
বইওয়ালা চারটে ব্যাগ থেকে একটা দু’টো করে বই তুলে নিয়ে দেখে অন্য দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বিদায় হতে বললেন। কেডিদার মুখে তখন ক্ষমার হাসি
নাম কেষ্ট দাশগুপ্ত। পাড়ায় সবাই কেডিদা বলত। কেডিদাকে আমরা মনে করতাম মার্কসবাদের শেষ কথা। কেডিদার বাড়ির দেওয়ালের তাকে থরে থরে সাজানো লেনিন, স্তালিন, মার্কস এঙ্গেলস মাওয়ের অসংখ্য ভলিয়ুম। কোনওটা ইয়া মোটা। কোনওটা চটি। কোনওটার মাঝারি সাইজ।। দু’একটা পোকায় খাওয়া। কেডিদা মাঝে মাঝে ন্যাপথলিন, তেজপাতা, পাউডার এসব দিতেন যাতে বইয়ে পোকা না পড়ে। পাড়ার চায়ের দোকানে কেডিদার সঙ্গে বামপন্থা নিয়ে কেউ তর্ক করলেই, কেডিদা তাকে লেনিনের অত নম্বর ভলিয়ুমের তত নম্বর পাতা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে এমন ভড়কে দিতেন যে সে বেচারি আর পালানোর পথ খুঁজে পেত না। কেডিদা নিজের এই বিশেষ ক্ষমতা সম্পর্কে বেশ সজাগ ছিলেন। তাই মাঝে মাঝে নতুন কাউকে দেখলে ডেকে চা খাইয়ে ফাঁদ পেতে তর্কে ঢুকিয়ে, তার পর গোহারা হারিয়ে দিতেন। আমরা আনেকেই জানতাম এসব। তাই যদি কেডিদা কখনও বলেন, চিন কিন্তু ঠিক পথে হাঁটছে না। আমরাও ঘাড় নেড়ে বলতাম, ঠিক চিন মোটেই ঠিক পথে হাঁটছে না। আবার যদি কেডিদা বলতেন, উত্তর কোরিয়া কি কমিউনিস্ট কান্ট্রি? আমরা বলতাম, ঠিক, এটা একটা বড় প্রশ্ন। এই রকম চলছিল। কিন্তু ১৯৯১ সালে যখন সোভিয়েত রাশিয়ার পতন হল। সেই থেকে কেডিদা মন মরা। বাড়ি থেকে বেরোতেন কম। বেরোলেও কারও সঙ্গে তর্ক করতেন না। তার পরও কয়েক বছর কেটে গেছে। কেডিদা এক দিন পাড়ার ঝন্টুকে বাড়িতে ডাকলেন। ঝন্টু দেখে চারটি চটের ব্যাগ ভর্তি লেনিন, স্তালিন, মার্কস মাওয়ের মোট ৫২টি খণ্ড। কেডিদা বললেন ট্যাক্সি ডাক। পুরোনো বইয়ের দোকানে সব বিক্রি করে দেবো। তার পর অনাদির দোকানে দু’জনে মোগলাই খেয়ে বাড়ি ফিরব। যাওয়া হল চার ব্যাগ ৫২ ভলিয়ুম নিয়ে পুরোনো বইয়ের পাড়ায়। প্রথম দোকানে হাসি হাসি মুখে ঢুকে কেডিদা বললেন, তিনি এসব বিক্রি করতে চান। বইওয়ালা চারটে ব্যাগ থেকে একটা দু’টো করে বই তুলে নিয়ে দেখে অন্য দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বিদায় হতে বললেন। কেডিদার মুখে তখন ক্ষমার হাসি। প্রায় যেন বলছেন, হে ঈশ্বর ওরা জানে না ওরা কী করছে, তুমি ওদের ক্ষমা কোরো। কিন্তু সে হাসি বেশি ক্ষণ টিকল না। একটা পর একেকটা দোকানে কেডিদা ঢুকছে, পর মুহূর্তেই বেরিয়ে আসছেন। শেষে একজন পুরোনো বইওয়ালাকে বলতে শোনা গেল, ওসব আর চলে না স্যার। কেন ঘাড়ে করে বইছেন! কেডিদার কী মনে হল, হঠাৎ ঘুরে লোকটার দোকানে চারটি ব্যাগ রেখে বললেন, এই রইল, পারলে কাগজের দরে বেচে দেবেন। আমি চললাম। এই বলে ঝন্টুর হাত ধরে টানতে টানতে শিয়ালদার দিকে হন হন করে হাঁটতে শুরু করলেন কেডিদা। লোকটা চেঁচিয়ে কী সব যেন বলছিল, কিন্তু গাড়ি-ঘোড়ার শব্দে সবটা শোনাও গেল না।
