আমি তখন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ফেরিঘাটে যাই

জীবন এখন কেমন যেন একটা ইঁট বের করা, নোনা ধরা, পলেস্তারা খসা বাড়ির মতো। সেই পুরোনো পরিত্যক্ত বাড়িগুলো, যেমন খণ্ডহর, এক সময় খুব রমরমা ছিল, এখন মনে হয় নখ দাঁত বের করে আমাদের ব্যঙ্গ করছে। আগে ঝাড়বাতির রোশনাই, আর এখন ফড়ফড় করে চামচিকে ওড়ে, সরসর করে পায়ের ওপর দিয়ে চলে যায় নির্বিষ সাপ, আনাচে কানাচে কাঁকড়াবিছের গর্ত, মাকড়সার জাল। দেয়ালে দেয়ালে কার্ণিশে কার্ণিশে খসে পড়ছে চুনবালি, আগাছা, একটা দু'টো অশ্বথ আর বটের চারা… আর চুঁইয়ে আসা স্মৃতির কালিঝুলি মাখা জলের দাগ!

পুরোনো আস্তানা। মায়া আছে, কষ্ট আরও বেশি। বাড়িটা একা, জীবনটা একা, স্মৃতিগুলো অনেক হয়েও একা একা। তাই কী শীতের রুখু শালবনে পায়ের নীচে শুকনো পাতার ভাঙচুরের শব্দে আমার কানে আসে শরতের অকালবৃষ্টিতে ধোয়া আকাশের গুনগুনানি? দু-চোখে উপচে আসে জল… মন ডুবিয়ে আমি তাতে বসে থাকি চুপটি করে?

দিনগুলো কি তবে হারায়নি? কিছুই হারায় না? আমরা মৌমাছির মতো আসি, যাই, মধু সঞ্চয় করি। দৈনন্দিনতার মউলবেশী একঘেয়েমি আমাদের মৌচাকে আগুন দিয়ে দম বন্ধ করে মেরে নিংড়ে নেয় চাকভাঙা মধু… বিলিয়ে দেয় অকাতরে… সংসারে, সন্তানে, দায়দায়িত্বে, কর্তব্যে। আমরা টুপটাপ টুপটাপ… চোখের জলে রামধনু রং বুদবুদ তুলে মিশিয়ে দিই অপ্রাপ্তিবোধের নদীতে।

"আধ জনম হম নিদে গোঙায়লু, জরা শিশু কতদিন গেলা…"

নাঃ, ও সব কিচ্ছু নয়। ওই হিসেবে অনেক কারচুপি। জীবন একটা পাথরের মতো… দুদ্দাড় করে ঢাল বেয়ে গড়িয়ে আসে, অনেক ঝরাপাতা এক করে বহ্ন্যুৎসব যেমন। লালচে গনগনে আগুন… মাঝে মাঝে হাত পা সেঁকি, মাঝে মাঝে তাপ না সইতে পেরে দৌড়ে পালাতে ইচ্ছে করে। অথবা এই যেমন তীর অথবা তীক্ষ্ণ ছুরি… যেভাবে হোক লক্ষ্যভেদ করবেই!

স্মৃতি জমে ওঠে, মাঝে মাঝে জঞ্জাল সাফ করি, কলি ফেরাই… আবার মলিন হয়ে যায় দেয়াল, কার্ণিশ, উঠোন, ঘর, অন্দরমহল, বারমহল। মাঝে মাঝে ফাটল দিয়ে পুরোনো কথারা ধেয়ে আসে বেনোজলের মতো, আছড়ে পড়ে বুকের মধ্যে। ঢেউ হয়ে আসে, সরে যায়, আবার আসে..আমাদের ঘিরে ধরে পিরানহা মাছের ঝাঁক যেমন। অস্থির হাতে যুদ্ধ করেই যাই, করেই যাই. কখনো জিতেও যাই হয়ত বা!

অ-সুখের স্মৃতিগুলো ঘ্যানঘ্যানে। ছেড়েও ছাড়ে না! সুখের স্মৃতি যেন সামগ্রিকভাবে মনে জড়িয়ে দেয় জরির ফুল তোলা রেশমি চাদর… আর যন্ত্রণার স্মৃতি? রয়ে যায় মৌরসীপাট্টা গেড়ে। যখন তখন অসহায় রক্তক্ষরণ!

