মেরিকামায়া সাতকাহন : আমেরিকায় শুধু পেপার পছন্দ হলেই চাকরি বা ফেলোশিপ হয় না

ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ৪৩

দ্বিচত্বারিংশ পর্বের পর

সাতকাহনের দ্বিতীয় কাহন শেষ হয়েছিল এইভাবে।

জন হেনস ফোন করে আমাকে বললেন, “হে পার্থা, দিস ইজ জন ফ্রম অলব্যানি। রিমেম্বার মি?”

[অলব্যানি হলো নিউ ইয়র্ক রাজ্যের রাজধানী। প্রায় সমস্ত রাজ্যের রাজধানীই সে রাজ্যের প্রধান শহরে নয়। এই হলো আমেরিকার আর এক আশ্চর্য ব্যাপার। ক্যালিফোর্নিয়ার রাজধানী লস অ্যাঞ্জেলেস নয়, স্যাক্রামেন্টো। পেনসিলভ্যানিয়ার রাজধানী ফিলাডেলফিয়া নয়, হ্যারিসবার্গ। ইলিনয়ের রাজধানী শিকাগো নয়, স্প্রিংফিল্ড। যাক সে কথা এখনকার মতো।]

আমি বললাম, “ইয়েস জন। উই মেট ইন উইসকনসিন। হাউ আর ইউ?”

জন – “আই অ্যাম ডুইং গ্রেট। লুক, আই হ্যাভ এ জব ফর ইউ হিয়ার অ্যাট নিউ ইয়র্ক বায়োলজিক্যাল সার্ভে। আই উড বি ভেরি হ্যাপি ইফ ইউ টেক ইট।”

আমি – (বাকরুদ্ধ, শ্বাসরুদ্ধ।)

নিউ ইয়র্ক স্টেটের রাজধানী অলব্যানি। ক্যাপিটল বিল্ডিং ও সামনে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ

*তৃতীয় কাহন*

পাইয়ে দেওয়া কোনো ঈশ্বরে বিশ্বাস করিনি কখনো। বরং নিয়ে নেওয়া, কেড়ে নেওয়ার ভয়ঙ্কর, অপ্রতিরোধ্য শক্তির তাণ্ডবই দেখেছি বার বার। বেয়াল্লিশ বছর বয়সে অবিশ্বাস্য যন্ত্রণাদায়ক ক্যানসারে মায়ের মৃত্যু। ছত্রিশ বছর বয়সে ছোটমামা বুদ্ধদেবের রাজনীতির বলি হওয়া। আরো কিছুদিন পরে, কয়েক বছর পরে দেখেছিলাম আশৈশব প্রিয় বন্ধু সুব্রতর নির্মম মৃত্যু। আরো অনেক, অনেক ভয়াবহ ঘটনা এই একটাই জীবনে।

অথচ, আকাশ থেকে খসলো তারা, আঁধার রাতে পথহারা এই আমিকে হারিয়ে যাওয়া পথ খুঁজে দেওয়ার জন্যে কোনো এক শক্তি – এ ঘটনাও একাধিক ঘটেছে। সেই দেশের স্মৃতিকথা ঘটিকাহিনিতে যেমন লিখেছিলাম একটা সত্যি গল্প। সুন্দরবন হাজি দেশারৎ কলেজে চার বছর অধ্যাপনা করার সময়ে তখনকার বাসস্থান বেহালার কাছেই একটা সুন্দর জমি পাওয়া গেলো। তখন আমার বিদেশে আসার কোনো কিছুই ঠিক হয়নি। বরং, আর পাঁচজন অধ্যাপকের মতোই জমি কিনে বাড়ি করবো, সেখানে সুখে থাকবো, এই ছিল বাসনা। সতীর্থ অধ্যাপক দাদা রফিকুল ইসলাম তাঁর এক শ্যালক অ্যাডভোকেটকে ঠিক করে দিলেন আলিপুর কোর্টে গিয়ে সে জমি রেজিস্ট্রেশন করতে। জমি কী, রেজিস্ট্রেশন কী, সার্চ কী – আমার কাছে সবকিছুই হিব্রু, গ্রীক, ল্যাটিন।

