উত্তরবঙ্গের বিলুপ্তপ্রায় লোকনৃত্য : দেওধনি, ওঝাপালি বা বিষহরা

কেমন আছেন নৃত্যশিল্পীরা?

লোকনৃত্য বলতে মূলত বোঝায়, একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব নৃত্যকে। ধ্রুপদী নৃত্যের তুলনায় সেখানে রয়েছে নানা রকমের ভিন্নতা। লোকনৃত্য ছন্দ ও শাস্ত্রের কঠোর রীতি অনুসরণ করে না যেমন, তেমনি লোকনৃত্যে নেই বিশেষ পোশাক পরিধানের ‘দায়বদ্ধতা’। গতি, ছন্দ, অঙ্গ, কৌশলও সে অর্থে ব্যাকরণগত ভাবে পরিস্ফুট হয় না এসব নৃত্যে। শুধু খেটে খাওয়া মানুষের শ্রমের ক্লান্তি, অবদমন জীবনের আটপৌড়ে গ্লানির মুহূর্তগুলি থেকে খনিকের মুক্তি পেতেই জন্ম হয় এসব অমূল্য লোকসংস্কৃতির।

তবে যত এগিয়েছে আমাদের ইউরোপ কেন্দ্রিক নাগরিক সভ্যতার চাকা, ততই যেন ছিন্নমূল হয়েছি আমরা সকলেই। এমনই এক জনপ্রিয়-বিস্মৃতপ্রায় লোকনৃত্য দেওধনি, ওঝাপালি বা সাইটোল বিষহরা গীত।

দেওধনি মূলত অসমের লোকনৃত্য। অসমের রাজারা, করের প্রসঙ্গে জনসাধারণের ওপর প্রবল অত্যাচার চালালে, একদল প্রতিবাদী মেচ ও রাভা জনগোষ্ঠীর মানুষ সর্বসমক্ষে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নেয় নিজেদের শরীরকে বিভিন্ন ভাবে কষ্ট দেওয়ার শৈলী। এ ছিল রাজাকে অভিশাপ দেওয়ার রাস্তা। সেই ভাষার মাধ্যমে তারা ব্যক্ত করতো নিজেদের ক্ষোভ-দুঃখ-কষ্ট।

কোচ রাজবংশী ভাষায়, ‘দেও’ শব্দের অর্থ, ‘দেবতা’ ও ‘ধনি’ শব্দের অর্থ 'নারী' অর্থাৎ দেওধনি শব্দের অর্থ – ‘নারীদেবতা’।

ডঃ দেবজিৎ দত্তের মতে, এই ছিল দেত্তধনি নৃত্যশৈলীর সূচনালগ্ন। যদিও পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে এ শৈলী থেকে ফিকে হতে থাকে প্রতিবাদের সুর। অহম রাজাদের হত্যা করে, কোচ রাজা বিশ্বসিংহ কামতেশ্বর ১৪৯৮ সাল নাগাদ, অসম রাজ্য জয় করলে কোচ রাজাদের পৃষ্ঠপোশকতায়, এ লোকনৃত্য নব্য বিজিত ‘কোচ হাজো’ অঞ্চলের, ধর্মীয় আচাররূপে ও রাজপারিবারিক ঐতিহ্য উৎসবের অঙ্গে পরিণত হয়।

পরবর্তীকালে ‘শুল্কধ্বজ’ বা ‘চিলারায়’ বৈকুণ্ঠপুর বন সংলগ্ন অঞ্চলে (আজকের জলপাইগুড়ি) নব্য ‘রায়কত’ রাজবংশের সূচনা করলে অনান্য ধর্মীয় রীতিনীতি, ঐতিহ্যের মতো এই দেওধনি নৃত্যশৈলীও কোচবিহার, কাছাড়, কামতাপুর, ছাড়িয়ে রংপুর ও জলপাইগুড়ি-সহ ময়নাগুড়ি অঞ্চলের লোকনৃত্যে পরিণত হয় ভিন্ন ভিন্ন নামে। অন্ত্যজ শ্রেণি মূলত উত্তরবঙ্গের বুকে ছড়িয়ে থাকা উপজাতি সম্প্রদায়, টোটো, মেচ, রাঙা, রাজবংশী, ডিমাছা, মাজতুনিয়া জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যেই এর প্রচলন বেশি।

গোটা শ্রাবণ মাস জুড়ে, এই নৃত্যানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়, মূলত ভোরে ও বিকেলে। দিনের বাকি সময় এই নাচের পরিবেশনা বন্ধ থাকার কারণ মূলত দুটি – প্রথমত, নৃত্যে অংশগ্রহণকারী সকলেই প্রায় কৃষিজীবী সম্প্রদায়ের মানুষ হওয়ায় দুবেলা এঁরা নিয়মিত গান গাইলেও, দিনের বাকি সময়টুকু এঁদের কাটে অন্যের ক্ষেতে ধান, পান,  সুপারি, তামাক, ভুট্টা চাষ করে। দ্বিতীয়ত, এই উপজাতির প্রত্যেকের বিশ্বাস ভোরে মানসই চণ্ডী/ মনসা/ সাইটোলত বিষহরি দেবীর জাগরণী অনুষ্ঠানের জন্য এ নাচ নয়। সন্ধ্যায় এই লৌকিক দেবীর ‘ঘুমপাড়ান গীত’ বা ‘শয়ন’ অনুষ্ঠানের জন্য এ গান গাওয়া হয়। 

