বিচিত্র লোকদেবতা এঁটুঠাকুর

রাঢ়ের লোকদেবতা এঁটুঠাকুর। পূজিত হচ্ছেন সেই আদ্দিকাল থেকে

লোকদেব-দেবীর পুজো মানেই শুধু তথাকথিত পবিত্রতা বা শুচিতা নয়। পুজোর অন্যতম উপকরণ ফুল বেলপাতা বা তুলসিপাতা এসব কিচ্ছুটি লাগে না । লাগে না ফলমূলাদির নৈবেদ্য। একধরনের বুনো ডালপাতা হলেই দেবতা তুষ্ট। আর নৈবেদ্য ? পুরোহিতের এঁটু বা উচ্ছিষ্ট খাবার। তাতেই দেবতা সন্তুষ্ট। এমনি এক বিচিত্র অভিনব রাঢ়ের লোকদেবতা এঁটুঠাকুর। পূজিত হচ্ছেন সেই আদ্দিকাল থেকে।

ঝাড়খণ্ডের জামতাড়া ও বীরভূমজেলার লাগোয়া সীমান্তগ্রাম আম্বা। থানা কুন্ডোহিত। বীরভূমের বাবুইঝোড় থেকে দূরত্ব মেরেকেটে পাঁচ কিম্বা ছয় কিমি। নিকটবর্তী রেলস্টেশন বীরভূমের পাঁচড়া। ছবির মতো গ্রাম আম্বা। গ্রামের বাসিন্দা অন্যতম প্রাচীন জনজাতি বাদ্যকর-ডোম সম্প্রদায়। এদেরই কুলদেবী মনসা আর কুলদেবতা এঁটুঠাকুর। সেবাইত ও পুরোহিত বাদ্যকর-ডোমেরাই। আগে পুজো করতেন বিভূতি বাদ্যকর। বর্তমান পুজারি পঞ্চাশোর্ধ বয়সি সুখদেব বাদ্যকর। ঠাকুর বলতে আয়তকার বেদির মাঝে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো তিনটে গোল গোল পাথর। দুপাশে বড় বড় দুটো মাটির ঘোড়া। গলায় পরানো মালা। মাঝে সারিবদ্ধ ছলন অর্থাৎ মানতের ঘোড়া। পাশেই নামানো আছে বড়ো একটা ত্রিশূল। আর রয়েছে বরণডালা। তাতে অন্যান্য জিনিষের সঙ্গে থাকে আয়না চিরুনি। মাঝে মাঝে পুরোহিত আয়নাতে মুখ দেখে মাথা আঁচড়ায়। তারপরে পুজো করে। এটাই দস্তুর। কখনো কখনো ভর আসে। ভোগ বলতে নানা ধরনের খাবার যথা ডাল তরি-তরকারি চপ-বেগুনি দেশি মদের পাউচ, সিগারেট ইত্যাদি।

এঁটুঠাকুরের নিত্যসেবা হয়। পুরুতমশাই লাল কাপড় পরেন। মাথায় লাল কাপড়ের ফেটি। কোমরে গামছা জড়িয়ে ভক্তি ভরে পুজোয় বসেন সকালে। কপালে জুতসই একটা সিঁদুরের ফোঁটা। হাতে লোহার চিমটে। পুরুতের গলায় থাকে আলুর চপের মালা! দেশি মদের পাউচ। এর নাম তুফান। পিঁয়াজসহ দু একটা গোটা ফলের চেন। মন্ত্র-আপাত অর্থহীন প্রাচীন ঝাড়খন্ডী ভাষায় সুরেলা এক তাল ধ্বনিপুঞ্জ। সঙ্গে তাল সহযোগে চিমটে্র ধাতব সঙ্গত। এক একটা করে চপ ছিঁড়ে, মন্ত্র "মাখিয়ে" তাতে কামড় মেরে খানিকটা পুরুত খেয়ে নেন। বাকিটা দেবতাকে করেন উৎসর্গ। আর থাকে পবিত্র তুফান। বেশ কিছুটা কোঁৎ করে গিলে নিয়ে বাকিটা এঁটুঠাকুরের মাথায়। তখন জোরে জোরে বেজে ওঠে চিমটে। এঁটুঠাকুর সিগারেট টানতেও ভালোবাসেন। বোঁ করে দুটো টান মেরে বাকিটা এঁটুঠাকুরের জন্য পুরতমশাই দিয়ে দেন। পেসাদ পাওয়ার জন্য অনেকেই মুখিয়ে থাকে।

ভাদ্রসংক্রান্তিতে কুলদেবী মনসাপুজো। জাঁকজমক করে পুজো হয়। কবিগান যাত্রা আর ডিজে মাইকের হুঙ্কারে মুখোরিত হয়ে ওঠে আম্বা। পরের দিন অর্থাৎ পয়লা আশ্বিন এঁটুঠাকুরের বাৎসরিক পুজো। তখন চারদিকে হৈ হৈ রৈ রৈ কান্ড! প্রচুর মোরগ বলি হয়। আর সেদিন থাকে স্পেশাল নৈবেদ্য। মনসাপুজোর দিনে যে দশাসই ছাগলের পাঁঠা বলি দেওয়া হয়েছিল দেবীর থানে, তার বিচিদুটো কেটে নিয়ে বিশেষ ভোগের আয়োজন শুরু হয়। বেশ করে তেল-ঝাল মাখিয়ে ভেজে পুরু্তঠাকুর মদ দিয়ে খানিকটা চেখে নেন। পরে ভাগ পান অবশ্যি দেবতা। শেষে এই স্পেশাল প্রসাদ পাওয়ার তাড়নায় লোকের ঠেলাঠেলি আর গুঁতোগুঁতি। বাদ্যকর-ডোমদের কাছ থেকে জানা গেল এঁটুঠাকুরের পুজো না করলে গাঁয়ের কারুর নিস্তার নেই। তিনি জ্বর জ্বালায় জ্বালিয়ে দেবেন গোটা গ্রাম। প্রায় সকলেই তাই বিশেষ ভয় এবং ভক্তি করেন এঁটুঠাকুরকে।

Developed by DXDasia