একজন সম্পূর্ণ অচেনা ভদ্রলোক কোর্টের প্রাঙ্গণে একটা গাছের ছায়ায় আর পাঁচজনের সঙ্গে বসেছিলেন। কী কারণে যেন তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলাম। তিনি কথায় কথা জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় কোন জমি আমি কিনতে চলেছি। বললাম।

ভদ্রলোকের নামটাও জিজ্ঞেস করা হয়নি। তিনি আমার কাগজপত্র, জমির মানচিত্র দেখে বললেন, “এই জমি আপনি কিনবেন না। এখানে অনেক গণ্ডগোল। আপনি জানেন না, আপনাকে ঠকাচ্ছে।” আমি পরে রফিকদা ও তাঁর শ্যালককে বলেছিলাম। তাঁরা তো আকাশ থেকে পড়লেন। তাঁরাও কিছুই জানতেন না।

আমি বললাম, “তাহলে কী করবো?” স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে। জমি কেনা হবে না, বাড়ি তৈরিও হবে না?

তিনি বললেন, “আপনি এক সপ্তাহ পরে আসুন। আমি আপনাকে অন্য জমির খোঁজ দেবো। কিন্তু এই জমি আপনি কিনবেন না।”

তথাস্তু। বাড়ি এসে বাবাকে বললাম।

এক সপ্তাহ পরে আলিপুর কোর্টে গিয়ে তাঁর খোঁজ আবার করলাম সেই গাছের ছায়ায়।

সঙ্গে যাঁরা বসে ছিলেন, বিষণ্ণমুখে তাঁরা বললেন, “আমাদের দাদা এই দুদিন আগে হঠাৎ মারা গেছেন।”

দেশ ছেড়ে বিদেশে পড়তে আসাটাও তেমনই পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা। এ নিয়ে আগেই বিস্তারিত লিখেছি এই মেরিকামায়া সাতকাহনের পাতায়। বেড়ালের ভাগ্যে শিকে কীভাবে ছিঁড়েছিলো। আমি, আমার সেই গোরাচাঁদ বসু রোড, ধূলিধূসর উত্তর কলকাতা, পেয়ারাবাগানের মদের গলি। মানিকতলা বাজারে রোজ সকাল সাতটায় বাজার করতে যাওয়া। সপ্তাহে একদিন রেশনের দোকান থেকে চাল, গম, চিনি, তেল। কয়লার দোকান, কেরোসিনের দোকানের সামনে লম্বা লাইন। ধোঁয়াহীন কয়লা নামক অত্যাশ্চর্য জিনিসের খোঁজে নতুন দোকান। যুদ্ধের সময়ে রেশন কার্ড দিয়ে পাঁউরুটি, বিস্কুট। ঝাঁ ঝাঁ রোদে ল্যাম্পপোস্টের সরু ছায়ায় দাঁড়িয়ে তেত্রিশ নম্বর বাসের জন্যে অপেক্ষা করা। শহর ভাসিয়ে দেওয়া তুমুল বৃষ্টিতে এক হাঁটু জল ভেঙে সেই এসপ্ল্যানেড থেকে বাড়ি ফেরা রাত বারোটার সময়ে। গলি ক্রিকেট, নারকেল দড়ির গোলপোস্ট, কালীপুজোয় হাতচরকি, আর মুখের ভেতরে দুটো আঙুল দিয়ে সিটি বাজানো। 

জীবনটা এই রকমই ছিল। নিম্ন-মধ্যবিত্ত, বন্ধ দরজার জীবন। সেই রোগা-রোগা আমি পাড়ার রকে বসে সিনিয়ার বেকার দাদাদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া, ক্যারম খেলা, বিকেলবেলায় আরএসএস, সন্ধ্যেবেলায় রুটি আর একটা তরকারি খেয়ে টিমটিমে মরা মরা আলোয় স্কটিশ চার্চ ইস্কুলের অঙ্ক কষা। বাংলা ব্যাকরণ, আর ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান। রবীন্দ্রনাথ, গোয়াবাগান পার্ক। জগদীশ বসু, আবোল তাবোল। দিদিমার কাছে ক্ষুদিরামের গল্প, আর ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমী।

