
সুচিত্রা মিত্রের সঙ্গে নবনীতা দেবসেনের সম্পর্ক সেই বালিকাবেলার
নবনীতা দেবসেনের বিবাহ অনুষ্ঠান। বৈদিক রীতি মেনে বিবাহ অনুষ্ঠানের অভিনব পরিকল্পনাটি অমর্ত্য সেনের দাদামশাই আচার্য ক্ষিতিমোহন সেনের। যদিও বিবাহে তিনি অনুপস্থিত। সদ্য মৃত্যু তাঁকে বিচ্ছিন্ন করেছিল সেই আনন্দ উৎসব থেকে। বিয়েতে যে রবীন্দ্রসঙ্গীতগুলি হবে, সেগুলি পর্যন্ত ঠিক করে দিয়েছিলেন তিনি। আর একা সেসব গান একটার পর একটা গেয়ে চলেছেন সুচিত্রা মিত্র। কোনোরকম যন্ত্রানুষঙ্গ ছাড়াই সেই সুর অলৌকিক আবহে ভাসিয়ে নিচ্ছে নবদম্পতিকে।
সে যেন এক অন্য সময়ের অন্য আত্মীয়তার গল্প। এই সময়ের কোনো হিসেবনিকেশেই তাকে চেনা যায় না। আমাদের আত্মীয়তার আকাশ ক্রমশই যে ছোটো হচ্ছে, তা তো জানা কথা। দিনগুলো দ্রুত লয়ে কেটে যাচ্ছে। বিলম্বিত বা মধ্যলয়ের কোনো সুযোগ নেই। বন্ধুতা বা আত্মীয়তার মধ্যেও তেমনি দ্রুততা। এই আছে, তো পরদিনই খাড়া হয়েছে এক মস্ত পাঁচিল। কিন্তু যে শূন্যতা তাতে জমা হয়, তাকে ভরাট করার সাধ্য কোনো পাঁচিলেরই নেই। শূন্য গভীর হয় আরো। তাই বোধহয়, অন্যের আত্মীয়তার গল্প এতটা লোলুপ করে তোলে।
সুচিত্রা মিত্রের সঙ্গে নবনীতা দেবসেনের সম্পর্ক সেই বালিকাবেলার। সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় নবনীতার শ্রদ্ধার জ্যাঠামশাই। তাঁর দীর্ঘ সৌম্যসুন্দর চেহারা ঠিক যেন ছিল, ‘রাজামশাই’দের মতো। পেশায় উকিল হলেও সাহিত্য ও সঙ্গীতচর্চাই যেন ছিল তাঁর সাধনা। সেই পরিবারের সকলের মধ্যেই প্রভাব ফেলেছিল সৌরীন্দ্রমোহনের রুচিবোধ। আর সুচিত্রা মিত্র ছিলেন নবনীতার আদরের গজুদিদি। ভালো-বাসা বাড়ির বারান্দায় বসে একবার গান শোনাচ্ছিলেন সুচিত্রা। নরেন দেব অনুরোধ করেছিলেন, দ্বিজেন্দ্রগীতি বা অতুলপ্রসাদী গান গাইতে একটা। সুচিত্রা নাকি তখন জানিয়েছিলেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত ও পিতা সৌরীন্দ্রমোহনের গান ছাড়া অন্যান্য গান গাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। প্রথম রেকর্ডিংও করতে চেয়েছিলেন, সৌরীন্দ্রমোহনের গান দিয়েই। যদিও সৌরীন্দ্রমোহন তাতে নিষেধ করেন। রবিঠাকুরের গান দিয়েই পথচলা শুরু হোক- এমনটাই চেয়েছিলেন।
একজন শিল্পীর বেড়ে ওঠার পথে নানান বাঁকবদল থেকেই যায়। সুচিত্রা মিত্রেরও তাই। বাড়ির অমতে বিয়ে, তা ভেঙে যাওয়ার পর একার লড়াই। নবনীতা জানান, এরপর যখন বড়ো লম্বা চুল কেটে ছোটো করে ফেলেছিলেন সুচিত্রা, নবনীতার অভিমান হয়েছিল তখন। লোকে যতই বলুক না কেন, সুন্দর লাগছে, আরো শক্তিময়ী লাগছে- নবনীতার মনে হয়েছিল, চুলে ফুল গোঁজবার জায়গা রইল না যে….
নবনীতা দেবসেন
তবে, এক অফুরান শক্তির উৎসে সুচিত্রা যে পরিণত হয়েছিলেন, তাঁর প্রমাণ মেলে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত বিভাগ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে। তাঁর দশ বছরের অবিরাম পরিশ্রমেই কলকাতায় জন্ম নিয়েছিল, অ্যাকাডেমিক প্রস্তুতি ও ডিগ্রির সম্মান দিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী তৈরির এই উদ্যোগ।
সুচিত্রা মিত্রের সুইনহো স্ট্রিটের দোতলার ফ্ল্যাটে মাঝেমাঝেই আড্ডার আসর জমে উঠত। নবনীতা দেবসেন সেসব আড্ডার সাক্ষী থাকতেন অনেকদিনই। অনেক গুণী মানুষ, সাহিত্য সঙ্গীতের সাধক ঢের মানুষের সঙ্গে মোলাকাত যেন আরো বড়ো করে তুলেছিল আত্মীয়তার সীমা। পরে নরেন দেবের মৃত্যুর পর সুচিত্রা মিত্রের সঙ্গে যোগাযোগ কমে এসেছিল ঠিকই। কিন্তু পুরোনো সব আড্ডা, গান যেন তাঁর গোটা জীবনকেই পরিপুষ্ট করেছিল। সেসব গল্পের কথা আমাদেরও কোথাও পূর্ণ করে। লতায়-পাতায় আমরাও জুড়ে যাই, সেই বন্ধুতার সঙ্গে।
ঋণঃ স্বজনসকাশে- নবনীতা দেবসেন
