কবিতার দায়বদ্ধতা, দায়বদ্ধতার কবিতা

এক যে ছিল রাজার প্রাসাদ হাজারটা তার দরজা/রাষ্ট্রপতি ছিলেন কবি, এখন গাঁথেন তরজা

‘আমি বলতে চাই না যে, সমাজ বা জাতি বা মানুষের সমস্যা খচিত অভিব্যক্তি সৌন্দর্য হবে না। তা হতে বাধা নেই। অনেক শ্রেষ্ঠ কাব্যেই তা হয়েছে। কিন্তু সে-সমস্ত চিন্তা, ধারণা, মতবাদ, মীমাংসা কবির মনে প্রাক্‌কল্পিত কবিতার কঙ্কালকে যদি দেহ দিতে যায়, কিংবা সেই দেহকে দিতে চায় আভা, তাহলে কবিতা সৃষ্টি হয় না – পদ্য লিখিত হয় মাত্র… কবির প্রণালী অন্যরকম কোনো প্রাক্‌নির্দিষ্ট চিন্তা বা মতবাদের জমাট দানা থাকে না কবির মনে – কিংবা থাকলেও সেগুলোকে সম্পূর্ণ নিরস্ত করে থাকে কল্পনার আলো ও আবেগ।’ ‘কবিতার কথা’র প্রারম্ভিক প্রতিবেদনে জীবনানন্দ একথা বলেছেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা পাঠ করে জীবনানন্দ কথিত ওই ‘কবির প্রণালী’ পাই। মানবতাবাদী, মায়াময় একজন কবি তাঁর মতো করে সময়ের কথা বলেছেন। রাজনৈতিক পতাকার নীচে দাঁড়িয়ে বলতে হয়নি। কবিতার প্রতি সময়ের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই বলেছেন। দায়বদ্ধতা জনিত তথাকথিত ‘চিন্তা, ধারণা, মতবাদের’ তোয়াক্কা না করেই বলেছেন! শক্তির কবিতার মতবাদ হয়ে এসেছে মানবতাবাদ, ইতিবাচকতা। শক্তির কবিতায় এক ম্যাজিক বা ইন্দ্রজালে আচ্ছন্ন হন তাঁর পাঠক। কিন্তু এটাই কি সব! ঝরা সোনালী পাতায় ঢাকা কিম্বা সেই পাতার ফাঁকেও বা বোধে আচ্ছন্ন হয়ে আটকে থাকা স্তর পেরিয়ে যাওয়ার পর কি পাওয়া যায় না সময়, দেশ এবং দায়বদ্ধতা। হ্যাঁ অবশ্যই তা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতো করে। কবিতার প্রতি দায়বদ্ধতা রেখেও তিনি তাঁর সামাজিক ভূমিকা রক্ষা করেছেন। আর এই ভূমিকা রক্ষা করার জন্য তাঁকে কোনো ‘ইজম’-এর ওপর ভরসা করতে হয়নি। ‘কমিউনিস্ট’ পার্টি করতেন। হয়তো কোনো আষ্টে-পৃষ্টে বাঁধায় পড়ে যাবার আশঙ্কায় সরে গেলেন। কিন্তু প্রগতিবাদ যাকে আমরা বামপন্থা(!) বলি সেটা ছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কাছে মানবতাবাদ। ’৬০ দশকের খাদ্য আন্দোলন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ’৭০ দশকের এই বাংলার অস্থিরতা, হত্যা সমস্ত প্রসঙ্গেই তিনি তাঁর লেখায়, পত্রিকা সম্পাদন, সংকলন সম্পাদনায় সব সময় ভূমিকা রেখেছেন জোরালোভাবে।

১৯৬৬ সালের তৎকালীন সরকারের খাদ্য নীতির বিরুদ্ধে বামপন্থীদের আন্দোলনে পুলিশ লাঠি ও গুলি চালায়। এরকম প্রেক্ষাপটেই প্রকাশিত হয় ক্ষুদ্র পুস্তিকা ‘মৌন মিছিল’। ১৯৬৬ সালের ১৫ আগস্ট কবি সুবোধ রায়ের সম্পাদনায় পুস্তিকাটি চব্বিশ পরগনার বিরাটির ‘নবযুগ গ্রন্থালয়’ থেকে প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটিতে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, তরুণ সান্যাল, শ্যামসুন্দর দে, কমলেশ সেন সহ প্রায় ১৬ জন কবি কবিতা লেখেন। ১৬ জন কবির মধ্যে ১৫ জনকেই আমরা বামঘরানার কবি বলেই জানি। ঘরানা বলাটা একটু ভুল হয়ে গেল। এঁরা প্রত্যেকেই কোন না কোন রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এই সংকলনে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের একটি কবিতা আছে। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় ১৯৫৮ সালের পর কোন ডান বা বামপন্থী জলের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ রাখতেন না। বন্ধুত্ব ছিল অনেকের সঙ্গে। শ্রদ্ধাও ছিল অনেকের প্রতি। এই ভালোবাসা এই শ্রদ্ধা এবং প্রতিবাদ সমস্তটাই শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মানবিক গুণের প্রকাশ। কবিতাটির শিরোনাম ‘সাম্প্রতিক ১৯৬৬’। পুরো কবিতাটিই তুলে দিচ্ছি –