আমি তখন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ফেরিঘাটে যাই। অমিয়র হাত ধরি। অমিয় একজন নি:সঙ্গ মানুষ। আমার খুব প্রিয়। কেমন হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় আমাকে! ফেরিঘাট ছাড়িয়ে। সামনের দিকে, নিরুদ্দেশে।

অমিয়র জীবন ঠিক কেমন? একা লাগলে ঠিক কেমন লাগে? খারাপ লাগে কি?

অমিয় বোঝে না। বেশি ভাবতে গেলেই মাথার ভেতরে তার কেমন সব তালগোল পাকিয়ে যায়। এই অসফলতা সম্বল করেই অমিয়র গোটা জীবনটা কেটে এবং ঘেঁটে গেল! হাসি অমিয়র বউ। অমিয়কে ধর্তব্যের মধ্যেই আনে না ! অমিয় জানে, হাসি চলে যাবে। কিন্তু হাসির কষ্ট হবে না। অমিয়র চোখে যখন তখন স্বপ্ন এসে পড়ে।

উঁচু বালির চড়া। অনেক দূর পর্যন্ত বালিয়াড়ি। হবেই তো! ওইভাবেই স্বপ্নগুলোও গড়িয়ে যায় হাতের নাগালের বাইরে। তারপর ঘোলা জল। স্বচ্ছ নয়। স্বপ্নগুলোও তো স্বচ্ছ ছিল না! আদ্যন্ত ছা-পোষা অমিয়। তার স্বপ্নগুলোর গায়েও ধুলোবালি লাগা। মলিন, রংচটা। প্রকাণ্ড নদী। ওই ঘোলা জলেই ভেসে যাওয়া। জেটি এবং স্টিমারঘাট। জেটির গায়ে জলের শব্দ ভেঙে যায় ক্রমাগত। স্বপ্নরাও ভেঙেই যায়। শুধু অন্ধকারে নজরে পড়ে না। বিন্দু বিন্দু আলো জ্বলে। স্বপ্নগুলো একটা দুটো করে জ্বলে ওঠে জোনাকির মতো।

যৌথ পরিবার হারিয়ে অমিয় নিরাপত্তাহীনতার মতো দূরারোগ্য ব্যাধির শিকার। এক আদ্যন্ত অসফল জীবন তার। ওই অন্ধকার জেটিটাই তো অমিয়! সফল মানুষেরা তেল চকচকে মুখে অমিয়দের ভালোবাসে খুব।অমিয়রা সবাইকেই জড়িয়ে রাখে, জড়িয়ে থাকে… আলগা মায়ায়।

শুধুই নিস্তব্ধতা সম্বল করে নিরাপত্তাহীন, নিরাবলম্ব অমিয়র যাপনসুখ অথবা যাপনদুঃখ। ধু ধু বালিতে পড়ে থাকে শব্দহীন জ্যোৎস্না আর ওই ক্ষয়াটে চাঁদের আলোর আয়নায় নিজের ভাঙাচোরা মুখের ছবিতে আঙুল বোলায় অমিয়। এবং একা একাই। বালির রং সোনালি নয় কিন্তু। কারণ স্বপ্নের রংও তো আর সোনালি নেই! হাড়ের মতো সাদা বালি। বৌয়ের চোখের সামনে এবং অজান্তেই অমিয়র ওজন কমে যায় হু হু করে। অথচ হাসির রোজের জীবনে, রোজের চিন্তায় তা আর কোনো রঙের বদল আনে না। বাতাস নিশ্চুপে থাকে। জলও বিরক্ত হয়ে ঝিমিয়ে পড়ে। বালির ওপর উল্টে পড়ে থাকে একটা সাপের খোলস। একা একা চুপিসারে অমিয়ও নিজের সামনে নিরাবরণ হয়।

