
রবীন্দ্রনাথের ‘যোগাযোগ’ — মিথকে সামনে রেখে মিথ ভাঙার গল্প
সংগীত আর মিথ ভাষার গর্ভে জন্ম নেওয়া দুই সহোদরা — পরবর্তীকালে যাদের গন্তব্য দুই দিকে বেঁকে গেছে। সময় গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিথের জায়গা নিয়েছে উপন্যাস। একথা ক্লদ লেভি স্ত্রস তাঁর ‘মিথ অ্যান্ড মিউজিক’ নামের বক্তৃতায়। সত্যিই আধুনিক উপন্যাসের স্মৃতির গহনে মিথোলজি রয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ নিজে যাকে বলবেন— ‘মজ্জায় মিশে থাকা পিতামহদের কাহিনী ।’
‘যোগাযোগ’ উপন্যাসটি ১৯২৭ থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত ‘বিচিত্রা’ পত্রিকায় ‘তিনপুরুষ’ নামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হত। তারপর ‘যোগাযোগ’ নামে উপন্যাসটির আত্মপ্রকাশ। কুমুদিনী আর মধুসূদনের অসুখী দাম্পত্য এই উপন্যাসের কাহিনির নিউক্লিয়াস। আপাতভাবে সামাজিক অথবা দ্বন্দ্বমূলক তকমা পাওয়া এই উপন্যাসকে ঘিরে আছে এক রহস্যময় মিথোলজিক্যাল সংকেত। আজ সেই মিথোলজির সঙ্গে উপন্যাসটির সম্পর্কই আমাদের আলোচনার মূল উপজীব্য ।
যোগাযোগ উপন্যাসের দুইটি মিথ সমানে সমানে রয়েছে। একটি কৃষ্ণের মিথ আর অন্যটি শিব আর সতীর মিথোলজিক্যাল আর্কেটাইপ। খুব আশ্চর্যসুন্দর ভাবে একটি মিথ অন্যটিকে আড়াল করে আছে। এক পৌরাণিক দ্বন্দ্বের ভিতর দিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে চলে। রবীন্দ্রনাথ প্রবল বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পাঠককে পৌরাণিক সংকেত দিয়ে চলেন। সামনে থাকে মিথোলজির সূক্ষ্ম জালের ওপারে থাকা মধুসূদন, বিপ্রদাস, কুমুদিনীরা। সামাজিক, সাংসারিক তকমা আঁটা উপন্যাসের গভীরে গেলেই পাঠক খুঁজে পাবেন মিথোলজির বুদ্ধিদীপ্ত উপস্থিতি। মধুসূদন পূর্বপুরুষের বচসার কথা মনে রেখে চাটুজ্যেদের মেয়েকেই বিয়ে করতে চায়। বয়সে অনেক ছোট কুমুদিনী দাদা বিপ্রদাসের ছায়ায় এক রূপকথার মত মন রাখতে পেরেছে উনিশ বছর বয়সেও। শিবের মতন বর হবে— এই ইচ্ছা থেকেই দাদার আপত্তি সত্ত্বেও বয়সে বড় মধুসূদনকে বিয়ে করার অনুমতি দিয়ে বসে। কিন্তু বিয়ের সঙ্গে সঙ্গে এক কঠিন বাস্তব কুমুর স্বামীর রূপ ধরেই কুমুর স্বপ্ন ভঙ্গ করে চলে। সেই জায়গা থেকে শুরু হয় কুমুদিনীর নতুন উপলব্ধি। কে ওর যথার্থ দোসর? উপন্যাস শেষ হয় কুমুদিনীর আপোষের মধ্যে দিয়ে। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের নায়িকারা যে সমঝোতা করেই চলে। কিন্তু তখনই মিথ যে মিথ্যে নয় তাও প্রমাণিত হয়। প্রচলিত মিথকে ব্যবহার করে উপন্যাসে দারুণ চমক অপেক্ষা করে থাকে। চমকটি অবশ্যই মিথোলজিক্যাল।
