‘বাঘ মারা জামাই’ ছিলেন বাবা

পেচ্ছাপের বেগ সামলাতে না পেরে, কানে পৈতে জড়িয়ে গাছ থেকে নেমে এলেন বাবা

পূর্ববঙ্গ থেকে কলকাতায় উদ্বাস্তু হয়ে প্রবেশ এবং ক্রমশ এ-শহরে থিতু হওয়ার পাশাপাশি, বাবার কথাও আলাদা করে না-বললেই নয়। আমার বাবা ছিলেন খুব রাগী প্রকৃতির মানুষ। কারণে-অকারণে তিনি যেমন রেগে যেতেন, তেমনি তাঁর হাত চলত। কবিরাজি করতেন। ইংরাজি ‘L’-এর মতো ছিল আমাদের বাড়িটার গঠন। তার বাইরের দিকের ছোটমতো একটা ঘর ছিল বাবার ঘর। ও-ঘরেই বাবার থাকা, ওঠা-বসা, কবিরাজি করা। রোগীরা ওখানেই আসত। বিভিন্ন আকারের ‘বইয়ামের’ মধ্যে রাখা থাকত নানা রকমের বড়ি। রোগীদের নাড়ি দেখে বাবা তাদের ওষুধ দিতেন। বাবার শোওয়ার জন্য ছিল একটা চৌকি। সেই চৌকিতেই বসে বাবা কবিরাজি করতেন। ছিল নলওয়ালা একয়া বিরাট হুঁকো। সেই হুঁকোতে তামাকমাখা ঠেসে তার ওপরে জ্বলন্ত টিকে দিয়ে নলে মুখ রেখে হুঁকো টানতেন বাবা। হুঁকোর নিচে জলের পাত্র থেকে ‘গুড়গুড়’ আওয়াজ হত। বাবার অনুপস্থিতিতে, ওই ‘গুড়গুড়’ আওয়াজ শোনার জন্য সুযোগ পেলেই আমি নলের মাথায় মুখ লাগিয়ে টানতাম। আর বাবার গলার বা পায়ের শব্দ পেলেই চোঁ দৌড় লাগাতাম।

বাবার চৌকির নিচে থাকত দুটো বড়-বড় পেতলের ডাবর থাকত। তার মধ্যে থাকত জল এবং সেই জলে থাকত অ্যাইসা মোটা-মোটা জোঁক। কিছু-কিছু রোগীকে বাবা সেই ডাবরে পা ডুবিয়ে বসিয়ে রাখতেন অনেকক্ষণ। জোঁকগুলো রোগীর ফোলা-ফোলা পা থেকে রক্ত টেনে টেনে বিকটভাবে ফুলে উঠত। তারপর একসময় বাবা রোগীদের মুক্তি দিতেন। বড় হওয়ার পর জেনেছি, ব্লাড প্রেশারের রোগীদের, বাতের রোগীদের ওপর বাবা নাকি ওই জোঁক-চিকিৎসা চালাতেন।

বাবার হুঁকোর পাশেই একটা টুলের ওপর একটা মাটির সরাতে তুষ ভর্তি থাকত। সেই তুষ সবসময়েই জ্বলত, তবে ওপর থেকে বোঝা যেত না। তার পাশে থাকত ছোট-ছোট পাটকাঠির মাথায় দেশলাইয়ের বারুদের মতো গন্ধক লাগানো। সেই তুষের আগুনে গন্ধক লাগানো কাঠি ছোঁয়ালেই আগুন জ্বলে উঠত। সেই পদ্ধতিতেই আমার ঘরে হ্যারিকেন, বাতি, বাবার হুঁকোর টিকে – সব জ্বালানো হত। একটা পাত্রে গন্ধকের চাকা রেখে মা আগুন দিত তার তলায়। গন্ধক গলে গেলে, সেই পাটকাঠিগুলো মা ডুবিয়েই তুলে নিত। তৈরি হয়ে যেত দেশীয় দেশলাই কাঠি।

