
সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ৩৭
সময়টা ১৯৬৫-র কিছু আগে। রাস্তা, জনবসতি সব দিক থেকেই সেই সময় দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার অন্তর্গত ডায়মন্ড হারবারের নূতনহাট ছিল একটা অজ গ্রাম। আজ তা অনেকাংশে আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়েছে। তখন নূতনহাটে ছেলে-মেয়েদের জন্য একটাই স্কুল ছিল। এলাকার কিছু বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তি, যেমন সাফির রহমান মোল্লা, সুধাংশু পুরকায়েত, ভূষণচন্দ্র গায়েন –এঁনারা চাইলেন, শুধুমাত্র মেয়েদের জন্য একটি আলাদা স্কুল তৈরি করতে হবে। সেই সময়, ১৯৬৫ সালের, ২৪ মার্চ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াবার জন্য মেয়েদের স্কুল খোলা হলো, যা আজ নূতনহাট গার্লস হাইস্কুল নাম পরিচিত। শুরুতে স্কুলের কোনও নিজস্ব ভবন ছিল না। ছেলেদের স্কুল শুরুর আগে, সকালে মেয়েদের স্কুলের ক্লাস চলতো, এটা চলেছে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত। তারপর জেলা পরিষদের অনুদানে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াবার জন্য নিজস্ব স্কুল ভবন তৈরি হল। স্কুলটি তখন ছিল জুনিয়র হাইস্কুল, জুনিয়র হাইস্কুল থেকে ২০০০ সালে মাধ্যমিক স্কুলে উন্নীত হয় নূতনহাট গার্লস হাইস্কুল। ২০০১ থেকে ২০০২ সাল স্কুলের মাধ্যমিকের প্রথম ব্যাচ পরীক্ষা দিল। ২০১৪ সালে এই স্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক-এর প্রথম ব্যাচ পরীক্ষা দেয়। স্কুলের এই ইতিহাস জানালেন স্কুলের টিচার-ইন-চার্জ অপর্ণা পাল।

এই স্কুলে প্রথম থেকেই প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকেই মেয়েরা পড়তে আসত। তাদের পরিবারের অভিভাবকরা বেশিরভাগই ছিলেন দিনমজুর। মুসলিমদের সংখ্যাই পড়ুয়াদের মধ্যে বেশি। প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়ারাই মূলত এই স্কুলে পড়তে আসত। এখনও স্কুলে দিনমজুর বাড়ির মেয়েরাই পড়তে আসে, তারা প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া, সংখ্যালঘু ছাত্রী সংখ্যা এখনও বেশি। বলা যায় এখনও পড়ুয়াদের একটা বড়ো অংশই সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশের প্রতিনিধি। তবে বর্তমান রাজ্য সরকার কন্যাশ্রী সহ মেয়েদের পড়ার জন্য যে সাহায্য-সহযোগিতা দিচ্ছে, স্কুলের বই, পোশাক, জুতো দিচ্ছে, তার ফলে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির পড়ুয়াদের মধ্যেও স্কুলে পড়ার আগ্রহ বেড়েছে এবং বাড়ছে।
নূতনহাট গার্লস হাইস্কুলের নিজস্ব দু’তলা স্কুল ভবন আছে। আছে ৮টি শ্রেণিকক্ষ। স্কুলের ছাত্রী সংখ্যা ৭৫০-এর কিছু বেশি। ৯ জন শিক্ষিকা পূর্ণ সময়ের। পার্ট টাইম শিক্ষিকা ৪ জন। কম্পিউটার শিক্ষিকা ১ জন। প্যারাটিচার ১ জন। করণিক এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মী নেই। স্কুলে সব বিষয় পড়াবার শিক্ষিকাও নেই। তাই ৭৫০ জনের বেশি সংখ্যার ছাত্রীদের দৈনন্দিন ক্লাস নিতে যে শিক্ষিকাদের যথেষ্ট অসাধ্য সাধন করতে হয় সেটাই স্বাভাবিক। গ্রামাঞ্চলের বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলিতে শহরের তুলনায় এখনও পড়ুয়ার সংখ্যা বেশি। ইংরেজি মাধ্যমের দিকে তাদের সেই অর্থে আগ্রহ নেই, যেটা শহরে আছে। তবে গ্রামের বহু স্কুল শিক্ষিকার অভাবে ছাত্রী পেয়েও সঠিক ভাবে ক্লাস করতে পারে না। আটা গ্রামের স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের একটা যন্ত্রণার কারণ। শিক্ষা দফতরের কাছে শিক্ষিকা চেয়ে অনেক সময় পাওয়া যায় না। ফলে সমস্যা জয় করেই গ্রামের স্কুলের একটা অংশ টিকে রয়েছে, ভালো ফল করছে।

