
জীবন-যাপনের নানা মুহূর্ত উঠে এসেছে মন্দিরগাত্রে
অধিকাংশ মন্দিরের সামনের দেওয়ালে দেখা যায়, রাম-রাবণের যুদ্ধ দৃশ্যসহ অন্যান্য রামায়ণ কাহিনী, কৃষ্ণলীলা বিষয়ক ভাস্কর্যফলক এবং তৎসহ অন্যান্য পৌরাণিক দেবদেবী। মন্দির দেওয়ালে দেবতাদের কাহিনী ছাড়াও মর্ত্যলোকের মানুষের জীবনযাত্রাও মন্দিরশিল্পীরা খোদাই করতে কুণ্ঠিত হননি। সেদিক থেকে অভিজাত শ্রেণীর নানান ক্রিয়াকলাপ অনেক বেশি পরিমাণে স্থান পেলেও গণজীবনের কথাও কম রূপায়িত হয়নি। মোট কথা, মন্দিরশিল্পীরা দেবদেবীর মাহাত্ম্য ছাড়াও সেকালের আপামর জনসাধারণের সামাজিক অর্থনৈতিক ও বৃত্তিগত জীবনের যে চিত্রগুলি দেবালয় অলংকরণের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন তা শেষ মধ্যযুগের বাংলার সামাজিক ইতিহাসের এক মূল্যবান দলিল বলেই গণ্য হতে পারে।
মন্দির দেওয়ালে রূপায়িত এইসব ‘টেরাকোটা’ ফলকের মধ্যে পর্তুগিজ জলদস্যুদের অথবা ইংরেজ বণিকদের বৃহদাকার রণতরীর দৃশ্য এ জেলার বহু মন্দিরে দেখা যায়। উদাহরণ হিসাবে তিলন্তপাড়ার (থানা সবং) জানকীবল্লভ, চাউলি গ্রামের (থানা ঘাটাল) শ্রীধরজিউ এবং পূর্ব গোপালপুর গ্রামের (থানা পাঁশকুড়া) রাধাবিনোদনের মন্দিরের কথা বলা যেতে পারে। এছাড়া বিদেশী কুঠিয়ালদের চলফেরাকে কেন্দ্র করে এমন সব ফলক মন্দিরগাত্রে দেখা যায়, যেখানে বহুল-অলংকৃত পালকি বা সেকালের সুখাসনে ভ্রমণরত এইসব ফিরিঙ্গি নল হাতে তাকিয়ায় অর্ধশয়ান এবং কতকগুলি ফলকে আবার পালকির পাশে হুঁকোবরদার এবং নিচে পোষা কুকুর। অবশ্য এ ধরনের দৃশ্যের উৎস ছিল ইউরোপীয় বণিক, কুঠিয়াল বা ইংরেজ রাজকর্মচারীরা, যাদের গ্রামাঞ্চলে নানাস্থানে যাতায়াত করতে হতো। এই বিষয়ের পোড়ামাটির ফলকের জন্য দ্রষ্টব্য, তিলন্তপাড়ার জানকীবল্লভ এবং চেঁচুয়া গোবিন্দনগরের (থানা দাসপুর) রাধাগোবিন্দের মন্দির।
শিকারদৃশ্যের ফলক এ জেলার মন্দিরে একেবারে ছয়লাপ। দেখা যাবে, ইউরোপীয় বা দেশী অভিজাত শিকারীরা ঘোড়া বা হাতির পিঠে চড়ে চলেছেন শিকারে। এক্ষেত্রে আক্রান্ত পশু হল সাধারণত বাঘ এবং কখনো কখনো হরিণ ইত্যাদি। উল্লেখযোগ্য শিকার দৃশ্য দেখা যেতে পারে, বাদাড় গ্রামের (থানা কেশপুর), জগন্নাথ মন্দির, নবগ্রামের (থানা ঘাটাল), গোপালের মন্দির, চেঁচুয়া-গোবিন্দনগরের (থানা দাসপুর) রাধাগোবিন্দজীউ মন্দির, চাঁইপটের (থানা দাসপুর) ব্রজরাজেশ্বর মন্দির, ভট্টগ্রামের (থানা গড়বেতা) দামোদর মন্দির, পুঞঁআপাটের (থানা ডেবরা) দুর্গামন্দির, ক্ষীরপাইয়ের (থানা চন্দ্রকোণা) রাধাদামোদর মন্দির, চাউলির (থানা ঘাটাল) শ্রীধরজীউ মন্দির, দন্দীপুরের (থানা ঘাটাল) রঘুনাথজীউ মন্দির, মালঞ্চের (থানা খড়্গপুর) দক্ষিণ কালীর মন্দির প্রভৃতির দেওয়ালে।
