জীবনযুদ্ধে এখনও হার মানেননি নাচনীরা

পুরুলিয়ার রুক্ষ মাটি থেকে উঠে আসা লড়াই

নাচনীদের জীবনকাহিনী বড় করুণ। রাতের বেলা যাঁদের নাচ দেখে মুগ্ধ হয় মানুষ, সকালে তাঁদের ছায়া মাড়াতে চায় না তারা। এমনকি যে রসিকের কাছে তিনি উপপত্নী, তাঁর পরিবারেও সম্মান নেই। জল স্পর্শ করতে দেওয়া হয় না। ঘরে স্থান নেই, রান্নাঘরে ঢোকার অনুমতি নেই। থালায় খেতে দেওয়া হয় না। কলাপাতায় ভাত দেওয়া হয়। মৃত্যু পর সৎকার করা হয় না। এমনও দেখা গেছে, মৃতদেহ রেখে আসা হয়েছে মাঠে। দেহ খুবলে খাচ্ছে শকুন, কুকুর। অথচ এঁদের আয়েই সংসার চলে রসিকের। রসিকরা গান বাঁধেন, সুর দেন, আর সুরের সঙ্গে নাচেন নাচনী।

নাচনী হতে কেন আসেন মেয়েরা? কেউ আসেন পারিবারিক পরম্পরা মেনে,কেউ আসেন বাঁচার তাগিদে। অনন্তকাল ধরে এই প্রথা চলে আসছে। রাজার আমলে হারেমে নাচনী রাখার ওপর নির্ভর করত তাঁর মর্যাদা। জমিদারি আমলেও তাই। ধীরে ধীরে যখন রাজ আমলের অবলুপ্তি ঘটল তখন নিদারুণ অর্থ কষ্টে ভুগতে লাগলেন নাচনীরা। তখনই রসিকের আগমন। এই রসিকের সন্তান এঁরা গর্ভে ধারণ করেন, তবুও সামাজিক স্বীকৃতি নেই।

বড় কঠিন জীবন এঁদের। সব জেনেও কেবল পেটের খিদে মেটানোর জন্যই হাজারো অপমান সইতে হয়। রসিকের মৃত্যু হলে আরও একজনের উপপত্নী সাজতে হয়। যখন আর নাচার ক্ষমতা থাকে না তখন হয় ভিক্ষে করতে হয় নতুবা আত্মহত্যা। নারীর মর্যাদাটুকু নেই, পুরুলিয়ায় এই ছবি আনাচে কানাচে। কান পাতলে শোনা যায় আত্মনাদ।

এ-রাজ্যের পড়শি ঝাড়খণ্ড আর বিহারে এঁদের বেশ চাহিদা। বাংলায় যদি কোনো রাত অনুষ্ঠান না হয় তো ঝাড়খণ্ডে শো বাঁধা। নিজের উপার্জিত অর্থে হাত দেওয়ার জো নেই। এসবই রসিকের অধিকার।

পুরুলিয়ায় কুড়িটা ব্লকের মধ্যে পনেরটায় রয়েছেন নাচনীরা। প্রতিনিয়ত জীবন যুদ্ধে লড়াই করছেন। পোস্তবালা দেবী এমনই এক খ্যাতনামা নাচনী। এ-বছর লালন পুরস্কারে ভূষিত। পোস্তবালার মা ছিলেন নাচনী। বাবা ছিলেন বাজনদার। পারিবারিক সূত্র ধরে তিনি নাচনী হয়েছিলেন। তাঁর রসিক বিজয় কর্মকার। পোস্তবালাদের সন্তান হয়। সেই সন্তান মানুষ করতে হয় তাঁদেরই। পোস্তাবালার আগে লালন পুরস্কার পেয়েছিলেন সিন্ধুবালা দেবী। সে ২০০৫ সালে।

নাচনীদের সামাজিক সম্মান পাওয়ার লড়াই শুরু হয়েছে অনেক আগেই। যৌনকর্মীদের কাজ করতে গিয়ে নাচনীদের পাশে দাঁড়াল দুর্বার। দুর্বার পুরুলিয়ার সুরুলিয়াতে পুনর্বাসন কেন্দ্র তৈরি করেছে। নাচনীদের সন্তানদের লালন পালনের জন্য তৈরি করেছে ডে কেয়ার সেন্টার। ২০০৮ সালে সুরুলিয়ায় দুর্বারের এই কেন্দ্র উদ্বোধন হয়। এক সময় এটা ছিল বনদফতরের পোড়ো বাড়ি লালন পুরস্কার পাওয়া পোস্তবালা সুরুলিয়ার এই পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকেন। দুর্বার তাঁর হাতে সব দায়িত্ব তুলে দিয়েছে, নিজের জীবন যুদ্ধের লড়াই তিনি শোনান মেয়েদের। দুর্বারের এই চলার পথ ছিল বেশ কঠিন। ২০০৬ সাল থেকে তারা নাচনীদের স্বীকৃতির জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। রাজ্য আর কেন্দ্রের সরকারের কাছে আবেদন জানিয়ে আসছিল। দূর্বার মহিলা সমিতির কর্তা মহাশ্বেতা দেবী বলছেন, দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০০৭ সালের অক্টোবরে স্বীকৃতি মেলে। এখন নাচনীদের সামাজিক স্বীকৃতি মিলেছে। অবস্হারও খানিকটা উন্নতি হয়েছে। এখন সরকার মাসিক ভাতা দেয়। পোস্তবালাদের দীর্ঘ লড়াই আজ সফল।

Developed by DXDasia