উপন্যাসে শুরু থেকেই কুমুকে ঘিরে তৈরি হয় তপস্বিনী উমা, সতী, পার্বতীর ইমেজারি। কুমুর মনের ইচ্ছার গভীরে স্বামীর ধ্যানের মধ্যে সেই মহাতপস্বী রজতগিরিনিভ শিবকেই দেখেছে। সেই মহাতপস্বী তপস্বিনীর বেদনার ধন। বিয়ের আগে কুমুদিনীর কল্পনায় যেন সেই স্বর্গীয় মিলন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। এর অন্তরালে একটা মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিও ছিল। কুমুদিনী দাদা বিপ্রদাসের কাছে মন দিয়ে কুমারসম্ভব পড়ে। মনে মনে শিবকে, শিবের মতোন কাউকে চাইতে লাগল। নিজের অজান্তে নিজের উপর আরোপ করল তপস্বিনী উমার সত্তা। এক আদর্শ দাম্পত্যের স্বপ্ন দেখতে শুরু করল উনিশ বছরের মেয়েটি। যেদিন ঘটক এল, সেদিন সকালে কুমু ঠাকুরের উদ্দেশ্যে বলেছিল, বেজোড় সংখ্যার ফুলে জোড় মিলিয়ে সব শেষে যেটি বাকি থাকবে, তার রং যদি ঠাকুরের মত নীল হয়, তবে বুঝতে হবে, তাঁর ইচ্ছা। সব শেষের ফুলটি ছিল অপরাজিতা। বুঝতেই পারছেন, নীল অপরাজিতা যাঁর পছন্দ, তিনি মহাদেব। এইবার কেউ তাকে ফেরাতে পারল না। দাদা বিপ্রদাস নয়, পরিচিত অপরিচিত কেউ নয়। ভাবি স্বামীর নিন্দা শুনে কুমু কেঁদে ঘর ছাড়ছে। সকলে বলছে, ‘এ যে দেখি দক্ষযজ্ঞের সতীকেও ছাড়িয়ে গেল।’ সত্যিই তাই। কিন্তু,এই বিবাহের পরিণতি সদর্থক হবে না। কুমুর এই অসমবয়স্ক বিবাহ একজনকে ভেঙে দিচ্ছে মনে মনে। তিনি বিপ্রদাস। অসুস্থতার কারণে বিপ্রদাস বিবাহ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারলেন না। কুমুর আর তার স্বামীর গাটছড়া তাঁর চোখে ‘বীভৎস’। কেন? মিথোলজিক্যাল যুক্তিটা কী?
কুমুর স্বামীর নাম মধুসূদন। অর্থাৎ কৃষ্ণ। রজনীগন্ধার মতো সুন্দর, শাঁখের মতন চিকন যে মেয়েটির উপর গৌরীর উপমান আরোপ করেছেন রবীন্দ্রনাথ— তার সঙ্গে শিবকেই মানাবে। কৃষ্ণকে নয়। হয়তো তাই দুজনে দুইরকম করে গড়লেন রবীন্দ্রনাথ। বিবাহ মুহূর্ত থেকেই উপলব্ধি শুরু হল কুমুর। অথচ, কুমুর বাবা মাকে ঘিরে ছিল প্রেমিক কৃষ্ণ, বৃন্দাবনের রূপকল্প। কুমুর মা নন্দরাণী, বাড়ি বৃন্দাবন। কুমুর বাবা মুকুন্দলাল! কৃষ্ণের সমার্থক। নন্দরানি অভিমান করে পিতৃগৃহে চলে গেলে মুকুন্দলাল যেন পাল্টা অভিমান করেই জীবনের পাট চুকিয়ে দিলেন। তারপরেই খুব তাড়াতাড়ি মৃত্যু হল নন্দরানির। একরকমভাবে,স্বামীর বিরহ সহ্য করতে না পেরেই যেন পরলোকে পারি দিলেন কুমুর মা। কুমু দুটি তীব্র শোকের মধ্যেও গভীর প্রেম দেখেছে। তার ঘরে ছিল রাধাকৃষ্ণের মিলিত বিগ্রহ। বাড়িতে রাধাকান্ত জিউর পুজো হত। রাধাকান্ত মানে আবার প্রেমিক কৃষ্ণ।