ফিরিঙ্গি সাহেবদের এবং অভিজাতদের কীর্তিকলাপ ও জীবনযাত্রা যেমন উৎকীর্ণ হয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে মেদিনীপুর জেলার মন্দির ভাস্কর্যে কিছু কিছু প্রতিফলন ঘটেছে। তবে আলোচ্য সময়সীমার মধ্যে অর্থাৎ খ্রিস্টীয় সতের থেকে উনিশ শতক অবধি সময়ে, বাঙ্গালীর সমাজজীবনের যে সর্বাঙ্গীন প্রতিফলন ঘটেছে এমন কথা বলা যায় না।
এই জাতীয় সাধারণ মানুষের বৃত্তিগত জীবনের একটি চিত্র হচ্ছে কর্মকারদের জীবন, মেদিনীপুর জেলার ঘাটাল এলাকা থেকে সংগৃহীত এমন এক পোড়ামাটির ফলকে দেখা যায়, একজন কর্মকার বাঁ-হাতে হাপর ধরে হাওয়া দিচ্ছে ডান হাতে সাঁড়াশি ধরে চুল্লীতে রাখা কোন লোহার দ্রব্য ধরে আছে।
গ্রাম্য আর একটি সম্প্রদায় হল শিউলি সম্প্রদায়-যারা খেঁজুর বা তালগাছ থেকে রস বের করে গুড় সরবরাহের কাজ করতেন। এ জেলার খ্রিস্টান সতের শতকের রামকান্তপুরের (থানা দাসপুর) গোপীনাথ মন্দিরে উৎকীর্ণ এক ফলকে দেখা যায় এমন এক শিউলির কর্মতৎপরতার দৃশ্য, যিনি খেজুরগাছ থেকে কোমরে কলসি ঝুলিয়ে নামছেন। খেটে-খাওয়া মানুষের জীবনচিত্র এ জেলার মন্দিরের ফলকে যা রূপায়িত হয়েছে, তার মধ্যে দেখা যায়, গোপ সম্প্রদায় বাঁকে করে দুধের কলসি ইত্যাদি বহন করে চলেছে। এই ধরনের ফলক দেখা যায়, আজুড়িয়ার (থানা দাসপুর) লক্ষ্মীজনার্দন মন্দির ও আনন্দপুরের (থানা কেশপুর) বাগ পরিবারের দামোদর মন্দিরের দেওয়ালে। নৌকার দাঁড়ি-মাঝিদেরও দেখা যাচ্ছে এ জেলার মন্দির টেরাকোটায়। বাবুরা গড়গড়ার নল টানছেন- দাঁড়ি-মাঝিরা দাঁড় টানছেন, এমন দৃশ্য দেখা যায় আমোদপুরের (থানা ডেবরা) সীতারামজীউর এবং রামচন্দ্রপুর (থানা ময়না) গ্রামের মন্দিরে।
এখন আর ব্যাধ সম্প্রদায়ের দেখা পাওয়া যায় না। চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে আমরা কালকেতু ব্যাধের পরিচয় পাই। একদিন এইসব ব্যাধ সম্প্রদায় তাদের দেশীয় তীর-ধনুক ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি দিয়ে পশুপাখি শিকার করতেন। এ জেলার পাথরা গ্রামের (থানা মেদিনীপুর) বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্দিরের অলংকরণ-ফলকে আমরা একজন পাখিশিকারী ব্যাধকে দেখতে পাই, যিনি একগাদা বাঁশের নল জুড়ে দেশীয় প্রথায় পাখি শিকারে রত।
ব্যাধ সম্প্রদায়ের মত সাপুড়ে সম্প্রদায়কেও মন্দির টেরাকোটায় দেখা যায়। চাউলি গ্রামের (থানা ঘাটাল) শ্রীধর মন্দিরে আমরা এক সাপুড়ে সাপ খেলানোয় রত দেখতে পাই।
অন্যদিকে, গ্রাম-গ্রামান্তরে ভালুক খেলা দেখিয়ে যে সম্প্রদায় তাদের গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা করতেন, তাদের ভালুক খেলা দেখি চেঁচুয়া-গোবিন্দনগরের (থানা দাসপুর) মন্দিরে। সে ফলকচিত্রে দেখা যাচ্ছে, ভালুকের গলায় বাঁধা দড়ি ভালুক খেলাওয়ালার এক হাতে এবং অন্য হাতে রেয়েছে একটি লাঠি।
