
চোর আর বিশেষ ক্লায়েন্টের যুগলবন্দীতে বন্যপ্রাণ বাণিজ্য বস্তুত একটি সংগঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র
মানুষ বড় বিচিত্র জীব। যে কোন কিছু নিয়েই সে ব্যবসা ফাঁদতে পারে। টাকার জন্য রণে বনে জলে জঙ্গলে ঢুকেও পড়াটা তার কাছে জলভাত। জঙ্গল সাফ হয়ে যাচ্ছে, তাতে কী, চিড়িয়াখানা তো আছে! কয়েক পিস রেয়ার বন্যপ্রাণ হাতিয়ে নাও। ডলারে পেমেন্ট। বন্যপ্রাণ বাণিজ্য এখন জমজমাট।
মুম্বাই এয়ারপোর্ট থেকে ধরা পড়লো মাদাগাস্কারে চালান হতে চলা ১৪৩টি বিরল প্রজাতির কচ্ছপ। বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জওয়ানদের ধাওয়া করা বাইকের পিছনের কাপড় ঢাকা খাঁচা থেকে বেরোয় বিরল প্রজাতির আফ্রিকান গ্রে প্যারট। আন্তর্জাতিক বাজারে যার একেকটির দাম সাড়ে নয় লাখ টাকা। বেআইনি বণ্যপ্রাণীর ব্যবসা এখন পাঙ্গা নিচ্ছে দেশের মাদক, নকল ব্র্যান্ডেড জিনিস আর মানব পাচারের মত আন্তর্জাতিক অপরাধের সঙ্গে। বছরে দু-হাজার কোটি টাকার ব্যবসা। বিরল প্রজাতির একেকটি তক্ষকের দামই তো আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় কোটি টাকার কাছাকাছি। তক্ষকের কপাল পুড়েছে কারণ তার ভক্ষক বেড়েছে। তার দেহের এটা-ওটা-সেটা খেলে নাকি মানুষের রূপ যৌবন উপচে পড়বে। বলাবাহুল্য এই ব্যবসা সশস্ত্র ও হিংস্র। লোভ এখানে মারতে ও মরতে শেখায়। গত দু-বছরে শুধু কাজিরাঙাতেই বনরক্ষীদের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছে ৩৩ জন চোরাশিকারী।
হাতি, বাঘ, সাপ, কুমীর, কচ্ছপ, তক্ষক, বাঁদর, বনবিড়াল, গন্ডার, প্যাঙ্গোলিন, সম্বর, চিঙ্কারা, হাড়গিলে, মার্মোসেট, লেপার্ড এস্ত সবাই। কারণ তাদের খাঁচায় বেঁধে মেরে কেটে বেচে বাড়ছে মানুষের অর্থ, প্রতিপত্তি, জীবন-যৌবন সবকিছুই। তাদের শিং, দাঁত, নখ, হাড়গোড় মায় অন্ডকোষ সবই চলে গেছে মানুষের দখলে। আমাদের রতিসুখ থেকে আহারবিলাস সবেতেই থেকে থেকে তাদের ডিউটি দিতে হয়। ভবা পাগলা বলে গেছিলেন, ‘ডিউটি দিলে বিউটি বাড়ে।’ এই ডিউটিতে তাদের বিউটি বাড়েনি। মায়ের কৃপাও তারা পায়নি। জীবিত মৃত অথবা অর্ধমৃত অবস্থায় মানুষের দরবারে হাজির হয় তারা।
ঘটনা এখন এমন দাঁড়ি্যেছে যে অরণ্য দাবানল লাগলে বনের সব প্রাণী যেমন প্রাণভয়ে দৌড়য় তেমনই মানুষের ভয়ে দৌড়চ্ছে যাদের ডাক শুনলে শিড়দাঁড়া বেয়ে বরফ নামে তারা। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হাতি আর গন্ডারদের। বন্যপ্রাণ বাণিজ্য রোধে উল্লেখ্য অবদানের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাচ্ছেন উত্তরবঙ্গের বেলাকোবা বনাঞ্চলের রক্ষক সঞ্জয় দত্ত। এই রাজ্যেই বেশ কিছু পশু চোরাকারবারীকে ধরেছেন তিনি। তাঁদের কাছ থেকে উদ্ধার করেছেন পশুপাখির শরীরের নানা অংশ। তার মতে এ রাজ্যের পশু চোরাকারবারীদের মধ্যে গন্ডারকে মারার প্রবণতা সবথেকে বেশি। কারণ গন্ডারের শিংয়ের দাম আন্তর্জাতিক বাজারেও খুব চড়া।
আলিপুর চিড়িয়াখানার কড়া সুরক্ষা ভেঙে বন্যপ্রাণ তস্কররা মার্মোসেট আর তক্ষক চুরি করার ঝুঁকি নিয়েছে কি আর এমনি এমনি! এ মোটেই পাতি চোরের কম্মো নয়। বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত চোর আর বিশেষ ক্লায়েন্টের যুগলবন্দীতে এই বাণিজ্য বস্তুত একটি সংগঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র। গত বছরের মাঝেমাঝি জলপাইগুড়িতে বাজেয়াপ্ত হল ৯ এলবিএস কেউটের বিষ। আন্তর্জাতিক বাজারে যার দাম প্রায় ১০০ কোটি টাকা। ফ্রান্স থেকে বাংলাদেশ, বালুরঘাট, শিলিগুড়ি হয়ে এ বিষ যাচ্ছিল ভুটানে। ঘটনাটা বললাম এদের নেটওয়ার্ক বোঝাতে। রোগশোক নয়, অন্য কোন বনচরের সঙ্গে টিকে থাকার লড়াইয়েও নয়, দেশের বেশিরভাগও বাঘই মারা যায় চোরাশিকারদের হাতে। বন্যপ্রাণকে অভয় দিতে ঢাকঢোল পিটিয়ে অভয়ারন্য হল। তাও কিন্তু বণ্যপ্রাণকে অভয় দিতে পেরেছে? চিনে অত সংরক্ষণের ঝামেলা নেই। সাংস্কৃতির বিপ্লোবোত্তর চিন বানিয়ে ফেলেছে মুরগির খাঁচার মত বাঘেরও খাঁচা। খদ্দেরদের পছন্দ অনু্যায়ী সেখান থেকে বের হয় তারা। সাফাই-কাটাইয়ের পর প্যাকেটবন্দী হয়ে মানুষের বাড়ি পৌঁছানোটাই এখন যেন তার ভবিতব্য।
