“গোর্কীর মতো তার চেহারাই যেন চিরাচরিতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ”

সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর লেখা গানে সুর দিয়েছিলেন স্বয়ং পঙ্কজ মল্লিক

রোমান্টিক কাব্য-কবিতার যুগে যখন কবিদের কাছে 'চাঁদ' মানে রোমান্স, ভাবুকতা তখন এক কিশোর কবির কলমে ফুটে উঠল "ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।" এই শক্তিশালী 'কিশোর কবি' আর কেউ নন, কবি সুকান্ত। গালে হাত দেওয়া ভাবুক ছবি দেখা যায় সুকান্তের। কিন্তু যতটা তিনি ভাবুক ছিলেন তার থেকেও তিনি ছিলেন বাস্তববাদী।

'সুকান্ত' নামটি এসেছিল বেশ অদ্ভুতভাবে। সুকান্তের খুব কাছের ছিলেন তাঁর এক জ্যেঠতুতো বোন রাণীদি, সেসময়ের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক মণীন্দ্রলাল বসুর ‘সুকান্ত’ গল্পটি পড়ে রাণীদিই তাঁর নাম রেখেছিলেন ‘সুকান্ত’।

সুকান্তের পৈতৃক নিবাস ছিল বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায়। পরে তাঁরা কলকাতায় চলে আসেন। কালীঘাটের ৪৩, মহিম হালদার স্ট্রীটে ছিল সুকান্তের মাতামহের বাড়ি। ১৫ আগস্ট এই বাড়িতেই জন্মান সুকান্ত।

সুকান্তের পিতা ছিলেন সারস্বত লাইব্রেরীর স্বত্বাধিকারী, যেটি ছিল একাধারে বইয়ের প্রকাশনা ও বিক্রয়কেন্দ্র। বই ব্যবসা থেকে তখনকার দিনে আয় ছিল খুবই সামান্য। যে-কারণে আর্থিক সচ্ছলতা তাঁদের গৃহে কোনোদিনই ছিল না।

সুকান্ত ছিলেন তাঁর ভাইদের মধ্যে দ্বিতীয়। সুকান্তের শৈশব কেটেছিল বাগবাজারে তাঁদের নিবেদিতা লেনের বাড়িটিতে। সেখানকারই কমলা বিদ্যামন্দিরে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য ভর্তি হন। কমলা বিদ্যামন্দিরেই সুকান্তের সাহিত্যে জগতে হাতেখড়ি। সুকান্তের প্রথম ছোটগল্প ছাপা হয় এই বিদ্যালয়েরই পত্রিকা- ‘সঞ্চয়’ এ। এরপর ‘বিবেকানন্দ জীবনী’ নিয়ে আরও একটি লেখা বের হয় বিজন গঙ্গোপাধ্যায়ের 'শিখা' পত্রিকায়। 'শিখা' পত্রিকায় সেসময় প্রায়ই সুকান্তের লেখা ছাপা হতে থাকে। মাত্র এগারো বছর বয়সে ‘রাখাল ছেলে’ নামে একটি গীতিনাট্য রচনা করেন সুকান্ত। পাঠশালাতে পড়বার সময় ‘ধ্রুব’ নাটিকার নাম ভূমিকাতেও অভিনয় করেছিলেন তিনি।

সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাল্যবন্ধু লেখক অরুণাচল বসুর সঙ্গে মিলে আরও একটি হাতে লেখা কাগজ ‘সপ্তমিকা’ সম্পাদনা করেন। অরুণাচল কবির আমৃত্যু বন্ধু ছিলেন।

কমলা বিদ্যামন্দিরে লেখাপড়ার পাট শেষ করার পর সুকান্ত ভর্তি হন বেলেঘাটা দেশবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়ে। এরপর সুকান্ত প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নেন কিন্তু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। এই সময়ই ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে পুরোপুরি ভাবে পড়াশোনায় ছেদ পড়ে তাঁর।