সে সময় নানান খেলাধূলা ও মল্লক্রীড়া গ্রাম-বাংলায় প্রচলিত ছিল। এই ধরনের মল্লক্রীড়া বিষয়ক ফলক দেখা যায়, কুশমুড়ির (থানা নারায়ণগড়) ব্রজরাজ ও রামকৃষ্ণপুরের (থানা দাসপুর) বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দিরে।
নানাবিধ শারীরিক কসরত ও ক্রীড়ার দৃশ্য আমরা আধুনিক কালের সার্কাস দলের প্রদর্শনীতে দেখতে পাই। কিন্তু একদা এই বাংলায় বিভিন্ন ধরনের শারীরিক কসরত ও ভারসাম্য রক্ষার খেলা দেখানোর জন্য গ্রামে গ্রামে একদল ক্রীড়া-প্রদর্শনকারীদের দেখা যেত। অঞ্চলভেদে কোথাও কোথাও এই ধরনের ক্রীড়া-প্রদর্শনকে বলা হ’ত ‘বাঁশবাজি’ খেলা অথবা ‘চিংড়েখেল’। খেজুড়ি থানার দেচীচকের রাধাকান্ত মন্দিরে স্থান পেয়েছে এমন এক চিংড়েখেলের দৃশ্য, যেখানে পাশাপাশি দু’জন কসরতকারিণী পিছন দিক থেকে একটি পা তুলে মাথার উপর রেখেছেন এবং উভয়েরই মাথার উপর দণ্ডায়মান আর এক মহিলা খেলোয়াড় নানাবিধ কসরত প্রদর্শন করেছেন এবং এর পাশেই রয়েছে ঢোল-বাজনরত এক পুরুষ।
অন্যদিকে, অন্তঃপুরবাসিনী নারীদের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কেও পোড়ামাটির ফলকে বহু দৃশ্য উৎকীর্ণ করা হয়েছে, কাঁকালে রাখা গাগরীসহ কুলবধূর মূর্তি খোদিত হয়েছে ঘাটালের বৃন্দাবনচন্দ্র মন্দিরে। আবার সন্তান ক্রোড়ে জননীর দৃশ্যরূপ সংক্রান্ত উৎকৃষ্ট ফলক দেখা যায়, মহাকালপোতার (থানাঃ দাসপুর) বাণেশ্বর শিব ও ইয়াকুবপুরের (থানাঃ ঘাটাল) পান পরিবারের মন্দিরে।
এছাড়া ‘মাছেভাতে’ বাঙালির পরিচয় তুলে ধরেছেন মন্দিরশিল্পীরা। কুলনারী মাছকুটুনীর এমন এক ভাস্কর্য ফলক দেখা যায়, ভট্ট গ্রামের (থানাঃ গড়বেতা) দামোদর মন্দির ও কুমামুড়ির (থানাঃ নারায়ণগড়) ব্রজরাজ মন্দিরে।
অন্তঃপুরিকাদের অবকাশ জীবন সম্পর্কেও পোড়ামাটির ফলকে বহু বৈচিত্র্যময় দৃশ্য উৎকীর্ণ করা হয়েছে। অবকাশ বিনোদন হিসাবে কুলবধূরা সেকালে পশুপাখি চর্চায় যে নিজেদের ব্যাপৃত রাখতেন তার উদাহরণ হিসাবে দেখা যায়, পোষা পাখি ক্রোড়ে বা পোষা হরিণকে গাছের ডাল নুইয়ে পাতা খাওয়ানোয় ব্যস্ত নারীর রূপায়ন। মন্দির অ লক্ষ্মীপুর (থানাঃ চন্দ্রকোণা) গ্রামের রামসুন্দর শিবমন্দিরে।
এছাড়া গ্রাম্য রমণীদের অবকাশ বিনোদনের আর যে উপায় ছিল তা হ’লে প্রসাধন ও কেশচর্চা। মেয়েদের চুল নিংড়ানোর দৃশ্য সমন্বিত ফলক দেখা যায়। এ জেলার বিভিন্ন মন্দিরে, যথা রাজহাটি গ্রামের শিখর দেউল, বাদাড় গ্রামের জগন্নাথ মন্দির, ক্ষীরপাই গ্রামের রাধাদামোদর মন্দির, লক্ষ্মীপুরের শিবমন্দির, লছিপুরের শ্রীধরজীউ মন্দির এবং যশোড়া গ্রামের শিবমন্দিরে। অন্যদিকে প্রসাধনের আর একটি ভিন্ন দৃশ্য দেখা যায়, করকাই গ্রামের (থানাঃ পিংলা) লক্ষ্মীবরাহ মন্দির ও চেঁচুয়া- গোবিন্দনগরের (থানাঃ দাসপুর) রাধাগোবিন্দ মন্দিরে, যেখানে এক নারী অন্য এক বধূর কপালে সিঁদুর টিপ পরিয়ে দিচ্ছেন।
(‘জেলা লোক সংস্কৃতি পরিচয় গ্রন্থ-মেদিনীপুর’ –এর তারাপদ সাঁতরা রচিত ‘মন্দির ভাস্কর্য’ রচনার নির্বাচিত অংশ)