সন্ধ্যেবেলায় লোড শেডিং, আর পাশের বাড়ির জেঠিমার শাঁখের আওয়াজ। চণ্ডীবাড়ি স্ট্রীটের দিক থেকে আসা সেই বিরাট জালার মতো ঢাকের শব্দ। ঘণ্টাধ্বনি, আর ধুনোর গন্ধ। শীতের সন্ধ্যেয় উনুনের ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করে। জীবন এই রকমই ছিল। সুনীল, সমরেশ, সত্যজিৎ, বিমল কর, রমাপদ, নীরেন্দ্রনাথ।

একটু বেশি সন্ধ্যে হলেই সুবীর গাঙ্গুলি আসবে আমার আধখানা ঘরের জানালার নিচে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ আড্ডা দিতে। তিনতলার নতুন বান্ধবী কাবেরী পাশ দিয়ে চলে যাবার সময়ে বলে যাবে একটু হেসে, “আর আড্ডা দিও না। এবারেই না তোমাদের হায়ার সেকেণ্ডারি?” সেই সুবীর এই সেদিন চলে গেলো। আর আড্ডা হলো না।

সেই আমি। সেই আমি, এখন আমেরিকায়। সাদার্ন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে পি এইচ ডি ডিগ্ৰী পাওয়া ডঃ পার্থ ব্যানার্জী। ডিপার্টমেন্টে বলতে গেলে একরকম সাড়া ফেলে দেওয়া ভারতীয় অ্যাকসেন্টের ইংরিজি বলা বাদামি রঙের, অদ্ভুত নামের, অজানা ভাষার একটা ছেলে।

আমার বর্তমান সবাই দেখছে এখন।

কিন্তু আমার অতীত কি কেউ জানে?

সুতরাং, জন হেন্স যখন ফোন করে বললেন তিনি আমার জন্যে একটা পোস্ট-ডক্টোরাল ফেলোশিপের ব্যবস্থা করে রেখেছেন, এবং আমাকে এবার ইলিনয় থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে সেই নিউ ইয়র্ক রাজ্যের রাজধানী অলব্যানি শহরে ঘাঁটি গাড়তে হবে, সেই প্রায় কখনো না দেখা পাইয়ে-দেওয়া ঈশ্বরের দেখা যে আর একবার পেয়েছিলাম, সে কথা একেবারে অস্বীকার করতে পারি না।

ডঃ জন হেন্স (বসে বাঁদিকে), যাঁর কাছে আমেরিকার প্রথম আসল চাকরি শুরু করেছিলাম

অবশ্য, জন হয়তো ইচ্ছে করেই উইসকনসিন রাজ্যের ম্যাডিসন কনফারেন্সের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ, সেখানেই পেশাদারি ছত্রাকবিদদের সঙ্গে মোলাকাত হয়েছিল, এবং আমার দেওয়া পেপার শুনে জনের আমাকে পছন্দ হয়েছিল। কিন্তু আমেরিকায় শুধু পেপার পছন্দ হলেই চাকরি বা ফেলোশিপ হয় না। ব্যক্তি হিসেবে, সহকর্মী হিসেবে তুমি কেমন, তোমার সঙ্গে পেশাদারি জগতের বাইরেও বন্ধুত্ব করা চলে কিনা, তোমার সেন্স অফ হিউমার আদপেই আছে কিনা, তুমি আর পাঁচজনের কাছে প্রেজেন্টেবল কিনা – অর্থাৎ তোমাকে পাতে দেওয়া যায় কিনা – এ সবকিছুই বিচারের তালিকায় থাকে।

