মেরিকামায়া সাতকাহন : দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে মেয়ের অন্নপ্রাশন

ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ২৪

ত্রয়োবিংশ পর্বের পর

তেজেন সরকার আর সীমা সরকারের সঙ্গে আলাপ হয়ে গেলো সুপারমার্কেটের চেকআউট লাইনে।

যেমন এদেশে অনেকবারই হয়েছে আর কী, হয় আমাদের বাংলা কথা শুনে অন্য বাঙালি এগিয়ে এসে আলাপ করেছে। আর নয়তো আমরা।

“আপনারা বাঙালি?” বাঙালি না হলে, “ইউ আর ফ্রম ইন্ডিয়া?”

নরমাল-ব্লুমিংটনে সে সম্ভাবনাও প্রায় ছিলো না, কারণ আমাদের গাড়িই ছিলো না প্রথম দুটো বছর। ফলে ব্লুমিংটনের সুপারমার্কেট বা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে যাওয়ার কোনো সুযোগই হতো না। ওই হয়তো আবাবা কাবাডা তার গাড়িতে করে কালেভদ্রে নিয়ে যেত। তাছাড়া, পকেট ঢুঁঢুঁ, সুতরাং গিয়ে হবেটা কী?

আমাদের প্রথম প্লীমুথ ভ্যালিয়েন্ট গাড়ি – আইএসইউ কার্ডিনাল কোর্টের সামনে মুক্তি

তাও, হয়তো কদাচিৎ কোনো বাদামি-অলিভ গাত্রবর্ণের আর পরিচিত কোমলতার মুখের মানুষের সঙ্গে দেখা হয়ে গেছে।

কখনো উত্তাপ অনুভব করেছি। বন্ধুত্বের উত্তাপ। পরিচয় হয়েছে, ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। আবার কখনো বা উত্তাপের অভাব অনুভব করেছি। দুঃখ পেয়েছি তখন।

আইএসইউ’তে থাকার সময়ে সেই ডাক্তার রবি কাটুর আর তার পরিবারের মাধ্যমেই ইন্ডিয়ান কিছু ফ্যামিলির সঙ্গে আলাপ হয়েছে। তখন থেকেই দেখেছি তাদের ইন্ডিয়া নিয়ে মাতামাতি, কিন্তু ইন্ডিয়া সম্পর্কে জ্ঞানের একান্ত অভাব। যাক, সেকথা এখন নয়।

তেজেন আর সীমা বাংলাদেশের উত্তাপ প্রথম নিয়ে এসেছিলো আমাদের নিঃসঙ্গ জীবনে। তারপর তারা বললো আরো বেশ কয়েকজন বাঙালি বন্ধুর কথা। কার্বনডেল তার নতুন নতুন বন্ধুত্বের সম্ভাবনার দরজা খুলে দিলো আমাদের সামনে। একাকীত্ব আগের মতো তেমন আর থাকলো না।

“হ্যাঁ, আমরা কলকাতার। আপনারা?”

“আমরা বাংলাদেশের। আপনারা কোন ডিপার্টমেন্ট?”

“আমি প্ল্যান্ট বায়োলজিতে এসেছি এই সবে। আমার স্ত্রী মুক্তি এখনও কাজ পায়নি। আর এই আমাদের মেয়ে নন্দিনী। আপনারা?”

তেজেন ম্যাথামেটিক্স বিভাগের পিএইচডি ছাত্র। সীমা অনেক ছোটো বয়সে। সবে এসেছে আমেরিকায়। এখনো খুব একটা বাড়ির বাইরে বেরোয় না। ওদের বিয়ে হয়েছে সম্প্রতি।

পরিচয় ক্রমে ঘনিষ্ঠতায় পরিণত হলো।

কান্ট্রি ফেয়ার গ্রোসারি সুপারমার্কেটের ভেতরে মাঝে মাঝেই বেজে চলা মিউজিকটা এখনো আবছা আবছা মনে আছে। সবাইকে সুরের মাধ্যমে স্বাগত সম্ভাষণ।  তখন মনে হতো, এটাই যেন একটা বিশালতম সুপারমার্কেট। তখন সবে নরমাল নামক ক্ষুদ্র ক্যাম্পাস টাউন থেকে এসেছি, সেখানকার সেই একমাত্র গ্রোসারি স্টোর “সুপার ভ্যালু” ছাড়া আর কিছু দেখিনি। কার্বনডেল সেই তুলনায় অনেক বড়ো ক্যাম্পাস।

সুপার ভ্যালু যদি হয় আমাদের গোয়াবাগান পার্ক, কান্ট্রি ফেয়ার সে তুলনায় ইডেন গার্ডেন। মনে হলো, আহা, এই নাহলে আমেরিকা! গ্রোসারির দোকানের একদিক থেকে আর একদিক দেখা যায় না। অহো! ওহো!

