
‘ও মনে করত, পৃথিবীতে হিংসার কোনও জায়গা নেই। যারা কাপুরুষ, তারাই হিংসার আশ্রয় নেয়’
ডিভোর্সের পরেও তিক্ত হয়নি সম্পর্ক। বরং সহজ বন্ধুত্বের ধারা অটুট ছিল তাঁদের মধ্যে। গৌরী লঙ্কেশ ও চিদানন্দ রাজঘাট্টা। গৌরীর মৃত্যুর পর, ফেসবুকে চিদানন্দ পোস্ট করেন গৌরীকে নিয়ে তাঁর স্মৃতিকথন। সেখান থেকেই নির্বাচিত অংশ তুলে ধরা হল এখানে –
“…মৃত্যুর পর ওর জন্য যে সব বার্তা এবং প্রার্থনা এসেছে, তাদের মধ্যে ‘আত্মা, ‘মৃত্যুর পরে শান্তি’, ‘স্বর্গ’ এ-ধরনের শব্দ অজস্র। গৌরী সেগুলো পড়লে নির্ঘাৎ হেসে লুটিয়ে পড়ত। কে জানে… হয়তো লুটিয়ে পড়ত না, কিন্তু হাসত নিশ্চিত। উনিশ-কুড়িতেই আমরা ঠিক করে ফেলেছিলাম, মৃত্যুর পরে স্বর্গ-নরক একেবারে ফালতু বিষয়, পৃথিবীর বুকে যে স্বর্গ-নরক রয়েছে সেটাই বুকে বাজে বেশি। সব সময় ঈশ্বরকে বিরক্ত না করে, তাঁকে বরং নিজের মতো থাকতে দেওয়াটাই ঠিক হবে।
“…দুজনের প্রথম দেখা ন্যাশানাল কলেজে, যা ছিল ভারতের যুক্তিবাদী আন্দোলনের আঁতুড়ঘর। এই আন্দোলনের হোতা ছিলেন আমাদের অধ্যক্ষ এইচ নরসিমাইয়া এবং শ্রীলঙ্কার যুক্তিবাদী আব্রাহাম কোভুর। সেই ভাবধারায় দীক্ষিত হওয়ার ফলে তরুণ বয়স থেকেই আমরা তথাকথিত ‘বাবা’(গডম্যান), ‘মা’ এবং কুসংস্কারকে দূরে সরিয়ে রাখতে শিখেছি, বিরুদ্ধ যুক্তি পছন্দ না হলেই প্রশ্ন তুলতে শিখেছি।
“…আমাদের বিচ্ছেদের সময় এবং তার পরেও গৌরীর বাবার সঙ্গে আমার দেখা হত। তিনি শুধু বিখ্যাত বিখ্যাত লেখক, নাট্যকার এবং পরিচালকই ছিলেন না, তাঁর লেখা থেকে যুগ যুগ ধরে রসদ পেয়ে আসছেন বিদ্রোহী লেখক এবং সাংবাদিকরা।
“…২০০০ সালে গৌরীর বাবা আমাদের ছেড়ে চলে যান। সেদিনই নিজেকে ‘বাবার মেয়ে’ বলে প্রমাণ কে গৌরী, পত্রিকার দায়িত্ব তুলে নিয়ে। শেষ দিন পর্যন্ত সেই লড়াইটা ও চালিয়ে গিয়েছে।
“…ও যে বাঁ দিকে ঝুঁকে ছিল, এ নিয়ে কারও মনে সন্দেহ ছিল না, কিন্তু ওর ভাবনায় কোনও ভুল ছিল না। ও মনে করত, পৃথিবীতে হিংসার কোনও জায়গা নেই। যারা কাপুরুষ, তারাই হিংসার আশ্রয় নেয়।
“…একদিন ফোনে বলল, ছেলেকে নিয়ে আসছে। জানতে চাইলাম, ‘দত্তক নিলে নাকি?’ হেসে বলল, ‘কানহাইয়া কুমার, দেখো ওকে তোমার ভালো লাগবে।’ কিছুক্ষণ পরে ফোন করে বলল, ফ্লাইট লেট, ও আসতে পারবে না। সেই শেষ ওর গলা শুনেছিলাম।”