বাবা যখন আমাদের কাউকে ডাকতেন – তখন আমাদের ‘আইজ্ঞা’ বলে প্রত্যুত্তর দিতে হত। ‘আইজ্ঞা’ মানে ‘আজ্ঞে’। এখন বোধহয় সেই প্রত্যুত্তরই আমাদের ছেলেমেয়েরা দেয় ‘হাই’ বলে।

আমার বাবা খুব সাহসী প্রকৃতির লোক ছিলেন। একসময় বাবা নাকি চা-বাগানে কুলি সাপ্লাইয়ের কাজ করতেন। সেই চা-বাগানের ইউরোপিয়ান সাহেব শিকারে যাওয়ার সময় বাবাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। আমার সেজদি’র মুখে শুনেছি – একবার সে-সাহেব নাকি বাবাকে নিয়ে শিকারে গিয়েছিলেন। গাছের ওপরে মাচা বেঁধে বাবা আর ওই সাহেব বন্দুক উঁচিয়ে বসে আছেন বাঘের অপেক্ষায়। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা – বাঘের দেখা নেই। বাবার তো পেচ্ছাপ পেয়েছে। জন্মসূত্রে আমরা বদ্যি। বদ্যিদের পৈতে থাকে। পেচ্ছাপ-পায়খানা করার সময় বাবাকে দেখতাম সেই পৈতে কানে জড়িয়ে নিতে।

এখন হল কী, পেচ্ছাপের বেগ সামলাতে না পেরে বাবা কানে পৈতে জড়িয়ে গাছ থেকে নেমে এলেন। কাঁধে সাহেবের দেওয়া দোনলা বন্দুক। গাছের গোড়ায় বাবা পেচ্ছাপ করতে যাবেন এমন সময় নাকি ‘হালুম’ শব্দ করে এক বাঘ বাবার উল্টোদিক থেকে গাছটার গোড়ায় ঝাঁপিয়ে পড়ে গাছটাকে জড়িয়ে ধরে। বাবা মুহূর্ত দেরি না করে বন্দুকের নল বাঘের পেটে ঠেকিয়ে ‘ঘোড়া’ টিপে দেন। গুড়ুম গুড়ুম দুটো শব্দ – বাঘটা নেতিয়ে পড়ে। পেচ্ছাপে তখন বাবার শিকারে যাওয়ার ড্রেস ভিজে একাকার!

সম্বিত ফিরলে বাবা দেখলেন – সাহেব গাছ থেকে নেমে এসে বাবার দু’হাত ধরে প্রবল ঝাঁকুনি দিতে দিতে বলছে – সাবাস সেনবাবু, সাবাস! আপনাকে এই বন্দুক আর টর্চটা আমি প্রাইজ দিলাম। চলুন বাগানে ফিরে, লোকজন পাঠিয়ে বাঘটাকে নিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্ত করা যাবে।

আমি সেই বড় টর্চটা আমাদের বাড়িতে দেখেছি, কিন্তু বন্দুকটা দেখিনি। তবে শুনেছি, সে-ঘটনার পর থেকে বাবাকে মামার বাড়ির সবাই বলত ‘বাঘ মারা জামাই’!

সেই ‘বাঘ মারা জামাই’ তারপর যেবার শ্বশুরবাড়ি গেলেন, বন্দুকটা সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়েছিল তাঁকে। বাবাকে নিয়ে মামারা শিকারে বেরিয়েছিল। কিন্তু ‘বাঘ মারা জামাই’ একটা ডাহুক পাখিও টিপ করে মারতে পারেনি। সেই নিয়ে সবার কী হাসাহাসি! ‘ইজ্জত নাশ’ হওয়ায় বাবা নাকি সে-বন্দুক শালাদের দিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন।
টর্চটা অবশ্য বাবা কাউকে দেননি। চার ব্যাটারির টর্চ… কী জোর তার আলোয়…

(ক্রমশ)

Developed by DXDasia