মনে আছে, মুক্তির মা তাঁদের একমাত্র আমেরিকার ভ্রমণে যখন এই কার্বনডেলে এসেছিলেন, তখন এই কান্ট্রি ফেয়ারকে দেখে বলেছিলেন, “এ যে স্বপ্নপুরী!”

সুপারমার্কেট কান্ট্রি ফেয়ারে গ্রোসারি করে ফিরে আমাদের গাড়ি থেকে জিনিসপত্র নামানো হচ্ছে

তেজেন শান্ত স্বভাবের ছেলে। চুপচাপ। সীমাও তাই। ফলে, প্রশ্নোত্তরের বেশিরভাগ আমাকেই করতে হলো।

আমি – “এখানে আর বাঙালি নেই?”

তেজেন – “আসে। বেশ কয়েকজন আসে।”

সীমা – “মনিরুল ভাই, কিশোয়ারা ভাবী। তারপর আসেন…”

আমাদের উল্লাস আর ধরে না।

ঠিক হলো, আমাদের বাড়িতে নতুন বন্ধুদের ডাকা হবে। যে রিচুয়াল মুক্তির হসপিটালিটি আর রান্নার সৌজন্যে এই প্রায় চার দশকের মার্কিনি জীবনে আমরা করে গেছি। নরমালে থাকার সময়েও করেছি। সেই সুনীতা, গোবিন্দা, আবু হায়দার, আরো সবাই। কার্বনডেলে সে সম্ভাবনা শতগুণে বাড়লো। আর কী চাই, এই তো চেয়েছিলাম। নতুন নতুন বন্ধু, বান্ধবী। আড্ডা, গান, হৈহৈ, খাওয়াদাওয়া।

প্রথম “ডিনার পার্টি” যাকে বলে, হোস্ট করা গেলো আমাদের সেই ছোট্ট এক শয়নকক্ষের ফ্ল্যাটেই। তেজেন আর সীমা আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলো মনিরুল আলম, তাঁর স্ত্রী কিশোয়ারা, তাঁদের একটা পাঁচ বছরের ছেলে। আরো কয়েকজন।

তারপর আর কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের মেয়ের অন্নপ্রাশন অনুষ্ঠান করলাম আমরা। সেখানে এসে হাজির হলো টেনেসী থেকে আমাদের নতুন-পাওয়া পরিবার মুনমুন, রবিদা, আর তাদের দুই ছেলেমেয়ে রুবাই আর রিয়া। ডাকা হলো সেই যাদের বাড়িতে বিপুল সোলাঙ্কি আর আমি এসে একটা রাত কাটিয়ে গিয়েছিলাম, সেই মিত্রজিৎ, জয়দীপ, তাদের তামিল রুমমেট ভেঙ্কটা শনটি, আরও কে কে যেন।

দক্ষিণ ইলিনয়তে আমাদের মেয়ের অন্নপ্রাশন, টেনেসী থেকে মুনমুন মেয়েকে খাইয়ে দিচ্ছে

মুনমুন করিৎকর্মা রমণী। আমাদের মেয়ের সাজসজ্জার ভার সেই নিয়েছিল। সামান্য কিছু আয়োজন। দেশ থেকে দশ হাজার বারো হাজার মাইল দূরে বসে দাদু দিদা আরো সব নিজের মানুষগুলোর থেকে অনেক অনেক দূরে একমাত্র সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার সামাজিক রীতি পালন করা হলো।

মেয়ের অন্নপ্রাশন অনুষ্ঠানে রবিদা, পারভেজ, মিত্রজিৎ, বাংলাদেশের কিশোয়ারা বেগম, আমি (বাঁ দিক থেকে) 

পোলাও মাংস পায়েস, ছবি তোলা সে সময়কার আদ্যিকালের ক্যামেরায়। তখন ইন্টারনেটই নেই, সেল ফোন আর ফেসবুক হোয়াটস্যাপ তো কালের গর্ভে।

দু’জন খুব কাছের বান্ধবীর সঙ্গে তখনও আলাপ হয়ে ওঠেনি। রত্না সিনহা আর নাসীম আহমেদের সঙ্গে পরিচয় হলো আরো একটু পরে।

নতুন স্কুলে নতুন ডিপার্টমেন্ট। অচেনা সব অধ্যাপক অধ্যাপিকা, ছাত্রছাত্রী।

সেই আইএসইউ’তে প্রথম যেমন গিয়েছিলাম দুরুদুরু বক্ষে, এখন আর সেসব নেই। বুক ফুলিয়ে গিয়ে হাজির হলাম একদিন জানুয়ারি মাসের আট দশ তারিখ নাগাদ। স্প্রিং সিমেস্টার শুরু হবে আর কয়েকদিন পরেই। ক্লাস নিতে হবে, তার জন্যে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে, গাইড প্রফেসরের কাছ থেকে রেজিস্ট্রেশন স্লিপে সই নিতে হবে। আমার গাইড আগে থেকেই ঠিক করা আছে। সেই যে একবার এসে দেখা করে গিয়েছিলাম ডঃ ওয়াল্টার সান্ডবার্গের সঙ্গে।

