
নতুন দল গড়ে এনডিএতে যোগ দিচ্ছেন মুকুল?
একদা তৃণমূল কংগ্রেসের নাম্বার টু ছিল যাঁর প্রধান পরিচয়, সেই মুকুল রায় তৃণমূল ছাড়ছেন, কিন্তু বিজেপিতে তাঁর জায়গা হচ্ছে না। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অরুণ জেঠলি ঘনিষ্ঠ মুকুলকে বিজেপিতে জায়গা দিতে চান এমন নেতা কম নেই, কিন্তু, সিবিআই, ইডির তদন্ত চলাকালীন মুকুলকে দলে কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদ দিলে দলের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠে যাবে। আবার, ইচ্ছে থাকলেও, মুকুলের ক্ষেত্রে সিবিআই, ইডি হাত গুটিয়ে ফেললে, সারদা-নারদা নিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে তৃণমূলের ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’র তত্ত্বই প্রমাণ হবে। ফলে মুকুলকে নিয়ে এখন বিজেপির এখন ‘খাচ্ছি কিন্তু গিলছি না’ অবস্থা।
আরও অনেক বিষয় রয়েছে। রাজনৈতিক মহলে কয়েকটা মিথ মুকুল ঘনিষ্ঠরা ছড়িয়ে দিয়েছিলে। যেমন, মুকুল হলেন তৃণমূলের অনিল বিশ্বাস। মুকুল তৃণমূলের সংগঠনকে হাতের তালুর মতো চেনেন। মুকুল ছাড়া তৃণমূল অচল।
কারণ ভিন্ন হলেও এটা ঠিক, অনিল বিশ্বাসের মৃত্যুর পরের ভোটেই সিপিএম ক্ষমতাচ্যুত হয়। মুকুলকে নিষ্কৃয় করেও কিন্তু তৃণমূল ২০১৬-র বিধানসভা ভোট সহ একের পর এক নির্বাচনে সাফল্য পেয়েছে। বলা হত, রাজ্যের প্রায় ৭৭ হাজার বুথেই মুকুলের অনুগত কর্মী রয়েছেন। ঠিকই। ছিল। কিন্তু তাঁরা ছিলেন মুকুলের মাধ্যমে মমতার আনুগত কর্মী। মুকুলকে নিষ্কৃয় করেও যে তৃণমূল একের পর নির্বাচনে ভালো ফল করে চলেছে, তাতে সেই কথাটাই আবার প্রমাণ হল, দলে নেতা এক জনই।
বিধান রায়কে নিয়ে একটা গল্প মনে পড়ে গেল। তাঁর দফতরের বনমন্ত্রী হেমচন্দ্র নস্করের কথায়, ‘আমরা সবাই ছিলাম কচ্ছপ মন্ত্রী। বাড়ি থেকে গুটি গুটি গাড়িতে চেপে রাইটার্সে আসি, আসা মাত্রই ডাঃ রায় আমাদের উল্টে দেন, আমরা হাত পা ছুড়তে থাকি, কিন্তু নড়তে পারি না। আবার পাঁচটার সময় তিনি আমাদের সোজা করে দেন, আমরা গুটি গুটি পায়ে গাড়িতে উঠে বাড়ি চলে যাই।’
আসলে, মুকুল মাইনাস মমতা= শূন্য, তৃণমূল-পাটিগণিতের এই সরল সমীকরণটা অনেকেই বুঝতে পারেননি। তাই একটা সময় বলা হচ্ছিল, দলে দলে এমপি, এমএলেরা নাকি মুকুলের সঙ্গে দল ছাড়তে প্রস্তুত। এটা ঠিক, রাজনীতিতে অসম্ভব বলে কোনও কথা নেই, কিন্তু এটাও ঠিক, এই মুহূর্তে যদি মুকুল দল ছাড়েন, তাঁর সঙ্গে এমপি, এমএলএ তো দূরের কথা, পঞ্চায়েত সদস্য ক’জন যান দেখার আছে।
মুকুলের এই মুহূর্তে দলে অবস্থাটা হল, তৃণমূলের কোনও নেতাই আর তাঁর সঙ্গে কার্যত যোগাযোগ রাখছেন না। তৃণমূল ভবনে তাঁর সেই পুরোনো ঘরও আর নেই। মুকুলবাবুর কোনও কাজও নেই। সমস্ত সংসদীয় কমিটি থেকে তাঁকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। দলের সহ সভাপতির পদ থেকেও তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দলে অপাংক্তেয় মুকুল মাঝে মাঝে দিল্লি যাতায়াত করছেন, বিজেপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, তখন আবার তাঁকে নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে একটু গল্প টল্প হচ্ছে। তাঁর এই বিজেপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে দলের পক্ষ থেকে পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, মুকুলের গতিবিধির উপর দল নজর রাখছে। দলের স্বার্থের চেয়ে নিজের স্বার্থ বড় করে দেখলে দল ব্যবস্থা নিতে পারে, এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন দলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়। কয়েক দিন আগে মুকুল সরকারি নিরাপত্তা ছেড়ে দেওয়ার পর থেকে মুকুলকে নিয়ে জল্পনা এক লাফে অনেকটা বেড়ে যায়।
তৃণমূলে মুকুল কেন এমন অপাংক্তেও হলেন? এর প্রধান কারণ, মুকুলের কিছু বিবৃতি। তৃণমূলের বক্তব্য, ভোটে তাদের হারাতে পারবে না জেনে, ম্যাথুকে দিয়ে নারদা স্টিং অপারেশনের চক্রান্ত করা হয়েছিল। এর পেছনে বিজেপি নেতাদের হাত আছে, এবং কেন্দ্রীয় শাসক দল, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ছত্তিশগঢ় সহ বিভিন্ন প্রদেশে বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা পাহাড় প্রমাণ সব আর্থিক কেলেঙ্কারীর বিরুদ্ধে সক্রিয় তদন্ত না করে, কেন্দ্রীয় বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাকে দিয়ে তৃণমূলকে হেয় করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এটা হল সারদা-নারদা নিয়ে তৃণমূলের রাজনৈতিক অবস্থান। কিন্তু মুকুল রায়, দলের সহ সভাপতি হয়ে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার অফিসারদের সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে সে কথা বললেন না। তিনি দলের রাজনৈতিক বক্তব্য না বলে বললেন, তদন্তে সহযোগিতার কথা। এটাই হল তৃণমূল নেত্রীর সঙ্গে মুকুলের দূরত্ব বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
বিজেপি যদি মুকুলকে জায়গা না দেয়, মুকুল কী করতে পারেন? তিনি নতুন দল তৈরি করে বিজেপি-র নেতৃত্বাধীন এনডিএতে যোগ দেওয়ার জন্য আবেদন করতে পারেন। খবর এই যে এই কাজটি তিনি খুব শিগগিরি করে ফেলতে চান। ‘জাতীয়তাবাদী তৃণমূল কংগ্রেস’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠিত হয়েছে বেশ কিছু দিন হল। মুকুল অবশ্য ওই দলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের কথা স্বীকার করেননি। ওই জাতীয়তাবাদী তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি হলেন মুকুল ঘনিষ্ঠ অমিতাভ মজুমদার। মুকুল যদি নতুন দল গড়েন বা এই জাতীয়তাবাদী কংগ্রেসের দায়িত্ব নিয়ে এনডিএ-র শরিক হতে চান, তাতে হয়তো খুব একটা বাধা আসবে না এনডিএ থেকে। অবশ্য এনডিএ-র নীতীশের মতো নেতারা কী অবস্থান নেন তা সময়ই বলবে।
কোনও নেতার এই ভাবে দল ভেঙে বেরিয়ে নতুন দল গড়ার ইতিহাস কি বলছে। বঙ্গ রাজনীতিতে এমন প্রচেষ্টা আগেও কয়েক বার হয়েছে। মুকুলের থেকেও বহু গুণ বড় মাপের রাজনীতিক ছিলেন তাঁরা। যেমন অজয় মুখোপাধ্যায়ের বাংলা কংগ্রেস, প্রণব মুখোপাধ্যায়ের রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস বা সইফুদ্দিন চৌধুরী- সমীর পুততুণ্ডদের পিডিএস। দল ভেঙে আসার পর বাঙালি তাঁদের আর সে ভাবে গ্রহণ করেনি।শেষ বিচারে চূড়ান্ত ভাবে ব্যর্থ হয়েছে প্রত্যেকটি প্রচেষ্টা। বঙ্গরাজনীতির সেই তালিকায় কি আরেকটি নাম যোগ হতে চলেছে?
