১০০ বছর ধরে বাংলার ইসলামি এবং বটতলা সাহিত্যের প্রাণকেন্দ্র গাওসিয়া লাইব্রেরি

গাওসিয়া লাইব্রেরি থেকে আজও প্রকাশিত হয় অতি দুর্লভ ‘বনবিবি জহুরা নামা’

চিৎপুর অঞ্চলের একেবারে পাশেই প্রাচীন নাখোদা মসজিদ। পশ্চিমের গঙ্গা থেকে ভেসে আসে ঠান্ডা হাওয়া। পূর্বে ফলপট্টির আম দরবারি বেচা-কেনা। বেনারসি জর্দা মুখে পুরে চলে দেদার ব্যবসা-বাণিজ্য। সেই হাজার ফলের মহল্লায় খেজুর, আপেল, আঙুর, সবেদা আর আনারসের কাবুলি সুবাস বাতাসে ম-ম করে। বলতে গেলে আরব্য রজনীর এ দেশে যেন সদর মোকামের বাতি জ্বলে। সঙ্গ রসনায় বাদশাহি খানা-পিনার রাজকীয় ভারত নামা দোকান ঘর।

চিৎপুর রাস্তার মাঝখানে ট্রাম গাড়ি পথের দুই পাড় জুড়ে হেকিমি দাবা খানা, নকশাদার গালিচা, এক ফালি জরি সুতোর দর্জিপাড়া, পাঞ্জাবি, আলিগড় পাজামা সেলাই কল অথবা জুঁই, গোলাপ আর সুগন্ধি আতরের বাক্স হাতে আলি মিয়াঁদের ঘোরাঘুরি। ওয়াক্তের সময় ধরে শোনা যায় নামাজ। আজান পড়া হয়। সন্ধে নেমে আসে। তারই মাঝে এক পুঁথি-পত্রের ছোট্ট দোকান ঘর গাওসিয়া লাইব্রেরি।

বড়ো হুজুরের দরবার, লায়লা-মজনুর গোলাপ-কাঁটা ভালোবাসা, নামাজ পড়ার নিয়ম-কানুন আর অনেক অনেক পুঁথি। যেমন আদি ও আসল ছোলেমানি তালেনামা, গাজি-কালু চম্পাবতি, ইউছুফ জুলেখা, নুরনামা ও হুলিয়া নামা কিংবা কারবালার ‘হায় হাসান, হায় হোসেন’ কাহিনির পুঁথি মানে কারবালার মাতম জারি, আর বিশেষ করে ‘বনবিবি জহুরা নামা’।

ইসলামি পুঁথি পত্রের এ দোকানের নামের পরে ইংরেজি গন্ধ গা মেখে আছে। তাই শিরোনাম গাওসিয়া লাইব্রেরি। প্রাচীন এক ছোট্ট মহলা। ডাকবাক্সের ঠিকানা ৩০ নম্বর মদন মোহন বর্মন স্ট্রিট। ডাঁই করা বইয়ের ছোটো বড়ো ইমারত দোকানের দেওয়াল বেয়ে মাথা তোলে। মলাটের গায়ে কিংবা বইয়ের বুকে পিঠে উঁকি দেয় চাঁদ, তারা, খিলান, গম্বুজ আর মসজিদের নানান নকশা। লাল, সবুজ হলুদ বা গোলাপি রঙের ইরানি বাহারে চোখের হাতছানি সামলানো ভার।

সেই যবে থেকে বাদশা, উজির নাজিররা দেশের শাসন নিল, তবে থেকেই ইসলামি সংস্কৃতিতে বাঙালির হৃদয় ভিজেছে। মালঞ্চ ঘেরা বাগানে ভ্রমরের গুণগুণ শেখার পাশাপাশি বাঙালি নিজের নিজের মতো করে ‘বাগিচায় বুলবুল’ বলতে শিখেছে। গিরীশচন্দ্র সেন অনুবাদ করেছেন পবিত্র কোরান। বাঙালি মেয়ের শরীরে উঠেছে আতরের সুবাস আর ডাগর চোখে টান পড়েছে সুর্মার। বাংলা সাহিত্যের তাজ মুকুটে ইসলামি ভাষার জয় নিশান উঠেছে। এসবেরই এক নীরব সাক্ষী এই গাওসিয়া লাইব্রেরি।

গাওসিয়া লাইব্রেরি থেকে আজও প্রকাশিত হয় অতি দুর্লভ ‘বনবিবি জহুরা নামা।’ হাজার মাইল দূরের ওই যে মধুর দেশ, বাঘের দেশ সুন্দরবন সেখানকার দ্বার রক্ষী গাজিবাবা। আর সে বনের একমাত্র মালিক বনবিবি। কীভাবে তিনি গভীর জঙ্গলে দুখেকে রক্ষা করে ছিলেন সেই কাহিনি আজও ঘোরে বাদাবনের ঘরে ঘরে। কি হিন্দু কি মুসলমান, বনবিবির জহুরা নামা পাঠ না করে বনের দুয়ারে কেউ পা রাখেনি এত দিন। সেই রীতি মানাই হল দস্তুর।

আর সেই জহুরা নামা গাওসিয়া লাইব্রেরি থেকে বহুদিন ধরেই রেল পথে, নৌকো পথে পৌঁছে যাচ্ছে জঙ্গলের কানায় বাস করা মধু মাওলাদের হাতে কিংবা গুণিনদের দরবারে অথবা সাধারণ মানুষের কাছে। কলকাতার সুতোয় বাঁধা পরে সাত জেলিয়া, লাহিড়ীপুর, কাকমারি, ঝড়খালি মানে প্রায় গোটা সুন্দরবন।

রীতি মেনেই বলতে হয় ‘আল্লা আল্লা বল সবে হয়ে এক মন/ বনবিবির কথা এবে শোন সর্বজন….’। এই সব পুঁথি সাহিত্যের চলন বা পাঁচালির ঢং গাঁ বাংলার সাবেকি। লেখার অক্ষর বাংলা কিন্তু পড়ার ছকে পাতা ওল্টাতে হয় বাঁদিক থেকে ডানদিকে উর্দুর মতো। এ যেন একই বৃন্তের দুটি কুসুম। বিগত একশ বছর লাগোয়া এই বইয়ের দোকান তথা ছাপাখানা বাংলা ইসলামি এবং বটতলা সাহিত্যের এক প্রাণকেন্দ্র। যা আজও বাঁচিয়ে রেখেছে অনেক অনেক প্রাচীন পুঁথির নির্ভেজাল রূপটিকে। বলতে বারণ নেই যে স্বয়ং অবনীন্দ্রনাথও এককালে খোঁজ করতেন এই সব ইসলামি চিৎপুরি সাহিত্যের। যাই হোক, আজও সেই গাওসিয়া লাইব্রেরি তার অবদান রেখে চলেছে আপন ঐতিহ্যকে সযত্নে লালন করে।

Developed by DXDasia