মনে হয়, ম্যাডিসনে দিনের বেলায় বৈজ্ঞানিক কনফারেন্স, আর সন্ধ্যেবেলায় রেস্টুরেন্টে গিয়ে আর পাঁচজন ডেলিগেটদের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা আর হাসি – এই সবকিছু দেখেই হাস্যমুখ, উষ্ণ জন আমাকে তাঁর ডিপার্টমেন্টে পোস্ট-ডক্টোরাল ফেলোশিপ দিতে মনস্থ করেছিলেন তখনই। কিন্তু তখনও আমার পিএইচডি শেষ হয়নি। তাই আমাকে তখন কিছু বলেননি।

ম্যাডিসন কনফারেন্স রুমে ডেসার্টেশন সেমিনার দেওয়ার পর। সান্ডবার্গ, স্টটলার এদের সঙ্গে আমি, মুক্তি, এবং কয়েকজন কলিগ

এর আগেও কিন্তু জনের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল একবার, আমি যখন নিউ ইয়র্ক বোটানিক্যাল গার্ডেনে গবেষণা করতে এসে ব্রঙ্ক্স-এর গেস্ট হাউসে ছিলাম। মনে হয়েছিল, ভদ্রলোক খুব উদার স্বভাবের। দিলখোলা, যেন একেবারে সমবয়সী বন্ধু।

আর একটা ফেলোশিপের অফার পেয়েছিলাম অ্যাটলান্টা শহরের এক ম্যালেরিয়া রিসার্চ সেন্টারে। ডঃ আলতাফ নামক এক অপরিচিত ভারতীয় বিজ্ঞানী আমার পেপার পড়ে, এবং বিবর্তনের ওপর আমার কাজকর্ম দেখে ফোন করে সে অফার দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বললেন, গ্রীন কার্ডের ব্যাপারে তিনি বোধহয় কোনো সাহায্য করতে পারবেন না। আমি আমার বন্ধু যে কয়েকজন ছিল, তাদের সঙ্গে, এবং মুক্তির সঙ্গে কথা বলে ঠিক করলাম, অলব্যানিতেই যাবো আমরা তল্পিতল্পা গুটিয়ে। যদিও জনের কাছে যে স্যালারির আশ্বাস পেলাম, তাতে মনটা খুবই দমে গেলো।

এক বৈজ্ঞানিক জার্নালের পাতায় জন হেনসের কাছে আমার কাজের খবর। শেষ প্যারাগ্রাফ।

অর্থাৎ, আবার সেই দারিদ্র্যদশা। আবার মুক্তিকে নতুন কাজ খুঁজে নিতে হবে। ততদিন পর্যন্ত আবার সেই কৃচ্ছসাধন, এবং শরীর পাতন।

তার ওপর যেটা একেবারেই বুঝতে পারিনি, অলব্যানির অতি দীর্ঘ, ধূসর, কুয়াশাচ্ছন্ন শীত।

এক মাসের জন্যে একা একা থাকতে হবে আমাকে নতুন শহরে। আমি জনের বাড়িতেই থাকবো। হেন্স দম্পতি অতি উদার। চমৎকার একটা ঘর ছেড়ে দিলেন আমাকে তাঁদের ডেলমার এলাকার বাড়ির দোতলায়।

অক্টোবর মাসের শেষ দিকে কার্বনডেলের মায়া কাটিয়ে অ্যামট্র্যাক নামক মার্কিনি দূরপাল্লার ট্রেন ধরে এক সন্ধ্যেয় এসে পৌঁছোলাম রেনসেলেয়ার স্টেশনে।

রেনসেলেয়ার রেল স্টেশন।

বাদামি চামড়ার জ্যাকেট পরে পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়েছিল জন। স্যুটকেস নিয়ে আমি নামলাম প্ল্যাটফর্মে।

একমুখ দাড়ি, আর একমুখ হাসি নিয়ে জন আমার সঙ্গে উষ্ণ করমর্দন করলো। বললো, “ওয়েলকাম টু নিউ ইয়র্ক।”

(চলবে)

*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।

ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।

‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

Developed by DXDasia