,” বলেন নন্দিনী।

ঘরোয়া হিংসার জন্য 498A(স্বামী এবং তার স্বজনদের দ্বারা বধূ-নির্যাতন) ধারা অনুযায়ী জালিয়াতি করে ফাঁসানো হয়েছে পুরুষদের, এখনও পর্যন্ত এধরণের বেশ কয়েকটি মামলা সামলেছেন নন্দিনীর কর্মীদল( দলের বেশিরভাগই পুরুষ)। ‘সামাজিক কলঙ্ক’ এবং ‘লজ্জা’ অনেক পুরুষকেই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। নন্দিনীর কথায়, এ ক্ষেত্রে আইনি প্রতিবন্ধকতা সামলানোর জন্য তাঁর প্রতিষ্ঠান প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে ‘সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং’ করে থাকে। তিনি আরও বলেন, "আমার অভিজ্ঞতা অনুসারে, মহিলাদের বিরুদ্ধে এইসব অপরাধের জন্য প্রকৃত অর্থে দোষী পুরুষরা আমাদের কাছে মোটেও আসে না"। তাঁর কথায়, বেশিরভাগ পুরুষই 498A-এর আইনি প্রযুক্তি সম্পর্কে অবগত নন, সমস্যাটা এখানেই । “এখন পর্যন্ত, প্রচলিত ধারণাটি হ'ল অভিযোগ দায়েরের সঙ্গে সঙ্গেই অভিযুক্তকে জেলে যেতে হতে পারে। অথচ, এই আইনটির পুঙ্খানুপুঙ্খ খুব সহজেই অনলাইনে পাওয়া যায়।”

ভারতীয় আইনে পারিবারিক হিংসা বা বৈবাহিক নিষ্ঠুরতার শিকার হওয়া পুরুষদের জন্য কোনও বিধান নেই, এটা একটা বিরাট সমস্যা। এবিএমএফের আইনি পর্যবেক্ষকরা ক্লায়েন্টদের জন্য উপলব্ধ প্রতিটি সম্ভাব্য আইনি সুযোগ সম্পর্কে পরামর্শ দিলেও, বর্তমানে এই সংস্থার পরিধি ছাড়িয়ে এ ব্যাপারে আগে নীতিগত পরিবর্তন আনা দরকার।

আরেকটি বিষয়, যা নিয়ে পুরুষদের সহায়তা চাইতে অসুবিধা হয়, তা হ'ল যৌন এবং প্রজনন স্বাস্থ্য। মহিলাদের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছে, পুরুষদেরও ‘অ্যানড্রোলজিস্ট’ রয়েছে, তবে, ভারতে এই শব্দটি বেশ অস্পষ্ট, বেশিরভাগ মানুষের কাছেই অজ্ঞাত।" এমনকি সঠিক ডিগ্রিধারী অ্যানড্রোলজিস্টরা, যাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বিদেশ-ফেরৎ, তাঁরা ইউরোলজিস্ট বিভাগের অধীনে কাজ করেন," বলছিলেন নন্দিনী। তিনি আরও বলেন, “সমস্যা খুব গুরুতর হয়ে উঠলে তবেই একজন পুরুষ ‘সেক্সোলজিস্ট’-এর কাছে যান, এ ক্ষেত্রে সমস্যা একই, সামাজিক লজ্জা ও কলঙ্কের ভয়। এইভাবে পুরুষদের জৈবিক সমস্যাগুলি গোপন রাখা হয় এবং সময়মতো পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে বেশিরভাগক্ষেত্রেই এটি মানসিক ব্যাধিতে রূপান্তরিত হয়।”

মহিলা হয়ে একজন পুরুষের অধিকারের পক্ষে কথা বলছেন, কখনও উপহাস বা বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়নি? “সত্যি বলতে, আমি সমর্থন ছাড়া বিশেষ কিছুই পাইনি, বিশেষত মহিলাদের কাছ থেকে, পাশাপাশি আইনি সহায়তা পেয়েছি পুলিশদের থেকেও। কিছু কটাক্ষপূর্ণ মন্তব্য যা পেয়েছি, সব পুরুষদের থেকেই এসেছে! বড় হয়ে আমি আমার আশেপাশের পরিবেশে পুরুষদের দ্বারা নির্যাতিত হওয়ার কোনও ঘটনার মুখোমুখি হইনি। এমনকি এবিএমএফ-এ আমাদের দুই সহ-সভাপতি সুখী বিবাহিত, আমাদের দু'জন যুগ্ম-সচিব সুখী বিবাহিত এবং আমাদের কোষাধ্যক্ষ এখনও পর্যন্ত অবিবাহিত” হেসে বলেন নন্দিনী। যদিও একটি গুরুতর বিষয়ের কথা তিনি বলেছেন, এই সংস্থার কার্যনির্বাহী পদে নির্যাতনের শিকার বেশ কয়েকজন পুরুষ এবং তাঁদের ‘উইমেন ফর মেন’ বিভাগে কয়েকজন মহিলাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।