ছোট্ট সুকান্তকে গল্প-কবিতা শুনিয়ে তাঁকে সাহিত্যের প্রথম ছোঁয়া দিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় রাণীদি। হঠাৎ করে একদিন রাণীদি মারা গেলেন। সুকান্ত প্রচণ্ড ধাক্কা খেলেন। রাণীদি'র দুঃখ ভুলতে না ভুলতেই মারা গেলেন কবির মা। একের পর এক কাছের মানুষদের মৃত্যু ছোট্ট সুকান্তকে শোকগ্রস্ত করে তুলল। সুকান্তকে করে তুলল একেবারে নিঃসঙ্গ। ধীরেধীরে নিঃসঙ্গ থেকে নিঃসঙ্গতর হয়ে গেলেন সুকান্ত। আর তখন দুঃখ ভুলতে তিনি কবিতা লেখা শুরু করলেন। কবিতাই ধীরে ধীরে হয়ে উঠল কবির একাকীত্বের একমাত্র সঙ্গী।

ছোটবেলা থেকেই বিদ্যালয়ের বাঁধাধরা নিয়ম-কানুন তার একেবারেই পছন্দ ছিল না। জীবনের প্রতিটি অংশেই সুকান্ত যেন অনিয়মকেই নিয়ম করে নিয়েছিলেন। করেছিলেন বিদ্রোহ। সুকান্ত সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন এবং ধীরে ধীরে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যোগদান করেন। কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেওয়ার পর  সুকান্ত কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা 'দৈনিক স্বাধীনতা'-র ‘কিশোর সভা’ বিভাগ সম্পাদনা শুরু করেন। পরে ‘ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’ এর প্রকাশনায় তিনি ‘আকাল’ নামে একটি সাহিত্য সংকলন সম্পাদনা করেন।

সুকান্ত'র লেখনী গভীরভাবে প্রভাবিত হতে থাকে তাঁর সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গী ও সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির অভিজ্ঞতা থেকে। চারপাশের মানুষকে নিয়ে সুকান্তের যে প্রত্যক্ষ উপলব্ধি, তাই তিনি ঢেলে দিতে শুরু করেন কলমে-কাগজ-কলমের মধ্য দিয়ে। কবিতা ধীরেধীরে হয়ে ওঠে ইস্তাহার, স্লোগান। মার্কসবাদী চেতনায় আস্থাশীল কবি 'গণমানুষের কবি' হিসেবে অল্পদিনেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

'কলকাতা প্রেমিক' ছিলেন সুকান্ত। কলকাতা শহরকে নিয়ে এক অদ্ভুত আতিশয্য কাজ করত সুকান্তের মধ্যে। কবির কথায়, 'কলকাতা যেন এক রহস্যময়ী নারী'। কলকাতা তাঁর কাছে কখনও প্রেয়সী, আবার কখনও হারিয়ে যাওয়া মা। কলকাতা প্রেমিক সুকান্ত'র জগত ছিল শহর কলকাতার অলি-গলি, ছাত্র রাজনীতি থেকে দরিদ্র অসহায় সর্বহারা মানুষজন। সুকান্ত বাঁচতে চাইতেন কলকাতাকে নিয়ে, তিনি বিশ্বাস করতেন 'কলকাতার মৃত্যু মানে তারও মৃত্যু'।

সুকান্তের বাল্যবন্ধু ছিলেন কবি অরুণাচল বসু। 'সুকান্ত সমগ্র'তে লেখা সুকান্তের চিঠিগুলির বেশিরভাগই অরুণাচল বসুকে লেখা। অরুণাচল বসুর মা ছিলেন কবি সরলা বসু। কবি সরলা বসু সুকান্তকে নিজের ছেলের মত স্নেহ করতেন। সুকান্ত ছেলেবেলায় মাতৃহারা হলে এই সরলা বসুই তাঁর মায়ের অভাব খানিক পূরণ করেছিলেন।

কবি বুদ্ধদেব বসু সুকান্ত প্রসঙ্গে বলছেন -“গোর্কীর মতো তার চেহারাই যেন চিরাচরিতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। কানে একটু কম শোনে, কথা বেশি বলে না, দেখামাত্র প্রেমে পড়ার মতো কিছু নয়, কিন্তু হাসিটি মধুর, ঠোঁট দু’টি সরল।”

সুকান্তের মনে সবসময়ই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি গভীর অনুরাগ কাজ করত। একবার তো তিনি কলকাতায় মহাজাতি সদনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের অনুষ্ঠানে চলে গিয়েছিলেন শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথকে দেখবার জন্য!