স্কুলে উচ্চমাধ্যমিকে বাংলা, ইংরেজি, এডুকেশন, দর্শন, ইতিহাস, পরিবেশ বিজ্ঞান ও ভূগোল পড়ানো হয়। ভূগোলের একটি ল্যাবরেটরি আছে। স্কুলে লাইব্রেরি আছে। তবে স্কুলে এখনও স্মার্ট ক্লাসরুম নেই। সোলার পাওয়ার জেনারেশনের ব্যবস্থাও নেই। তবে পড়ুয়াদের জন্য স্কুলের একটি খেলার মাঠ আছে।
গত ২ বছর স্কুলের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের ফল ভালোই হয়েছে। উচ্চমাধ্যমিকের ফল আলাদা করে ভালো হয়েছে , ৬০০-র বেশি নম্বর উঠেছে। এই স্কুলে পড়ুয়াদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। তাও তারা লেখা-পড়ে যথেষ্ট আগ্রহী। পরিবারগুলো খুবই গরিব, অভিভাবকরা চান, তাদের সন্তানরা পড়াশুনা শিখে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক, শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে মনের ও অর্থের দিনতার গ্লানি থেকে মুক্তি পাক।

স্কুলে মুসলিম ছাত্রীর সংখ্যা বেশি হলেও সরস্বতী পুজো হয় বেশ ভালো ভাবেই এবং এই দিনটির জন্য ছাত্রীরা অপেক্ষা করে থাকে।
পড়ালেখা ছাড়া পড়ুয়াদের খেলা, নাচ, গানে আগ্রহ লক্ষ্য করার মতো। চলতি বছরে মহিলা ফুটবল খেলায় দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় খেলার সুযোগ পেয়েছে নূতনহাট গার্লস হাই স্কুলের ২টি ছাত্রী, যাদের বয়েস ১৭ ও ১৯ বছর। এদের মধ্যে দশম শ্রেণির পাপিয়া ভৌমিক এবং দ্বাদশ শ্রেণির মনীষা খাতুন রয়েছে। এছাড়াও বিগত বছরে রাজ্যস্তরে বিভিন্ন খেলায় অংশগ্রহণ করেছে এই স্কুলের ছাত্রীরা। এর মধ্যে হাই জাম্প, শটপুট বিভাগে মেয়েরা সাফল্য পেয়েছে। স্কুলের মহিলা ফুটবল টিম খেলা দিবসে স্কুলস্তরে জয়ী হয়েছে। চলতি বছর স্কুলস্তরে বাস্কেটবল খেলায় অংশগ্রহণ করেছে স্কুলের ছাত্রীরা।

খেলা ছাড়াও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও এই স্কুলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। স্কুলের ছাত্রীরা লোকনৃত্যে জেলাস্তরে অংশগ্রহণ করেছে। স্কুলের ছাত্রীদের নৃত্যানুষ্ঠানে, নৃত্য প্রতিযোগিতায় শিখিয়ে-বুঝিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে স্কুলের টিচার-ইন-চার্জের যথেষ্ট সদর্থক ভূমিকা আছে।
সরস্বতী পুজো ছাড়াও স্কুলের প্রতিষ্ঠা দিবস, শিক্ষক দিবস, স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান যথেষ্ট সাড়ম্বরেরই উদযাপিত হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সমাজ সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান স্কুলে হয়। স্কুলস্তরে জেলায় যে সমস্ত অনুষ্ঠান হয় তাতে ছাত্রীরা অংশগ্রহণ করে। শিক্ষমূলক ভ্রমণের ব্যবস্থাও আছে এই স্কুলে। করোনার সময় খুব সঙ্কটের মধ্য দিয়ে স্কুল গিয়েছে। সবার মোবাইল না থাকার ফলে গ্রুপ করে ছাত্রীদের শিক্ষিকারা পড়িয়েছেন। এক্টিভিটি টেস্ট নেওয়া হয়েছে।

স্কুলের শিক্ষিকারা চাইছেন, পিছিয়ে পড়া সমাজের মেয়েগুলিকে শিক্ষার আলোয় নিয়ে আস্তে। তার জন্য তাঁরা যথেষ্ট চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে সব কাজের জন্য মানসিকতার পাশাপাশি পরিকাঠামোগত সামর্থ্য একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। তাই সেক্ষেত্রে ৭৫০-র বেশি ছাত্রী বিশিষ্ট স্কুলে ৯জন পূর্ণ সময়ের শিক্ষিকা, ৪জন পার্ট টাইম শিক্ষিকা, ১জন কম্পিউটার শিক্ষিকা ও ১জন প্যারাটিচার যে পর্যাপ্ত নয় সেটা এই স্কুলের শিক্ষিকারা সব সময় অনুভব করেন। তাও তাঁরা সমাজ গঠনের লক্ষ্য নিয়ে শিক্ষিকার কাজ করতে এসেছেন, তাই তাদের অভিধানে হচ্ছে না কথাটা নেই, তাঁরা এই সীমিত শক্তিতেই অনেক বেশি পড়ুয়াকে দৈনন্দিন পাঠদান করে চলেছেন।
তথ্যসূত্র : অপর্ণা পাল, টিচার-ইন-চার্জ, নূতনহাট গার্লস হাই স্কুল
ছবি : সংগৃহীত
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।
