
সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ৩৬
১৯৪৮ সালের ৪ এপ্রিল কল্যাণী কুণ্ডু’র উদ্যোগে মথুরাপুর শ্রীরামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ নারী শিক্ষা মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়। তিনি ছিলেন এই স্কুলের সহকারি শিক্ষিকা। স্কুলটিকে সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাঁর অবদান অনেকটাই। শ্রীশ চন্দ্র দাস স্কুল তৈরির জন্য ৩৩ শতক জমি দান করেছিলেন। এছাড়াও রাজনীতিক সত্যরঞ্জন বাপুলির এই স্কুল প্রতিষ্ঠার পিছনে বড়ো ভূমিকা ছিল। গ্রামের বাইরে যাতে মেয়েরা পড়তে না যায় তার জন্য শ্রীশ চন্দ্র দাস এই জমি দান করেছিলেন। তখন যাঁদের অর্থ-সম্পত্তি ছিল, তাঁরা সমাজসেবার লক্ষ্যে এই ধরনের কাজ করে থাকতেন। তার ফলে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলায় অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছিল। এরকমই একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো মথুরাপুর শ্রীরামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ নারী শিক্ষা মন্দির।
প্রথমে এই স্কুলে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পঠন-পাঠনের ব্যবস্থা নিয়েই যাত্রা শুরু হয়। তার পরে ১৯৬৪ সালে স্কুলটি মাধ্যমিক স্তরে উন্নীত হয়। শেষ পর্যন্ত ২০১০ সালে এই স্কুলটি উচ্চমাধ্যমিক স্তরে উন্নীত হয়। তবে, বর্তমানে ছাত্রী রয়েছে ৭৭২জন,। শিক্ষিকা ৮জন, ২জন প্যারা টিচার, একজন কম্পিউটার শিক্ষিকা, ২জন করণিক আছেন এবং সংখ্যালঘুদের জন্য স্কুলে একটি হস্টেল আছে। বদলি নিয়ে শিক্ষিকারা অন্য স্কুলে চলে যাওয়ায় বর্তমানে স্কুলে শিক্ষিকার ঘাটতি রয়েছে। তাই সীমিত সংখ্যক শিক্ষিকা ও পার্টটাইম শিক্ষিকা দিয়ে কোনওক্রমে স্কুলের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। স্কুলের টিচার-ইন-চার্জ মোনালিসা হালদার এই কথা জানালেন।

মথুরাপুর ১ নম্বর ব্লকের এই স্কুলটির সুনাম এখনও অক্ষুন্ন রয়েছে। স্থানীয় এলাকায় অন্য স্কুল থাকলেও মথুরাপুর শ্রীরামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ নারী শিক্ষা মন্দিরে পড়তে আসার একটা দীর্ঘকালীন প্রবণতা রয়েছে। স্কুলের মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল অত্যন্ত ভালো হয়। তবে শিক্ষিকার অভাবে স্কুলে উচ্চমাধ্যমিকে শুধুমাত্র কলা বিভাগ ছাড়া অন্য কোনও বিভাগ শুরু করা যায়নি। এর ফলে এই স্কুল থেকে যারা মাধ্যমিকে ভালো ফল করে, তারা বিজ্ঞান শাখায় পড়তে না পেরে অন্য স্কুলে চলে যাচ্ছে। ফলে, উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ছাত্রীসংখ্যা সেই অর্থে কম। চলতি বছরে একাদশ শ্রেণিতে মাত্র ১১ জন ভর্তি হয়েছে।
সামাজিক সচেতনতার অভাবে নবম, দশম শ্রেণিতে উঠে বিয়ে করার একটা প্রবণবতা লক্ষ্য করা যায়, এই স্কুলের ছাত্রীদের মধ্যেও সেই তা আছে। মূলত মথুরাপুরের এই স্কুলটিতে যারা পড়তে আসে তাদের একটা বড়ো অংশ প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া। তা ছাড়া এদের অভিভাবকরা সেই অর্থে লেখাপড়া জানেন না। রাজ্যের গ্রামীণ ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের মধ্যে এই স্কুলছুটের প্রবণতা তাই বেশি। স্কুলের টিচার-ইন-চার্জ কথায়, “খুব দরিদ্র পরিবার থেকে পড়ুয়ারা পড়তে আসে। বাবা, মা দু’জনই কাজে বেরিয়ে যায়। অনেক মেয়েকে রান্না করে স্কুলে আস্তে হয়। আমরা তাই স্কুলে মাঝে মাঝে মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়ার জন্য ক্লাসের ব্যবস্থা করি। যাতে তারা জীবনে সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছোবার ক্ষেত্রে একটা রাস্তা পায়। আমরা চেষ্টা করি যাদের মধ্যে গান, ছবি আঁকা, আবৃত্তি করার আগ্রহ বা যোগ্যতা আছে তাদের সেই দিকে উৎসাহিত করতে। তার ফলে ছাত্রীরা স্কুল ভিত্তিক ও স্থানীয় স্তরে পুরস্কার পায় গান, ছবি আঁকা, আবৃত্তি প্রতিযোগিতায়। আসলে সীমিত অবস্থার মধ্যে থেকে যতটা মূল স্রোতে মেয়েদের এগিয়ে দেওয়া সম্ভব আমরা স্কুলের তরফে সেই চেষ্টা করি। এই কাজে আমরা কোনও ত্রুটি রাখি না।”