একজন লেখক অবশ্যই একজন ভালো পাঠকও, এই বৈশিষ্ট্যটিও ছিল কবি সুকান্তের মধ্যে। প্রচুর বই পড়তেন তিনি। সুকান্তের প্রিয় বইয়ের তালিকায় বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ বইটির স্থান ছিল একেবারে ওপরের দিকে। ‘পথের পাঁচালী’ বইটি সম্পর্কে সুকান্ত একবার বলেছিলেন, “ধর্মগ্রন্থের সঙ্গে সমান আদরে এই বই সকলের ঘরে রাখা উচিত।”

কলকাতা রেডিওতে প্রচারিত ‘গল্পদাদুর আসর’ অনুষ্ঠানটি ছিল সুকান্তের প্রিয় একটি অনুষ্ঠান। রেডিওর গল্পদাদুর আসরে তিনি যোগদানও করেন। সেখানে প্রথমে তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করেন। শুধু তাই নয়, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর সেই আসরেই নিজের লেখা কবিতা পাঠ করে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান। এমনকি গল্পদাদুর আসরের জন্য সেই বয়সেই তাঁর লেখা গান মনোনীত হয়েছিল। আর তাঁর সেই গান সুর দিয়ে গেয়েছিলেন সেকালের বিখ্যাত গায়ক পঙ্কজ মল্লিক।

সুকান্তের রাজনৈতিক জীবন এবং সাহিত্য জীবন কখন যে ধীরেধীরে ‘ব্যক্তি সুকান্ত’কে গ্রাস করে ফেলেছিল তা তিনি বুঝতেও পারেননি।

বুদ্ধদেব বসু সুকান্তকে নিয়ে এক জায়গায় লিখছেন, “যে চিলকে সে ব্যঙ্গ করেছিলো, সে জানতো না সে নিজেই সেই চিল; লোভী নয়, দস্যু নয়, গর্বিত নিঃসঙ্গ আকাশচারী, স্খলিত হয়ে পড়লো ফুটপাতের ভিড়ে, আর উড়তে পারলো না, অথবা সময় পেলো না। কবি হবার জন্যই জন্মেছিলো সুকান্ত, কবি হতে পারার আগে তার মৃত্যু হলো।”

সুকান্তের জীবন ও কাব্য ছিলো একই সুরে গ্রথিত ও একই মন্ত্রে অনুরণিত। তাই কোনও এক অংশকে আলাদা করে বলা যায় না। বলতে হলে সমান্তরালভাবে, একসাথেই বলতে হয়। সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁর কোনো বইই প্রকাশিত হবার পর দেখে যেতে পারেননি। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় ‘ছাড়পত্র’, এবং এরপর অন্যগুলোও।

সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবন মাত্র মাত্র ২১ বছরের আর লেখালেখি করেছিলেন মাত্র ছ-সাত বছর। কবি সুকান্ত ছিলেন কমিউনিষ্ট পার্টির সারাক্ষণের কর্মী। পার্টি ও সংগঠনের কাজে অত্যধিক পরিশ্রমের ফলে নিজের শরীরের উপর যে অত্যাচারটুকু তিনি করলেন তাতে তাঁর শরীরে প্রথম ম্যালেরিয়া ও পরে দুরারোগ্য ক্ষয়রোগে তিনি আক্রান্ত হন। কলকাতার ১১৯ লাউডন স্ট্রিটের রেড এড কিওর হোমে মৃত্যুবরণ করেন সুকান্ত।

Developed by DXDasia