ওয়াল্টার সান্ডবার্গ বিশালদেহী মানুষ। হাসিমুখ নিশ্চয়ই, আর সঙ্গে একটা মানানসই দাড়ি আর কর্ড দিয়ে ঝোলানো সোনালী ফ্রেমের চশমায় তাঁকে বেশ স্মিতপ্রজ্ঞ দেখায়। ইংরিজিও বোঝা খুব সহজ, কারণ তিনি আসলে বড়ো হয়েছেন ক্যালিফোর্নিয়াতে। সেখানেই ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফর্নিয়ার ডেভিস ক্যাম্পাসে তিনি পিএইচডি করেছেন। তারপর এসে হাজির হয়েছেন জীবনধারণের তাগিদে এই দক্ষিণ ইলিনয়তে।

কত প্রজাতির ছত্রাক। সান্ডবার্গ ও আর এক সতীর্থ – হাতে এক বিশেষ প্রজাতির শ্যানটারেল

এদেশে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের ডিপার্টমেন্টের পরের হেড ডঃ লরেন্স ম্যাটেন নিউ ইয়র্কের খ্যাতনামা কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন বলে শুনেছি। সান্ডবার্গ পিএইচডি করেছিলেন তাঁর মেন্টর নামকরা মাশরুম ট্যাক্সোনমি অর্থাৎ শ্রেণীবিন্যাস বিজ্ঞানের হ্যারি থিয়ার্সের কাছে। তেমনই ম্যাটেন করেছিলেন সুখ্যাত উদ্ভিদ-প্রত্নবিদ চার্লস বেকের কাছে। তিনি আবার ছিলেন মিশিগানে।

আমেরিকায় কে যে কোথা থেকে কোথায় চলে যায়, এবং সেখানেই বাকী জীবন কাটিয়ে দেয়, কেউ জানে না। এদেশের ভাষা ও জীবনধারণপদ্ধতি সব জায়গাতেই মোটামুটি এক হওয়ার দরুন চলিষ্ণুতা খুব বেশি। আমাদের দেশে বিশেষ করে ভাষার সমস্যার জন্যে বাংলাদেশ থেকে তামিলনাডু বা গুজরাটে গিয়ে কেউ সারা জীবন খুব নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দিয়েছে, এমন বেশি দেখা যায় না। এখন হয়তো সেই মাইগ্রেশন একটু বেড়েছে, তাও আমেরিকার তুলনায় তা নগণ্য।

আমাদের ডিপার্টমেন্টের তখনকার প্রধানের নাম ছিল ডঃ জন ভয়েট। বানানটা হলো ভি ও আই জি টি। আমাদের গোলা উচ্চারণে আমি তো প্রথমে ভয়গট বলে শুরু করলাম একটু ভয়ে ভয়ে। সেই যেমন একেবারে প্রথম প্রথম লাইলকে ‘লিসলি লিসলি’ বলে ডাকতে শুরু করেছিলাম, কারণ বানানটা ওই রকমই ছিল কিনা! তারপর এডগার এমন হাসলো অট্টহাসি যে লজ্জায় মাথা কাটা গেলো। এখানেও সেরকম – কে একটা বলে দিলো “আরে, হি ইজ ভয়েট, নট ভয়গট।” সান্ডবার্গই বোধহয় কারেকশন করে দিয়েছিলো।

এখানে গাইড প্রফেসর যদি বন্ধুর মতো হয়, তাহলে ছাত্র বা ছাত্রী প্রচুর আত্মবিশ্বাস নিয়ে এবং মনের আনন্দে পড়াশোনা, গবেষণা করতে পারে। গাইডকে অনেকসময়ই বলে হয় মেজর প্রফেসর। তার মানে, তোমার মুখ্য পরামর্শদাতা। সে যদি আবার আমাদের রকের বাংলায় টেঁটিয়া-মার্কা হয়, তাহলে স্টুডেন্টের জীবন ওষ্ঠাগত করে দিতে পারে। এমন মেজর প্রফেসরও পরে দেখেছি, এবং তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয় বাঙালি, নয় ভারতীয়, আর নয়তো ইরান বা অন্য কোনো তৃতীয় বিশ্বের দেশ থেকে আসা এখন হঠাৎ আধুনিক হয়ে ওঠা মার্কিনি প্রফেসর, যারা তাদের আমেরিকান ছাত্রছাত্রী ও রিসার্চ স্কলারদের সঙ্গে মানুষের মতো ব্যবহার করে, বন্ধুর মতোও, আর সেই একই সময়ে তার দেশীয় স্টুডেন্টের সঙ্গে ব্যবহার করে চাকরবাকরের মতো। ফ্যামিলির দোকান বাজার করিয়ে নেয় তাদের দিয়ে, আর বউকে মলে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া বাধ্যতামূলক, এমন গাইডও দেখেছি অনেকবার।

(চলবে…)

*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।

ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।

‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

Developed by DXDasia