কিন্তু কোনোভাবেই মধুসূদনকে ভালো লাগছে না কুমুর। কারণ তাদের মনের মিল হবে না। সর্বজ্ঞ কথক রবীন্দ্রনাথ মিথোলজিক্যাহ ইঙ্গিত দিয়েই চলেন। প্রথমত, শিব দুর্গার বিয়ের মাস চৈত্র! কুমুর বিয়ে হল অঘ্রাণে। মধুসূদন নামের অর্থ শিব নয়, আবার প্রেমিক কৃষ্ণের সাত্ত্বিক রূপও তার মধ্যে নেই।মধুসূদন মধু কৈটভ নামের দৈত্যবধের পর কৃষ্ণের নাম। দৈত্যবধকে এখানে স্ট্রাগলের প্রতীক হিসাবে আমরা ধরতে পারি। মধুসূদন লেখাপড়ায় ভালো হওয়া সত্ত্বেও অকালে পিতৃহীন হয়ে সব ছেড়ে স্ট্রগল শুরু করেছিল। জীবনযুদ্ধ! তার জীবনে প্রেমের জায়গা নেই। মধুসূদন সর্বত্যাগী তো নয়ই। ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসের মধুসূদন দর্পহারী নয়, দর্পের প্রতিমূর্তি। কুমুর একে তো অন্তরে পার্বতী! মানস বৃন্দাবনে সে মনমোহন পেয়ারেকে খোঁজে, তার কৃষ্ণভাবনার সঙ্গে মধুসূদনের কোনো মিল নেই। রবীন্দ্রনাথ তুরুপের তাসের মতো ব্যবহার করলেন এই নামটা। কুমুর প্রেমিক মন, কৃষ্ণের এই রৃপের কাছে নত হল না। মনে মনে আশ্রয় নিল গীতার কৃষ্ণের কাছে। বিপন্ন মুহূর্তে নীরব জপের ধারা চলতে লাগলো—‘পিতেব পুত্রস্য সখেব সুখ্যঃ। /প্রিয়ঃ প্রিয়াইসি দেব সোঢ়ম।’এইখানে রবীন্দ্রনাথ পাঠকের নজর মূল মিথ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন অন্য মিথকে প্রকট করে। মধুসূদনের বৈষয়িক, কামুক রূপ অতিক্রম করে কুমুর মন জুড়ে আসছে দার্শনিক কৃষ্ণ। উপন্যাসের শুরুতে আছে, মধুসূদনের বন্ধু কানাই। মধুসূদনের বাড়ির নাম প্রথমে ছিল —‘মধুচক্র’। কেমন অদ্ভুত লাগে। পরে ঐশ্বর্যের দমকে মধুসূদনের বাড়ির নাম হয় হয় মধুপ্রাসাদ। কুমুর কাছে বার বার কৃষ্ণের কোমল রূপ ধরা দেয়। ছোট্ট ছেলে হাবলুকে কুমু পরম স্নেহে বলছে— ‘গোপাল।’ ফুলশয্যায় যাচ্ছে যে মেয়ে, সে মনে মনে বলছে— ‘মেরে গিরিধর গোপাল ঔর নাহি কোই।’ এমন নয় যে তার শারীরিক মিলনে আসক্তি নেই। কিন্তু স্বামীকে ঘিরে ফ্যান্টাসি ভেঙে যাচ্ছে! কুমু বুঝতে পারছে দুঃখ যদি তাকে এমন করে ধাক্কা না দিত তাহলে সে আপন দেবতার এত কাছে কখনোই আসতে পারতো না।
এইবার প্রশ্ন মনে জাগে, কুমুর আসল দেবতা কে?