
সোনাদা ঘোর উন্মাদ। বাউল-ফকিরদের নিয়ে পড়ে থাকত দিনের পর দিন।
হুটহাট করে দেখা হয়ে যায় কারও কারও সঙ্গে। কারও কাছে ছাত্রবয়সে দেদার টাকা ধার করে শোধ দিইনি। কেউ নিছক লেখা চেয়েছিল বলে ফোন তুলিনি জন্মে। কেউ বা এমনিই কথা বলত। এমনিই থেমে গেল যোগাযোগ। কেউ কেউ সোনাদার মতো। ঘোর উন্মাদ। আমাকে শিখিয়েছিল ‘নাসুত’, ‘লাহুত’ আর ‘হাহুত’-এর মানে। শিখিয়েছিল ইসতায়রাক, রাবিতা, খোদাতাল্লা, ইসম-এ-আজম। মুর্শিদাবাদের মানুষ। বাউল-ফকির-সুফিদের নিয়ে পড়ে থাকত দিনের পর দিন। আমায় বলেছিল—“পড়াশোনা, রাজনীতি, প্রেম — এসব ছাড়। চল বেরিয়ে পড়ি। ঘুরব, গান শুনব। খাতায় টুকে নেব। গলায় তুলে নেব। দু'মুঠ যা দেবে খাব। আর শালা এই বেশ্যার জীবনের পোঁদে লাথি মেরে বাঁচব।” আমার নিজেরই তখন হাঁড়ির হাল। প্রেসিডেন্সিতে বাংলা পড়ি আর ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াই। মা ভাবে আমি নকশাল। বাবা ভাবে মাওবাদি। অতএব হাতখরচ বন্ধ। পকেট হাতড়ে তাও যা বেরোত সোনামুখ করে নিয়ে নিত সোনাদা। নোংরা জিন্স আর ঘামের গন্ধ লেপ্টানো জামা পরা এক বাউল। এমন এক বাউল যে ধর্মদীক্ষা না নিয়েও নেশায় চুর।
অবশ্য কলেজে ঢোকার আগে রহস্যমাখানো শেষ কৈশোর থেকেই সোনাদা আমায় হাতছানি দিত। তখন ভাবতাম সে হাতছানি সহজিয়া ঘোরের। উচ্চমাধ্যমিক, জয়েন্টের পালা সাঙ্গ করে আমি কদিনের উড়ুক্কু পাখি। চাপড়ার বৃত্তিহুদায় সাহেবধনী সম্প্রদায় বা কল্যাণীর ঘোষপাড়ায় কর্তাভজাদের খোঁজ এনে দিয়েছিল সোনাদা। বলেছিল, বাঁকুড়ায় সোনামুখীর বাউল সমাবেশ, বীরভূমের কোটাসুর, দধিয়ার বোরেগিতলা আর বেনালিপুরের মেলার কথা। সোনাদা সেইসব ঠেকের গল্পগুলোকে অদ্ভুত এক নেশায় মাখিয়ে রাখত। ঘোষপাড়ার মেলাতে আমাকে নিয়েও গেছিল। সে এক অভিজ্ঞতা। মীরা মা গাইছেন, সোনাদা হাউ হাউ করে কাঁদছে। গান শেষে মীরা মাও কাঁদছেন। আমার চারপাশ থেকে তখন একে একে লুপ্ত হচ্ছে উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্টের ভয়, প্রেমিকা ছেড়ে যাওয়ার বুকজমাট ভার, এমনকি মায়ের মুখও…
আরও পড়ুন
প্রাণের বাগান
মানুষ হারায়। সোনাদাও হারিয়ে গেল একদিন। আমারও বাউল-ফকিরিতে আগ্রহ কমে গেল বিলকুল। মাঝেমাঝে কানে গান এলে শুনতাম মন দিয়ে। অচেনা গান ছেনে বোঝার চেষ্টা করতাম তত্ত্বকাঠামো। কেউ বেশ সহজেই ধরা দেয়। কেউ দেয় না। এ জগতের নিয়ম। এইসব বোঝা আর না বোঝার ফাঁকে আমার পথটাও বেঁকে গেল কোথায়। সখীভাবুকি, রাধাশ্যামী, কিশোরীভজনীদের খোঁজ করে আর ফেরা হল না। জয় গোস্বামীর কথা মিলে গেল — “পালায় শহুরে লোক, না-বুঝে একতিল গূহ্যকথা/ কাপড়ে চোপড়ে হল, ব্যাগে কাঁদছো ও খোকা ভদ্রতা// বাবুদের জন্য নও ওগো আল্লাতালা, ব্রহ্মসাঁই/ চরণ পালের বস্তু সুরে বলে কুবির গোঁসাই// সুর তো ফকির মাত্র, বটগাছের তলায় আস্তানা/ তাকে পাখি পড়াবে কে? উঁহু অত সহজ রাস্তা না…”
আমি জীবনে যা যা পারিনা, সেইসব যারা পারে, তাদেরকে আমি খুব হিংসে করি। নির্লজ্জ রকম হিংসে। যারা গান পারে, যারা খুব উদার, যারা উদমা পাগল– সবাইকে। খালি মনে হয়, আমার এইসব হওয়ার কথা ছিল। যা হলাম তাতে আমার বাবারই বা কী, আমারই বা কী, বাকিদেরই বা কী? সোনাদা-র সঙ্গে দেখা হল আজ হঠাৎ। কথা উজিয়ে উঠল মাথায়। সোনাদা অক্লেশে বলল— “টাকা দে, মাল খাব।” বলল—“এখনও পরের পোঁদে পোদ্দারি করে লাটে দিচ্ছিস নিজেকে?” আরও কত কী বলল। আমি জানতে চাইলাম– বিয়ে করেছ? কিংবা সাধনসঙ্গিনী? উত্তর না দিয়ে হাসল। বলল, “এখানে দক্ষিণা বাতাস, বালির দেশে সাবাহ। কত কী শিখলাম অনিতেশ। তুই শিখলিও না। বেরোলিও না। পড়াচ্ছিস অভিসার। জানিসই না হাফিজের পথ কী।” আমি টুকটাক বললাম। সোনাদা ডিগ্রিধারী শিক্ষিত লোকের কথা শোনে না কোনোদিন। নিয়ম এবারেও বদলায়নি। যাবার আগে বলল—“শ দুয়েক টাকা দে।” বলল, মোচ্ছবে নিয়ে যাবে অগ্রদ্বীপে। বলল, “এবারে বেরো। নাহলে পুরো লটকে যাবি তো।” অটো স্ট্যান্ডে গোঁতাগুঁতি। সোনা দার গায়ে ধাক্কা লাগে। লাগে ধুলো, মাটি, রোদ। মাটি তো খোদার জানু। ধুলো চোখ। সাবাহ নিশ্বাস। আমি ঢুকে পড়ি ঘরে। এই পোড়া শহর। ছোট ঘর। থাকে থাকে বই। তারই কিছু পদ্যের…
“কুপি হাতে তুলে নিয়ে অচেনা কে নারী ডাকল ‘চল’
আমার একপায়ে ভয়, অন্য পদক্ষেপে কৌতূহল।।”