যদি আপনি ভেবে থাকেন, শুধুমাত্র স্ত্রীদের দ্বারাই নির্যাতিত হয় হয় পুরুষরা, সেক্ষেত্রে বলার যে, এমন বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে যখন মা ও বোনদের অত্যাচারের হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে পুরুষরা এবিএমএফ-এর দ্বারস্থ হয়। এর সাথে জড়িত রয়েছে পুরুষদের যৌন নির্যাতনের প্রশ্নও। ২০০৭-এ দিল্লি-ভিত্তিক এনজিও প্রয়াস এবং ইউনিসেফ সহ মহিলা ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রনালয় ১৩টি রাজ্য জুড়ে ভারতে শিশু নির্যাতনের বিষয়ে একটি গবেষণা চালায়, যেখানে দেখা গেছে যে জরিপ করা ১২৪৪৭ শিশুদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার। ৫৩ শতাংশই ছিল ছেলে। তবে, ২০১৭ সালে অ্যাক্টিভিস্ট ইনসিয়া দরিওয়ালা দ্বারা পরিচালিত অন্য জরিপে দেখা গেছে যে, যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া ১৬০ জন পুরুষের মধ্যে প্রাথমিকভাবে লজ্জার কারণেই কেউ মুখ খোলেনি।

“বেশিরভাগ পুরুষরা এইরকম পরিস্থিতিতে কথা বলার ক্ষেত্রে যে সমস্যার মুখোমুখি হন, তা দেখে আমি মনে করি যে মহিলাদের ব্যাপারে এগিয়ে আসা উচিত এবং তাঁদের পক্ষে কথা বলা উচিত। খুব জনপ্রিয় একটি উক্তি হ'ল 'প্রতিটি সফল পুরুষের পিছনেই একজন মহিলা থাকে'। সফল মহিলাদের পিছনে পুরুষদের ক্ষেত্রেও কি একই কথা খাটে না? আমি যা কিছু করি, তাতে আমার স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির কাছ থেকে আন্তরিকভাবে সমর্থন পাই। এই সত্যটি কেন উদযাপন ও প্রচার করা হবে না?” প্রশ্ন তোলেন নন্দিনী। "এর জন্য কী আমার ক্ষমতায়ন কমে যাবে?"

এই বছর, ১৬মে আন্তর্জাতিক শিশু(ছেলে) দিবসে আলোকপাত করা হবে মহিলাদের দ্বারা নির্যাতিত পুরুষদের লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনার দিকে। কেনিয়ার আইনজীবী এবং সমাজকর্মী রোজমেরি মুথোনি’র সহযোগিতায়, এবিএমএফ-এর তরফে দিনটি জনপ্রিয় করার জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করার পরিকল্পনা করেছে। “সারা বিশ্বে, জেলের ভিতর জন্ম নেওয়া শিশুকন্যদের খুব সহজেই দত্তক পাওয়া যায়। অন্যদিকে, ছ’বছর বয়স পর্যন্ত বেশিরভাগ ছেলে শিশু, যারা জেলের পরিবেশে বেড়ে ওঠে, তাদের ভবিষ্যতের উপর একটা মারাত্মক ছাপ পড়ে” নন্দিনী।

আন্তর্জাতিক মহিলা দিবসে নন্দিনী এবং তাঁর সংস্থা এবিএমএফ চায় পুরুষরা সামাজিক গতেবাঁধা নিয়মগুলো ভেঙে ফেলুক। “আমি প্রত্যেক মহিলার সম্মানের অধিকার সম্পর্কে অনড়। কোনওভাবেই আমি কখনও মহিলাদের বিরুদ্ধে কোনও প্রকার নির্যাতনকে প্রশ্রয় দেব না। তবে, আমার যা বলার তা হ'ল, কোনও মহিলা যদি 'আমার দেহ, আমার পছন্দ' বলতে পারেন, তবে একজন পুরুষও যেন তা বলতে পারেন। আমরা অধিকারের কথা যখন বলছিই, সেটা সকলের জন্য হোক।”

Developed by DXDasia