দেউধাপালা

গান সহযোগে চলে, বীভৎস বিভঙ্গ শৈলীর প্রদর্শন, উলুধ্বনি ও ছোঁড়া খেলা। যাঁরা এই নাচে যোগ দেন, তাঁদের বলে ‘দেউধা’ (মূলত পুরুষরাই নাচে অংশ নেন, নারীরা মূলত গান গায় এই অনুষ্ঠানে)। অংশগ্রহণকারীরা এই একটা গোটা মাস একবেলা উপবাস ও রাতে আতপ চালের ভাত খান, দেবী মনসার কৃপা লাভ করতে ঐতিহাসিক মহেশ্বর দেওঘরিয়া-র মতে, কোচ রাজবংশী ভাষায়, ‘দেও’ শব্দের অর্থ ‘দেবতা’ ও ‘ধনি’ শব্দের অর্থ ‘নারী’ অর্থাৎ দেওধনি শব্দের অর্থ – ‘নারীদেবতা’।

পাশবিকতাও যে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও উল্লাসের অঙ্গ হতে পারে, তা এ অনুষ্ঠান দেখলে বোঝা যায়, শরীরকে কষ্ট দিয়ে চিত্তশুদ্ধি, মূলত এই লৌকিক দর্শনই রয়েছে এর নেপথ্যে।

মূলত মনসা দেবীর প্রতি ভক্তি নিবেদন করতেই, গোটা উত্তরবঙ্গে এই দেওধনি অনুষ্ঠিত হয়, তবে কোচবিহারের কেঁচাইখাতী অঞ্চলে, ‘বুড়ি গোঁসানী’ (উত্তরবাংলার লৌকিক দেবী)-র জন্যও ভিন্ন নামে এই লোকনৃত্য প্রচলিত আছে। মেয়েরা চুল খুলে, সিঁদুর-শাঁখা পরে, মাথায়, পাহাড়ি উপত্যকার ‘পাটলুকাই’ অর্থাৎ চা গাছের ফুলের মালা পরে, প্রদীপ জ্বালিয়ে, সমবেতভাবে গোল হয়ে বসে, তারপর প্রথমে মনসামঙ্গল কাব্যের বন্দনাখণ্ড, খানিক উপজাতিক ঢঙে সুর করে গেয়ে গেয়ে বোঝায়। ছেলেরা সঙ্গত করে ঢোল-মৃদঙ্গ বাজিয়ে, সারা গায়ে সিঁদুর মেখে।

কোচবিহারের বুড়ি গোঁসানী মন্দিরের দেওধারা

অনেকসময়, পালা চলতে চলতেই, তারা ভাঙা কাচের উপর খালি পায়ে হেঁটে যায় রক্তপাতকে অগ্রাহ্য করে। নিজেদের জিভে ফুটিয়ে দেয় তীক্ষ্ণ ‘গজাল’, দেবীকে নিজেদের রক্ত নিবেদন করে, সঙ্গে চলে উদ্দাম নৃত্য।
পাশবিকতাও যে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও উল্লাসের অঙ্গ হতে পারে, তা এ অনুষ্ঠান দেখলে বোঝা যায়, শরীরকে কষ্ট দিয়ে চিত্তশুদ্ধি, মূলত এই লৌকিক দর্শনই রয়েছে এর নেপথ্যে। 

দেওধনি শিল্পী মন্টু বর্মন

বর্তমানে, এই লোকনৃত্য ও পালার প্রচলন অনেক অংশেই কমে গেছে, এ নৃত্যশিল্পের সঙ্গে জড়িত, মন্টু বর্মন এ প্রসঙ্গে বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “এখন কেউ আর দেওধনিয়া দিখে না, তাই তান্নে উল্টা রাস্তাত কামাইয়ের জইন্যে হামার সমাজের সগুলাই লোক, চা কামলার ক্ষেতিবাড়ির কাজত ধরিসে, অনেক বছর বাকি।”

অর্থাৎ, এখন কেউ এই দেওধনি নাচের বিষয়ে আগ্রহী না হওয়ায়, মন্টু বর্মনের সমাজের অনেকেই উপার্জনের জন্য ক্ষেতমজুরি ও চা-কমলা চাষের সঙ্গে বহুবছর থেকেই যুক্ত। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থসাহায্যের কথা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি আরও জানান, “এখন ওঝাপালিয়া গীত গ্রামুয়া ব্যাপার। তাই তান্নে এগুলা নিয়া, কাও মাতামাতি করে না। ভুলিয়ায় গেইসি পালা গাহুতে।”

অর্থাৎ, দেওধনি বা ‘ওঝাপালি’ এখন গ্রামীন বিষয় তাই এ সমস্ত কিছু নিয়ে কোনো সরকারই তেমন মাতামাতি করেনি এ পর্যন্ত। ভুলেই গেছি পালা গাইতে। এভাবেই হয়তো সমাজের সকল স্তরের মানুষের উদাসীনতা ও জনসচেতনতার অভাবে বাংলা হারিয়ে ফেলবে মন্টু বর্মনের মতো বহু অখ্যাত ‘দেত্তধা’-কে, যাঁরা অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিষ্ঠা নিয়ে আজও এ সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা করছেন।
 

Developed by DXDasia