মৃত্যুর দিকে মহানন্দা

মহানন্দাকে উপেক্ষা করলে ভয়ঙ্কর মূল্য দিতে হতে পারে শিলিগুড়িকে

মহানন্দা নদী যে দূষিত হতে হতে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে তা এক বাক্যে স্বীকার করেন সকলেই। গ্রিন বেঞ্চের রায় কার্যকর করতে তৎপর প্রশাসন।

কার্শিয়াং শহর থেকে সাড়ে ছয় কিলোমিটার উত্তর পূর্বে মহালিদ্রাম পাহাড়ের ছিমলি থেকে উৎপত্তি মহানন্দার। পাহাড়ের ২০ কিলোমিটার রাস্তা আঁকাবাঁকা পথে অতিক্রম করে এই নদী শিলিগুড়িতে প্রবেশ করেছে। শিলিগুড়ি মূল শহরের ভিতর দিয়ে এটি দেড় কিলোমিটারের সামান্য কিছু বেশি প্রবাহিত হয়েছে। মূল শিলিগুড়ির ভিতর দিয়ে মোট ১৬ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে এটি রাজগঞ্জ ব্লক, ফাসিদেওয়া হয়ে উত্তরদিনাজপুর প্রবেশ করেছে। সেখান থেকে বিহার, বাংলাদেশ হয়ে গঙ্গার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। মাঝখানে এর সঙ্গে মিশেছে বালাসন, মহিষমারি, পঞ্চনই, চামটা প্রভৃতি নদী। এই নদীর মোট ২৫০৪৩ বর্গ কিলোমিটার অববাহিকার মধ্যে ৬৩৪০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে পড়ে। কিন্তু পাহাড় থেকে শিলিগুড়িতে প্রবেশের পরই এই নদী আজ মরতে বসেছে। সেচ দপ্তর থেকে শুরু করে রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ সকলেই এই নদীর মৃতপ্রায় অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন। কিন্তু সকলেই তাঁরা মুখে কুলুপ এঁটেছেন।

কেন মৃতপ্রায় এই নদী? তাঁদের মতে, শিলিগুড়ি শহরে প্রবেশের মুখেই এই নদীর চর দখল করে বাড়িঘর তৈরি হয়েছে। শিলিগুড়ি শহরে যতই এই নদী প্রবেশ করেছে ততই নদী সঙ্কুচিত হয়েছে। নদীর চারপাশে নদীর মুখ আটকে কার্যত দিনের পর দিন জবরদখল করে বাড়িঘর তৈরি হয়েছে। নদীর ধারে খাটালে গিজগিজ করছে। নদীর ধারে লাইন ধরে খাটা পায়খানা। খাটা পায়খানার মল, রোজ সেখানে বহু মানুষের স্নান, উন্মুক্ত শৌচাগার, মহিষ স্নান করানো সবমিলিয়ে নদী বিধ্বস্ত। তাছাড়া শহরের বহু বর্জ্য, নার্সিং হোমের বর্জ্য ফেলার স্থান হিসাবেও বেছে নেওয়া হয়েছে এই নদীকে। ফলে শিলিগুড়ি শহরে নদী আজ অনেকটা নর্দমায় পরিণত হচ্ছে। নদীর আর সেই গভীরতা নেই। শহরের একটু বাইরে নদীর ধারে সব চাসবাস হচ্ছে।

সেভ শিলিগুড়ি ও মহানন্দা বাঁচাও আন্দোলন কমিটির অন্যতম নেত্রী জ্যোৎস্না আগরওয়ালা বলেন, তারা আলাদাভাবে মহানন্দা বাঁচাতে গ্রিন বেঞ্চে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর প্রশ্ন, বহুদিন আগে মহানন্দা বাঁচাতে এস জে ডি এ ৪০ কোটি টাকার যে মহানন্দা অ্যাকশন প্ল্যান নিয়েছিল, তার কী কাজ হয়েছে? কিছুই তো দেখা যাচ্ছে না। হালে আরও কয়েক কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়। সব সরকারি টাকা নদীর জলেই চলে গেছে? উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিদ তথা ভুগোল বিশারদ ডঃ সুবীর সরকার বেশ কিছুদিন আগে এই নদীর দূষণ ও অন্য অবস্থা নিয়ে কিছু সমীক্ষার কাজ করেন। তিনি জানালেন, এই নদী এখন মৃত প্রায়। অথচ নদী এমন ছিল না। নদীতে এখন জলের কারবোনেট এবং বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন বেশি। মল-মূত্র প্রয়োগের কারণে নদীতে সার বাড়ছে। তাতে নদীর ধারে  আগাছা ও ঝোপঝাড় বাড়ছে। তার বাইরে নদীর গতিপথ অবরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। শীতকালে নদীতে জল থাকে না বললেই চলে। আবর্জনার জেরেও নদী তার স্বাভাবিক চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। এই পরিস্থিতিতে সুবীরবাবুর আশঙ্কা, ১) আগামী দিনে নদী খাতের পরিবর্তন হতে পারে, ২) বন্যা হলে নদী অন্যদিকে প্রবাহিত হতে পারে, ৩) বড় বন্যা হলে এই নদী আবার তার যৌবন অবস্থায় ফিরে গিয়ে শিলিগুড়ি শহরের ব্যাপক তছনছ করে অনেক ক্ষয়ক্ষতি করে দিতে পারে।

সেচ দপ্তর থেকে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ এমনকি এস জে ডি এ কর্তারা সকলেই একবাক্যে নদীর এই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া স্বীকার করেন। কিন্তু তারা কি করণীয় সে প্রশ্নে নিরুত্তর। শিলিগুড়িতে এই সময় ছট পুজো ঘিরে মহানন্দার ধারে ছট পুজো করা নিয়ে যখন বিতর্ক তুঙ্গে সেই সময় ছট পুজো আয়োজকদের তরফে রমেশ শা বলেন, তাঁদের পুজো তো একদিনের ব্যাপার, আর সেই সময় নদী দূষণের প্রশ্ন উঠছে অথচ সারা বছর ধরে যখন নদী দূষিত হয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে সেই সময় তো এ নিয়ে কোনও প্রশ্ন উঠছে না। বা এ নিয়ে কোনও কাজ হচ্ছে না। জেলা শাসক জয়সি দাসগুপ্ত বলেন, তাঁদের নজরে আছে নদী দূষণের বিষয়টি। আর সেই অনুযায়ী তাঁরা আগামী দিনে কিছু পদক্ষেপ নেবেন।

Developed by DXDasia