স্কুলের ৭৫ বছর হয়েছে ২০২৩ সালে। ২০২৪-এর ৮ ও ৯ জানুয়ারিতে ৭৫ বছর পূর্তি উৎসব উদযাপন হবে। প্রচুর প্রাক্তনী, যাঁরা এখন প্রতিষ্ঠিত, তাঁরা স্কুলের ৭৫ বছর পূর্তি উদযাপন অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছে। সব রকম ভাবে অনুষ্ঠানটিকে যাতে ভালো করে করা যায় সেই লক্ষ্যে তাঁরা এগিয়ে এসেছেন। একটা সাংস্কৃতিক দলও তৈরি হয়েছে এই কারণে। বর্তমান ছাত্রী, প্রাক্তনী, শিক্ষিকা সবাই মিলে এই অনুষ্ঠান হবে।
স্কুল ছাত্রীরা কন্যাশ্রী সহ সব সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পায়। তবে কন্যাশ্রীর জন্য স্কুলে ভর্তি হয়ে সেই আর্থিক সহায়তা পেয়ে স্কুলে কম ক্লাস করার মতো প্রবণতা এই স্কুলে অনেক ছাত্রীরই নেই। তবে উচ্চমাধ্যমিকে আগামী দিনে যাতে আরও ছাত্রী ভর্তি হয় সেই জন্য চেষ্টা করছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। স্কুলে লাইব্রেরি আছে, লাইব্রেরিয়ান আছে। স্মার্ট ক্লাস নেই। তবে ১৭টি ক্লাসরুম আছে। তিনতলা দুটো স্কুল ভবন আছে। মোনালিসা হালদার জানালেন, “আমরা চাইছি স্কুলে শিক্ষিকা নিয়োগ করুক সরকার। তা হলে আমরা স্কুলটিকে আরও ভালো জায়গায় নিয়ে যেতে পারব। স্কুলের দোতলা, তিনতলায় গ্রিল লাগানো ছিল না। সেটা করেছি। আমরা স্কুলের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে শ্রীরামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, সারদাদেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করব। করোনার ফলে আমাদের একটা ঘাটতি হয়েছিল। আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় মেয়েদের সবার স্মার্ট ফোন, ইন্টারনেট সংযোগ ছিল না। তাই আমরা অনলাইন ক্লাস নিতে পারিনি। সেই সময় খুব সমস্যা হয়েছে। তবে সেই খারাপ সময়টাকে আমরা অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। আমরা চাইছি সরকার আমাদের শিক্ষিকা দিক, তাহলে আমরা আমাদের যা পরিকাঠামো আছে, স্কুলের যা সুনাম আছে তাতে উচ্চমাধ্যমিকে বাণিজ্য, বিজ্ঞান বিভাগ চালু করতে পারলে স্কুলটা আরও ভালো ভাবে চালাতে পারব।”

শহরের বাংলা মাধ্যমে ছাত্রছাত্রী নেই আর গ্রামের বাংলা মাধ্যমে ছাত্রছাত্রী থাকলেও কোনও কোনও ক্ষেত্রে শিক্ষক শিক্ষিকা নেই। এই সমস্যার ফলে বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোর ওপর একটা বড়ো প্রভাব পড়ছে। যার ফলে সার্বিক ভাবে বাংলা মাধ্যম স্কুল, বাংলা মাধ্যম শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর একটা চাপ আসছে। এই পরিস্থিতির শিকার মথুরাপুর শ্রীরামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ নারী শিক্ষা মন্দিরও।
তথ্যসূত্র : মোনালিসা হালদার, টিচার-ইন-চার্জ, মথুরাপুর শ্রীরামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ নারী শিক্ষা মন্দির
ছবি : সংগৃহীত
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।