সবাই অবশ্য মরে না। আলিপুর চিড়িয়াখানা থেকে চুরি করা মার্মোসেটগুলিকে কিন্তু দুর্বৃত্তরা মারেনি। একই জায়গা থেকে চুরি যাওয়া ১১টা তক্ষকের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। দুটি ক্ষেত্রেই চুরি যাওয়া প্রাণীগুলির বেশিরভাগই উদ্ধার হয়েছে। অনেকে বলেন, তস্করেরা এসব কোনও প্রাইভেট জু-র মালিকের কাছে বেচে দেয়।
যারা তন্ত্র-মন্ত্র করেন তারাও সাধনার প্রয়োজনে পশু-পাখি কেনেন বণ্যপ্রাণ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। যেমন তন্ত্রমন্ত্রের কারবারিদের কাছে প্যাঁচার বিরাট চাহিদ। প্যাঙ্গোলিনের শরীর থেকে খুলে নেওয়া হচ্ছে তার শক্ত বর্মের মত আঁশ। তাও নাকি মানুষের প্রয়োজনে লাগে। মাংসের বাজারে চিরকালই খুব চাহিদা কচ্ছপের আর হরিণের। হরিণ, বন্য বরাহ থেকে নীলগাই, কৃষ্ণসার মৃগ-সবারই প্রাণ যায় মানুষের উদরপূর্তির জন্য। চিত্রল কচ্ছপ বিক্রি হয় মূলত পোষার জন্য।
মূলত পূর্ব এশিয়া ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকা অস্ট্রেলিয়ার জুড়ে এই ব্যবসার রমরমা। চোরাশিকারী থেকে শুরু করে পুলিশ, কাস্টমস অফিসার সীমান্তরক্ষী উপকূল রক্ষী, বনরক্ষী, জলপুলি, আইন ব্যবসায়ী, রাজনৈরিক নেতা সব মিলিয়ে এ এক ভুবনজোড়া অংশীদারী কারবার। ইদানিং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা রঙের সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী ও ক্রাইম সিন্ডিকেট। আবার জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে যারা রাষ্ট্রের বিরূদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে তারাও কিন্তু বন্যপ্রাণের বন্ধু নয়। চোরাশিকার ছাড়াও বণ্যপ্রাণী ব্যবসায়ী এবং চোরাশিকারীদের কাছে থেকে তোলা আদায় তাদের একটা নিয়মিত আয়। বেআইনি বণ্যপ্রাণ ব্যবসার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হল এটা শেষ বিচারে প্রাকৃতির ভারসাম্য আর জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে। কেউ বলবেন, কেন ধনকুবেরদের প্রাইভেট জু-তে এসব প্রাণীরা তো খুব আরামেই থাকবে? কিন্তু সে তো আর স্বাভাবিক পরিবেশে সংরক্ষণ নয়। আবার আরেকটা সমস্যাও রয়েছে। বন্যপ্রাণ নিয়ে কথাবার্তা ফিলহাল ফ্যাশান হওয়ার সুবাদে নেতা-অভিনেতা মন্ত্রী-সান্ত্রী আমলারা সবাই বাঘ-হাতির মত বড় প্রাণিদের অস্তিত্ব রক্ষা নিয়ে সরব। প্যাঙ্গোলিন, সাপ, গিরগিটি, গোসাপ, ভোঁদর কুমীর নিধন নিয়ে এদের কিন্তু কোন সাড়াশব্দ নেই! কেউ বলে না প্যাঁচা, তোতা পাহাড়ি ময়নাদের কথা।
আমাদের ভাবনায় একটু বদল আনতে হবে। বাজারটা নষ্ট করা একটা সমাধান হতে পারে। এক সময় দেশি-বিদেশী বড়লোকদের বিশেষ করে হলিউডের তারকাদের পশুর চামড়া দিয়ে পোষাক পড়ার একটি বিরাট কেতাও ছিল। কোন আইনি অনুশাসন নয়, যতই নাক সিঁটকান না কেন এটা বন্ধ হয়েছে পরিবেশবাদীদের প্রচারে। প্রচারের চাপে স্রেফ লজ্জায় এখন সেলেবরা এসব বন্ধ করেছেন। ‘প্রাইভেট জু’ মালিকদেরও বোঝাতে হবে বেআইনি ভাবে পশুপাখী কিনলে কিংবা সেগুলি খাঁচায় রেখে বাহবা নেওয়ার চেষ্টা করলে তাদের কেউ ‘অ্যানিমাল লাভার’ বলবেন না।
ঢাকঢোল পিটিয়ে যাদের আমরা জাতীয় পাখী আর জাতীয় পশু বানালাম সেই বাঘ আর ময়ূরের চামড়া-নখ-দাঁত পালকের বাণিজ্যও বন্ধ করা গেল না। আমাদের জীববৈচিত্রের আবাহান একটা ‘লাইকেই’ শেষ হয়ে যায়।
