আসামের শিলচরে আজকের দিনে মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন ১১ জন বাঙালি

সত্যাগ্রহীদের ওপর নির্মমভাবে গুলি চালানো হয়েছিল

১৯৫২ সালে পূর্ববঙ্গের ঢাকা শহরে মাতৃভাষা বাংলার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতের মতো মতো তরুণেরা। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা এই ঘটনার ফলে পাকিস্তানের অধীনতা থেকে মুক্ত হওয়ার লড়াইয়ে পরিণত হয়। দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৭১ সালে আত্মপ্রকাশ করে স্বাধীন বাংলাদেশ। ঢাকা শহরে বাংলা ভাষার জন্য শহিদদের আত্মবলিদানের ৯ বছর পরে আরও একটা ভাষা আন্দোলন হয়েছিল ভারতের আসাম রাজ্যে। সেই লড়াইয়ে মাতৃভাষা বাংলার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ১১ জন বাঙালি।

১৯৪৭ সালে গণভোটের পর সিলেটকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়। এক ভাগ যায় পাকিস্তানে। আরেকভাগ ভারতের আসাম রাজ্যে। কাছাড়, করিমগঞ্জ এবং হাইলাকান্দি জেলা নিয়ে আসামের বারাক উপত্যকা। এখানকার সবথেকে বড়ো শহর শিলচর। আসামে বাস করেন প্রচুর বাঙালি, আর বারাক উপত্যকায় বাঙালিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। যদিও স্বাধীনতার পর আসামের একদল উগ্র প্রাদেশিকতাবাদী অসমিয়াকেই রাজ্যের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে মান্যতা দেওয়ার প্রচেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছিল।

১৯৬০ সালের ১০ অক্টোবর আসামের মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চলিহা অসমিয়াকে আসামের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব করেন। বিধানসভায় উত্থাপন করা হয় ‘রাজ্য ভাষা বিল’। পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা চলার পর সব রকম বিরোধিতাকে উপেক্ষা করে ২৪ অক্টোবর এই বিল চূড়ান্তভাবে বিধানসভায় গৃহীত হয়। এর ফলে অসমে বসবাসকারী বাঙালিদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। 

আসাম সরকারের এই বৈষম্যমূলক নীতির প্রতিবাদে ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় ‘কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদ’। ১৪ এপ্রিল এই সংগঠনের ডাকে বারাক উপত্যকায় পালিত হত ‘সংকল্প দিবস’। ১৯ এপ্রিল থেকে শুরু হয় পদযাত্রা। বাংলাকেও সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে গ্রামে গ্রামে প্রচার চালানো হতে থাকে। বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। জারি হয় ১৪৪ ধারা।

১৯ মে বারাক উপত্যকায় সর্বাত্মক ধর্মঘট ও পিকেটিং চলতে থাকে। শিশু-বৃদ্ধ-নারী-পুরুষ নির্বিশেষে জনতা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে রাস্তায় নামে। বন্দি করা হয় প্রচুর লোককে। তবুও আন্দোলন চলতে থাকে। 

সেদিন শিলচর রেল স্টেশন অবরোধ করেন সত্যাগ্রহীরা। পুলিশ বাহিনী গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁদের ওপর। পায়ের বুট, রাইফেলে বাট দিয়ে ক্রমাগত আঘাত করতে থাকে। মেয়েদের সম্ভ্রম হরণ করা হল নৃশংসভাবে। সত্যাগ্রহীরা আহত হলেও হার মানলেন না। একজন লুটিয়ে পরেন তো আরেকজন তাঁর জায়গায় চলে আসেন। সরকার কোনোভাবেই শিলচর স্টেশন দিয়ে ট্রেন চালাতে পারল না। দুপুর দু’টোর পর পুলিশি অত্যাচারা একটু স্থিমিত হয়। সত্যাগ্রহীরা নতুন উদ্যমে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন। 

দুপুর আড়াইটে নাগাদ শিলচর স্টেশনের সত্যাগ্রহীদের দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে রাইফেলের গুলি ছুটে আসে। প্যারামিলিটারি বাহিনীর চালানো গুলি লাগে ১২ জনের দেহে। ৯ জন সেদিনই মারা গিয়েছিলেন, পরের দিন আরও ২ জন মারা যান। কমলা ভট্টাচার্য, কানাইলাল নিয়োগী, চন্ডীচরণ সূত্রধর, হিতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্রকুমার দেব, কুমুদরঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, তরণী দেবনাথ, শচীন্দ্রচন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুকোমল পুরকায়স্থ – এই ১১ জন শহিদ হলেন। 

এই ঘটনার পর আসাম সরকার বারাক উপত্যকায় বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।  প্রতি বছর ১৯ মে ভাষা শহিদদের যথাযথ মর্যাদায় স্মরণ করেন বাঙালিরা। 

তথ্যঋণ – অলক রায়, এম গোলাম মোস্তাফা ভুইয়া, প্রীতম চট্টোপাধ্যায়। 

Developed by DXDasia