‘সমস্তটাই প্ররোচনা সমস্তটাই ফন্দি
বাইরে শুধু ভিড় বাড়াবে ভিতরে তাই বন্দী
বস্তা বস্তা কাঁকর দিলুম উদর রইলো আস্ত
হাত বাড়ালে টিকোনো দায় স্বাধীনতার স্বাস্থ্য
সমস্তটাই প্ররোচনা সমস্তটাই ফন্দি
বাইরে শুধু ভিড় বাড়াবে ভিতরে তাই বন্দী
এক যে ছিল রাজার প্রাসাদ হাজারটা তার দরজা
রাষ্ট্রপতি ছিলেন কবি, এখন গাঁথেন তরজা
অল্প স্বল্প বিদেশ যান দেশের বাজার মন্দা
খাদ্য চেয়ে করছে মাটি, শিল্প যোজন গন্ধা
সমস্তটাই প্ররোচনা সমস্তটাই ফন্দি
বাইরে শুধু ভিড় বাড়াবে ভিতরে তাই বন্দী।’

শক্তি যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়েন তখনই তিনি বিশিষ্ট মার্কসবাদী ব্যক্তিত্ব হরিপদ কুশারীর সান্নিধ্যে আসেন। পরে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯৫১-৫২ সালে বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। বন্ধুদের মধ্যে অন্যতম দীপেন বন্দ্যোপাধ্যায়। সে সময় উত্তাল। সদ্য পাওয়া ভাঙাচোরা, স্বপ্নভঙ্গ আর হাহাকারের স্বাধীনতা। বিক্ষোভ বাড়ছে। কমিউনিস্ট পার্টি সক্রিয় হয়ে উঠছে। অন্যদিকে বাড়ছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। এই অবস্থায় মানবতাবাদী, উদার হৃদয়, মেধাবী, সৃজনশীল শক্তি চট্টোপাধ্যায় কমিউনিস্ট পার্টির দিকে ঝুঁকবেন এটাই তো স্বাভাবিক। তখনও কবিতার রহস্যময় অস্তিত্বের তাগিদে ছোটা শুরু করেননি পাহাড়ে, অরণ্যে, দিক থেকে দশদিকে।

কবিতায় সম্পূর্ণ সমর্পিত হওয়ার আগে নিশ্চয়ই তাঁর একটা প্রস্তুতি ছিল। এই প্রস্তুতিই শেষ পর্যন্ত ১৯৫৮ সালে তাঁকে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে সরে দাঁড়াতে বলেছিল নিশ্চয়ই। কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে থেকে যুক্তিহীন আনুগত্য, যান্ত্রিক শৃঙ্খলতাজনিত দায়িত্ববান হয়ে ওঠা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কারণ এবার তিনি ঝাঁপিয়ে পড়বেন কবিতার গূঢ় রহস্যের দিকে। তিনি সরে গেলেন। এই সরে যাওয়ায় কমিউনিস্ট পার্টির খুব একটা ক্ষতি বৃদ্ধি হয়তো তেমন হয়নি। কিন্তু বাংলা কবিতার ভুবন পেয়েছিল একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র।

কমিউনিস্ট পার্টি ছেড়ে দিয়ে তিনি কিন্তু কংগ্রেস বা জনসংঘে যোগ দিয়ে রাজকবি হয়ে যাননি। পার্টির নেতাদের সঙ্গে ছিল তাঁর শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক। বাম ঘরানার কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়, সিদ্ধেশ্বর সেন, অমিতাভ দাশগুপ্তদের সঙ্গে ছিল তাঁর আত্মার টান। আজ বামপন্থার অবক্ষয়ের সময় অস্বীকার করা যাবে না। কারণ যাই থাকুক। কিন্তু আমি শুধু আন্দাজের উপর নয় প্রগাঢ় বিশ্বাস নিয়ে বলছি তিনি মত বদলে সাদা বাংলায় যাকে বলে পাল্টি খেয়ে অন্য দলে যেতেন না। কারণ তাঁর দরকার হত না। উচ্চাকাঙ্খী, দুর্বল কবিদের এসবের প্রয়োজন। শাসকের তাঁবেদারি প্রয়োজন।

