
ওয়ার্ডসওয়ার্থ’এর অনেক ছোট-ছোট কবিতা তাঁর মুখে শুনেছি এবং শেলি-ব্রাউনিঙ’এর। বৈষ্ণব পদাবলি থেকে রবীন্দ্রনাথ…
সাহিত্য পড়ায় ও আলোচনায় মা’কে বিশেষ অংশ নিতে দেখেছি। দেশি বিদেশি কোনও-কোনও কবির ও ঔপন্যাসিকের কোথায় কী ভালো, কী বিশেষ দিয়ে গেছেন তাঁরা, এ-সবের প্রায় প্রথম পাঠ তাঁর কাছ থেকে নিয়েছি। ওয়ার্ডসওয়ার্থ’এর অনেক ছোট-ছোট কবিতা তাঁর মুখে শুনেছি এবং শেলি-ব্রাউনিঙ’এর। বৈষ্ণব পদাবলি থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত আমাদের দেশের কবিতার মোটামুটি সম্পূর্ণ ঐতিহ্য জেনে ও ভালোবেসে ও বিদেশি কবিদের কাউকে-কাউকে মনে রেখে তিনি তাঁর স্বাভাবিক কবিমনকে শিক্ষিত ও স্বতন্ত্র ক’রে রেখেছিলেন।
…মা বেশি লেখবার সুযোগ পেলেন না। খুব বড় সংসারের ভেতরে এসে পড়েছিলেন যেখানে শিক্ষা ও শিক্ষিতদের আবহ ছিল বটে, কিন্তু দিনরাতের অবিশ্রান্ত কাজের ফাঁকে সময় ক’রে লেখা – তখনকার দিনের সেই সংসারে এক জন স্ত্রীলোকের পক্ষে শেষ-পর্যন্ত সম্ভব হয়ে উঠল না আর। কবিতা লেখার চেয়ে কাজের ও সেবার সর্বাত্মকতার ভেতরে ডুবে গিয়ে তিনি ভালোই করেছেন হয়তো। তাঁর কাজকর্মের আশ্চর্য নিষ্ঠা দেখে সেই কথা মনে হলেও ভেতরের খবর বুঝতে পারিনি; কিন্তু তিনি আরও লিখলে বাংলা সাহিত্যে বিশেষ কিছু দিয়ে যেতে পারতেন, মনে হয়।
মা’র কবিতায় আশ্চর্য প্রসাদগুণ। অনেক সময় বেশ ভালো কবিতা বা গদ্য রচনা করছেন দেখতে পেতাম। সংসারের নানা কাজকর্মে খুবই ব্যস্ত আছেন এমন সময়ে ব্রহ্মবাদী’র সম্পাদক আচার্য মনোমোহন চক্রবর্তী এসে বললেন : এক্ষুনি ব্রহ্মবাদী’র জন্য তোমার কবিতা চাই, প্রেসে পাঠাতে হবে, লোক দাঁড়িয়ে আছে। শুনে মা খাতা-কলম নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে এক হাতে খুন্তি, আর-এক হাতে কলম নাড়ছেন দেখা যেত; যেন চিঠি লিখছেন, বড় একটা ঠেকছে না কোথাও; আচার্য চক্রবর্তী’কে প্রায় তখনই কবিতা দিয়ে দিলেন। স্বভাবকবিদের কথা মনে পড়ত আমার, আমাদের দেশের লোক-কবিদের স্বভাবী সহজতাকে।
অনেক আগে, প্রথম জীবনে, মা কয়েকটি কবিতা লিখেছিলেন, যেমন, ‘ছোট নদী দিনরাত বহে কুলকুল’ অথবা ‘দাদার চিঠি’ কিংবা ‘বিপাশার পরপারে হাসিমুখে রবি উঠে।’ একটি শান্ত, অর্থঘন সুস্মিত ভোরের আলো, শিশির, লেগে রয়েছে যেন এ-সব কবিতার শরীরে। সে-দেশ মায়েরই স্বকীয় ভাবনা-কল্পনার স্বীয় দেশ। কোনও সময় এসে সেখান থেকে এদের স্থানচ্যুত করতে পারবে না।
আজকের পৃথিবীর জীবনবেদের তাৎপর্য মা বেশি বুঝেছিলেন; তাঁর গদ্য লেখায় অভিভাষণে সমাজের ও নানা সমিতির কাজকর্মে লোকসমাজের সঙ্গে লেনদেনে নানা রকম বিখ্যাত বই’এর ও চিন্তার ধারার সঙ্গে পরিচয়ের পিপাসায় ভাবনা-বিচারের আধুনিকতার মর্ম বুঝে দেখছিলেন যখন – তার কিছু আগেই কবিতা লেখা প্রায় ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন তিনি, ফলে, যে-মহৎ কবিতা হয়তো তিনি লিখে যেতে পারতেন, তাঁর রচিত কাব্যের ভেতর অনেক জায়গাতেই প্রায় আভাস আছে – কিন্তু কোনও জায়গাতেই সম্পূর্ণ সিদ্ধি নেই – মাঝে-মাঝে কবিতার ভেতর দু’চারটে বিচ্ছিন্ন সিদ্ধিকে বাদ দিয়ে। গদ্য সন্দর্ভ রচনায়ও এক জন সৎ সাহিত্যিকের উপাদান ছিল তাঁর মধ্যে। বাবার ও পিসেমশায়ের অবর্তমানে তিনি বরিশাল’এর ব্রাহ্মসমাজে আচার্যের কাজ করতেন। আরাধনা উপাসনা আশ্চর্য নির্ঝরের মতো ধ্বনিত হয়ে – তবুও ধ্বনির অতীত অর্থগৌরবের দিকে – আমাদের মর্ম ফিরিয়ে রাখত; কোথাও ঠেকতেন না, তাল কেটে যেত না – পুনরুক্তি ছিল না, কিন্তু যে-সাহিত্যিকের ও কবির গরিমা তাঁর প্রাপ্য ছিল, সেটাকে অন্তর্দমিত ক’রে রাখলেন তিনি – প্রকাশ্যে কোনও পুরস্কার নিতে গেলেন না। শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের লেখায় ও নিজের লিখিত অনুভাবনায়, বিতর্কের ও ধ্যানের ভিতর, কেমন যেন আত্মনিদান খুঁজে পেলেন আত্মশুদ্ধির জন্য।
(ভূমেন্দ্র গুহ সম্পাদিত ‘কুসুমকুমারী দাশের দিনলিপি’ বইয়ের পরিশিষ্ট অংশ থেকে)