
আমি এমন হাজার হাজার শকুন্তলা তৈরী করে দেব’
আজ শকুন্তলা দেবীর জন্মদিন। জীবিত থাকলে আজ ৮৮ বছর পূর্ণ হত।
আমি এই কম্পিউটার মস্তিষ্কের মানবীর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এসেছিলাম বছর কয়েক আগে। কাগজে বিজ্ঞাপন ছিল, "শকুন্তলা দেবী এডুকেশনাল ফাউন্ডেশন'' কিছু এমন লোকজন চাইছে, যাদের গণিতে প্রেম বেশি, ভীতি কম।আবেদন পাঠিয়েছিলাম স্রেফ কপাল ঠুকে।আমার চেয়ে আমার মায়ের উৎসাহ ছিল অনেক বেশি প্রবল, কারণ আমার মা পারলে অঙ্ক মেখে ভাত খান!
প্রথমে দূরভাষে কথা হল। সে গাঁট পেরিয়ে এবার আমাকে যেতে বলা হল শকুন্তলা দেবীর বাড়িতে। শেষ ধাপ পেরোনোর জন্য। আমার খুব কৌতূহল ছিল, মানুষটিকে দেখার। শুধু শুনেই এসেছি।কী অবিশ্বাস্য ক্ষমতা! এও কি সম্ভব?
গেলাম। ছোটখাটো চেহারা, জ্বলজ্বলে দুটি চোখ প্রথমে টুকিটাকি সাধারণ কথা, তারপর অঙ্কের পরীক্ষা। মায়ের কল্যাণে অঙ্কের এভারেস্ট না হলেও বল্মীকস্তূপ পেরোনোর অভিজ্ঞতা ছিল। আমাকে মহিলার মনে ধরল।
বেছে নিয়েছিলেন জনা বারো নারী ও পুরুষকে। এঁরা সকলেই যে পেশাগতভাবে অঙ্কের লোক, তা নয়, কিন্তু অঙ্ক ভালোবাসেন। নিজেদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে গেল বেশ। বঙ্গদেশীয় বলতে একা আমি।
যেতে হত প্রায় রোজ। প্রথমে বাড়িতে, তারপর নিজেদের দপ্তরে। বলেছিলেন, "এতদিন অনেক রোজগার করলাম। খুব ইচ্ছে করে স্কুলের ছেলে মেয়েদের জন্য কিছু করি। একটা ট্রাস্ট করব আমার সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে। তা থেকে বৃত্তি দেওয়া হবে অঙ্কের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের, হবে ওয়র্কশপ, বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতা, স্কুল কলেজে টিম করে অঙ্কের ক্লাস নেওয়া হবে। পণ্ডিত বানানোর জন্য নয়, অঙ্কের ভীতি কাটিয়ে অঙ্ককে ভালোবাসার জন্য। "
আমরা নিয়েছি এমন ক্লাস। বিনে পয়সায়। অনেক শিক্ষায়তনে, বিশেষত যাদের রেস্ত কম, যাদের মেধা আছে, কিন্তু প্রাইভেট টিউশন নেবার সামর্থ্য নেই। অবাক হয়ে দেখেছি, কী জরাজীর্ণ স্কুলের চেহারা, কিন্তু কী ঝকঝকে সব ছেলেমেয়ে! যারা ছুটির পর খিদে চেপে হাসিমুখে অঙ্কের মজা খুঁজে পেতে রাজি!
বলেছিলেন, "একটাই শকুন্তলা? কেন? আমি এমন হাজার হাজার শকুন্তলা তৈরী করে দেব। ক্ষমতা আছে সবার। তোমরাই বরং তা দেখতেই পাও না! "
আমাকে অনেক ব্যক্তিগত কথা বলতেন। বলেছিলেন নিজের ছেলেবেলার কথা। বাবা পুরোহিত হতে না চেয়ে সার্কাসে যোগ দেন। ট্রাপিজের খেলা। ছোট্ট শকুন্তলাও বাবার সাথে সাথে। দেখাতেন ভানুমতীর খেল। তারপরে এল তাসের ম্যাজিক, আর সেখান থেকে সংখ্যার জাদু। হঠাৎ বোঝা গেল, মাথায় আছে গণক যন্ত্র। আমাকে বললেন, ''জানো, আমার মাথার ভেতর সংখ্যারা ঘুরপাক খায়, কথা বলে। আমি কিন্তু ওদের সত্যি সত্যি পাই। "
কদিন কথাপ্রসঙ্গে বললেন, "আমার স্বামী কিন্তু বাঙালী ছিলেন। পদস্থ সরকারী কর্মচারী। এবং পরনারী আসক্তিও ছিল বিস্তর। বহু নিগ্রহের পরে মেয়েটাকে নিয়ে আলাদা হয়ে আসি। মেয়ে জামাই নাতনি আছে তো। কিন্তু ওরা কি আর আমাকে চায়? আমার টাকাটা চায়। অথচ দেখো, ওদের কিন্তু টাকার অভাব নেই। তাই এই ট্রাস্ট করে সব দিয়ে যাব। "
চোখের সামনে দেখেছি সংখ্যা নিয়ে ছেলেখেলা করতে। আমি বলেছিলাম, 'ইস, কী করে পারেন?''
বলেছিলেন, "ভালোবেসে বেসে এমন হয়েছে…ভালোবাসা দিতে জানলে যে কেউ তোমার পোষা বান্দা হয়ে যাবে!"
ওটা অবশ্য আমি জানি, কথার কথা। এ এক অনন্য প্রতিভা। যার থাকে, তার থাকে।
আমার মা অঙ্ক ভালোবাসেন শুনে নিজের লেখা সব বই শুভেচ্ছাবার্তা লিখে আমার মাকে উপহার দেন।
এই প্রকল্পটির সঙ্গে আমি বেশ কিছুদিন জড়িত ছিলাম। তারপর পারিবারিক কিছু অসুবিধার কারণে যতি টানতে বাধ্য হই। খুব আহত হয়েছিলেন। বারেবারে ফোন করেছেন। আমি অপারগ ছিলাম। ফিরিয়ে দিয়েছি বাধ্য হয়ে। তারপর যা হয়! দৃষ্টিসীমার বাইরে হলে ক্রমশ মনের ঘরের বাইরে। আগে মাঝে মাঝে মনে পড়ত। অপরাধবোধে ভুগতাম। তারপর অপরাধবোধের বোঝা কমাতে মনকে চোখ ঠারা শুরু করি।যোগাযোগ ধীরে ধীরে ছিন্ন হয়ে যায়।
মানুষটি চলে গেছেন সাড়ে চার বছর হল। শ্বাসকষ্টজনিত অসুস্থতায় রোগভোগের পরে। এখন মনে হয়, আমি কী অপরিণামদর্শী! প্রতিকূলতা পেরিয়ে কি পারতাম না, আরও অন্তত কিছুদিন এই বিরল ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সময় কাটাতে? সে যে কী রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা…সামনাসামনি ….দিনের পর দিন… এক জাদুকরীর সান্নিধ্য …. যার অভিজ্ঞতা হয়েছে কখনও… সেই শুধু জানে!