ষাট ও সত্তর দশকের প্রথম ভাগটি জুড়ে শোষণহীন সমাজের অভিমুখে সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। সে সময় কলকাতা সহ সারা বাংলায় কত মেধাবী, সন্ন্যাসীর মতো সর্বত্যাগী এবং আগুনের মত রক্ত-উজ্জ্বল তরুণকে এনকাউন্টারে হত্যা করা হয়েছে তা নিয়ে অনেক তথ্যসমৃদ্ধ গ্রন্থ, বুলেটিন রয়েছে আজকের আগ্রহী পাঠক পড়ে নিতে পারেন। কোনও পার্টি নয়, কোনও পার্টির আদর্শ নয় শুধু এই সংগঠিত হত্যার প্রতিবাদ করেছেন শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাঁর মতো করে –

‘বিষণ্ণ রক্তের দাগ রেখে গেছে অন্ধকারে ফেলে
মুণ্ডহীন তরুণের উজ্জ্বল বিমূঢ় এক দেহ।
খোলা ছিলো গলির গৃহস্থ জানালা আর
কোষমুক্ত তরবারি ঘাতকের হিংস্র সাংঘাতিক
… … … … … … … … … … … … … … …
এই বাল্যকালে ওই আমার সন্তান কি করেছে?
কোন অপরাধে এক প্রাণবন্ত জীবন আঁধারে?
ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, ও শুধু বিপ্লব চেয়ে দোষী।।
(রক্তের দাগ – ‘ঈশ্বর থাকেন জলে’)

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার আঙ্গিকের সঙ্গে এই আঙ্গিক হয়তো যায় না। কিন্তু এর মধ্যে রয়েছে কবিতার প্রতি দায়বদ্ধতা, আবার সময়ের প্রতি দায়বদ্ধতা। ‘আবার ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়…’ একটু সরলীকরণ হয়তো বা স্টেটমেন্ট জাতীয়। কিন্তু এই স্পষ্ট উক্তি সময়ের কাছে। রাষ্ট্রের কাছে। সবচেয়ে বড় কথা কবিতাটি এভাবেই এসেছে। এখানেই শক্তির সততা। ‘সুদর্শন পোকা’ নামে একটি কবিতা প্রসঙ্গে আমি শক্তিদাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম ‘সুদর্শন পোকা’ বিষয়ে। যা বলেছিলেন তা হল, গ্রামে গঞ্জে এই পোকাটি থাকে। মঙ্গলজনক এটিকে দেখা। তারপর পুরো কবিতাটি পরিষ্কার হয়। লোকায়ত ভাষায় এক নারী তাঁর দুর্দশার কথা বলছেন। হতদরিদ্র, অন্ন বস্ত্রের সংকট। স্বামীর খোঁজ নেই। ‘ছেলে পুলের বুক না তো ও, ডোঙার ওপর ছই’। এই অবস্থায় পাড়াগাঁয়ের মেয়েটি সুদর্শন পোকাকে বলছে – ‘লোকটা আছে, না ফুঁকে গ্যাছে – দিও না… মোকে ধোঁকা আজ না দিলি, কাল করো না সুদর্শন পোকা’। (সুদর্শন পোকা – ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’)

এখানে পেয়ে যাচ্ছি গ্রাম্য ভাষার কথা। গ্রাম্য মঙ্গল, অমঙ্গলের প্রতীকী সত্তা। হতদরিদ্র একটি গাঁয়ের বঁধুর প্রতি সহানুভূতি। শক্তির কবিতায় সমাজ, সময়, কাল, দায়বদ্ধতা নিয়ে বোধহয় আর কিছু বলার নেই।

কবিতার যেমন দায়বদ্ধতা আছে, দায়বদ্ধতারও তেমনি কবিতা হয়ে ওঠার দায় আছে।

প্রবীর ভৌমিক লিখিত ‘তিনি আমার অকস্মাৎ ও পূর্বাপর(শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা : একটি ব্যক্তিগত অনুভব) – গ্রন্থের একটি অংশ

 

Developed by DXDasia