আর সেই মিথোলজিক্যাল অঙ্কটাও তো মেলেনি। উপন্যাসে শিবের ইমেজারি কার উপর প্রয়োগ করেছেন রবীন্দ্রনাথ? এদিকে প্রতি মুহূর্তে দাদার চিঠির জন্য ছটফট করছে কুমু। দাদার দেওয়া নীলার আংটি নিয়ে মধুসূদনের সামনে স্পর্ধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কুমু। ফুলশয্যায় যাওয়ার আগে বুকের মধ্যে নীরব স্পর্শের হয়ে জেগে রয়েছে বিপ্রদাসের টেলিগ্রাম —গোপন কথার মতোন। আসলে পিতৃমাতৃহীন মেয়েটি কলকাতায় এসে আদর্শ পুরুষ হিসেবে বিপ্রদাসকেই দেখেছে। তারা বড়ও হয়েছে — যেন দুটি ভাই। কুমু কখনো সেবা পরায়ণা মা, কখনো সখী, কখনো প্রিয় শিষ্যা। এসরাজ বাজানো, দাবা খেলা, কুমারসম্ভব পড়া— সবেতেই সমানে সমানে। মধুসূদন যখন কটূক্তি করছে, কুমুর মনে পড়ছে রঘুবংশের শ্লোক—
‘গৃহিণী সচিবঃ সখী মিথঃ/প্রিয়শিষ্যা ললিতে কলাবিধৌ।’
বিপ্রদাস চাননি কুমুর বিয়ে মধুসূদনের সঙ্গে হোক। বিপ্রদাস ঘর ছেড়ে আসা কুমুকে খুশি মনে গ্রহণ করেছিলেন। আবার লক্ষ করার মতো বিষয়— বিপ্রদাসের নিজের বিয়েতেও ছিল বাধা। বিয়ে স্থির হয়েও ভেঙে গিয়েছিল। বিপ্রদাস মনে মনে সর্বত্যাগী। অনায়াসে ছোট ভাইকে নিজের প্রাপ্য দিয়ে দিতে পারেন। খুব অদ্ভুত লাগে, অনেকদিনের পর যখন দাদার সঙ্গে দেখা হয়, কুমু গান করে— ‘পিয়া ঘর আয়ে——’। পাঠকের মগ্নতার সুযোগে রবীন্দ্রনাথ আলতো করে মিলিয়েও দেন মিথোলজিক্যাল অঙ্কটি। এক মুহূর্তের জন্য কুমু দেখে— ‘তার দাদার সেই আবেশটা কেটে গিয়েছে। তার চোখে যে আগুন জ্বলেছে সে যেন মহাদেবের তৃতীয় নেত্রের আগুনের মতো। নিজের কোনো বেদনার জন্য নয় — সে তার দৃষ্টির সামনে বিশ্বের কোনো পাপকে দেখতে পাচ্ছে । দগ্ধ করা চাই।’ পাঠকের সামনে উপন্যাস স্পষ্ট হয়ে যায়। কুমু আর বিপ্রদাস দুজনে যেন কোন স্বর্গলোকের বাসিন্দা— অভিশপ্ত কারণে বিচ্ছিন্ন । তাদের একসঙ্গে থাকা হয় না। হবেও না। সংসারের সমস্ত বিরহ বিষ পান করে বিপ্রদাস শান্ত সমাহিত হয়ে যান। কুমুকে ফিরে যেতে হয় কর্তব্য কঠিন সংসারে। মধুসূদনের জন্য নয়। তার গর্ভে আসা মধুসূনের সন্তানের জন্য। কিন্তু তাই বলে কুমুর জীবনে ‘জগতঃ পিতরৌ বন্দে পার্বতীপরমেশ্বরৌ’ ধারণাও মিথ্যে হয় না। চিরপুরুষ ও চিরনারী বাক্য ও অর্থের মতো একত্র মিলিত হয়ে থাকে। শারীরিক সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে এক আশ্চর্য মনের মিলে সত্যিই থাকে!
তাই আর দেখা হবে না জেনেই উপন্যাসের শেষে কুমু আর বিপ্রদাস ভৈঁরো রাগিণীতে আলাপ শুরু করলে, গম্ভীর শান্ত সকরুণ সতীবিরহ যখন অচঞ্চল হয়ে এসেছে, মহাদেবের সেই দিনকার প্রভাতের ধ্যানের মতো।
এইখানেই ব্রাহ্ম রবীন্দ্রনাথ মিথকে, দেবতাকে ব্যবহার করলেন শব্দের শক্তির মতোন। কৃষ্ণ মিথের আড়াল থেকে জেগে উঠল চিরকালীন প্রেমিক জুটি শিব ও পার্বতী— অক্ষয়, অবিনাশ! মেঘের আড়াল থেকে নতুন সূর্যোদয়ের মতো।
সহায়ক গ্রন্থঃ যোগাযোগ/ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