চারটে দেওয়াল, মাথার ওপর ছাদ আর শরীরে শরীর হলেই কি ভালোবাসা হয়? দুটো শরীর পরস্পরকে ডাকাডাকি করে মাঝে মাঝে। মন, বিশ্বাস, নির্ভরতা থেকে যায় অন্য কোথাও, দূরাগত নক্ষত্রের মতো। অমিয় আর হাসির সমান্তরাল যুগলজীবনের মাঝে ময়াল সাপের মতো ভয়ংকর অবহেলায় শরীর বিছিয়ে শুয়ে থাকে জীর্ণ দাম্পত্য। ঘরের পুরুষে আসক্তি নেই হাসির। তার উচাটনী মন খালি খালি হাতছানি দিয়ে ডাকে পরপুরুষকে, যার পোশাকী নাম 'শহর কলকাতা'। কলকাতার আকাশে অন্য সূর্য, অন্য চাঁদ, কলকাতার ছায়া অমিয়র ওই দিগন্ত জোড়া নদীর জলে সহস্র টুকরো ছবি হয়ে, লক্ষ কাচের ফলা হয়ে বিঁধে যায় হাসির মা-হতে অনিচ্ছুক যুবতী শরীরে আর ক্রমাগত রক্তক্ষরণে দুর্বল হতে থাকে অমিয়।

হাসির শরীরে অমিয় অনাহুত অতিথির মতো কখনো সখনো আসে যায়, আগলখোলা ঘর দুয়ার, কিন্তু ওই ঘরে আলো জ্বলে না। অন্ধকার জেটি জুড়ে অমিয়র ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে অমিয়র অস্তিত্বকেই গ্রাস করে নেয় অবলীলায়।

হাসি আছে, কিন্তু নেই। নীপা নেই, কিন্তু আছে। অমিয় যে কী দোটানায় ভোগে ! অমিয় ওই পিঙ্গলকেশর পুরুষ সিংহটির কথা ভাবে। ওই উদাসীন অনাগ্রহে 'স্তম্ভিত-বিদ্যুৎ' সিংহ এখন অমিয়কে আড়াল করে দাঁড়ায়। অমিয়র মধ্যে চোরা স্রোতের মতো নির্বিকারে বয়ে যায় সংশয় আর ভয়। ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে হাসি। অন্ধকারে, রেলিং ধরে। আর পরাজয়ের মলিন আকাশ সম্বল করে অমিয়। এখন যদি ঢাল বেয়ে গড়িয়ে যায় পুরোনো দু-চাকার যানটি, মিলিয়ে যায় অমিয় নিজে… হাসি বুঝতেই পারবে না! বুঝতেও চাইবে না। বাতাসে আকাশজোড়া গাছের হেলদোল, আর তারাদের বুকে শুকনো বকুলফুলের গন্ধ।

হাসি জানতে চেয়েছিল ওই জেটি আর স্টিমারঘাটের কথা। ট্রেন ছেড়ে গিয়েছিল। হাসি একা, প্ল্যাটফর্মে। অমিয়র ভরসায়? নাকি নিজের জন্যই? অমিয় জানতে চায়নি। হাসি শুনেছিল ওই বালিয়াড়ির কথা। হাতে তুলে নিয়েছিল সাপের খোলস, আর একা ঘরে শুয়ে নগ্ন শরীরে জড়িয়ে নিয়েছিল চকরাবকরা সেই খোলসটাকে।

পাশের ঘরে অমিয় স্বপ্ন দেখে এই মাঝ বয়েসেও দেয়ালা করে। তার রোমকূপ জুড়ে পিঙ্গল সিংহরা… সগর্জনে। কেঁপে ওঠে মেঘ আর মাটি। হাসি থাকে নির্ঘুমে… তার চোখ দু’টি ভেসে যায় জলে।

স্বপ্নরা বাসাবদল করে। আমরাও 'পারাপার' করি। এ কুল ও কুল। আমি আর অমিয়।

অমিয়র চোখে আঙুল বুলিয়ে আমিও স্বপ্ন দেখি। ঘোর লাগা, নিশিতে পাওয়া মানুষের মতো একবার ওই ফেরিঘাটে যাই, আবার কলকাতার ঝাঁ চকচকে পথে। অন্ধকার গলিঘুঁজিতেও। আঁকড়ে থাকি অমিয়র হাত। অমিয়র উদাসীন স্পর্শে আবাহন বা বিসর্জন, কোনোটাই বুঝি না। পথ ফুরোয় না, স্বপ্ন দেখাও শেষ হয় না আমার।

Developed by DXDasia