ইচ্ছে হল, রান্নাঘরটি যদি একবার ঘুরে দেখা যায়…
রাজা ও রাজপ্রসাদের গল্প ছোটবেলায় কে না শুনেছে! তারপর বড় হয়ে ইতিহাসের বইয়ে তার কতশত সচিত্রিত বর্ণনা। কিন্তু সেইসব স্বপ্নময় গল্প যে একদিন আমার জীবনেও সত্য হবে সেটা জানতাম না। সবটাই যেন জীবনের রূপকথা। আর সেই রূপকথা সত্যি হল যখন রাষ্ট্রপতি ভবনের যাওয়ার আমন্ত্রণ পেলাম। আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম আমাদের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির কাছ থেকে। “Writers and Artists in-Residence Program”-এর আওতায় সাহিত্যিক ও সাংবাদিক রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ফোটগ্রাফার হিসাবে রাষ্ট্রপতি ভবনে থাকার সুযোগ এসেছিল সাতদিনের জন্য। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করলাম। রাষ্ট্রপতি ভবনে থাকার স্মৃতিকে আজীবন টাটকা রাখার জন্য ছবি তুলেছিলাম আনাচে-কানাচের।
বড় বড় ঘরগুলির এক-একটির শোভা একেক ধরনের। যেন মনে হবে দেশি-বিদেশি সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র। দরবারহল, লাইব্রেরি, অশোকহল – তার সঙ্গে ছোট-বড় ব্যাঙ্কোয়েট হল। রয়েছে রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির একান্ত সাক্ষাতের জন্য বেশ কয়েকটি ঘর।
রাষ্ট্রপতি ভবনে যখন পৌঁছোলাম তখন লাঞ্চের সময়। আমাদের জন্য নানা ব্যঞ্জন সাজানো রুপোর থালায় পরিবেশন করা হল দুপুরের খাবার। চামচ গ্লাস থালায় অশোকস্তম্ভের মনোগ্রাম করা। সাতদিনে আমরা দেশি-বিদেশি মিলিয়ে কত ধরনের খাবার যে খেয়েছি! ভারতে রান্না শুধুই ভোজনের জন্যই নয়। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপলক্ষে তৈরি করা হয় নানা ধরনের খাবার। খাদ্যতালিকার মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতিকে উপস্থাপন করা হয় অতিথিদের সামনে। আর সেইসব রকমারি খাবার তৈরির জন্য আছেন নানান বিশেষজ্ঞ রন্ধনশিল্পী। এসব খাবারের গুণগত ও স্বাদগত মান এতই ভালো যে মনে হবে বাড়ির খাবার।
এত রকমারি খাবারের আয়োজন দেখে ইচ্ছে হল রান্নাঘরটি যদি একবার ঘুরে দেখা যায়। নিরাপত্তারক্ষী ছাড়া কোথাও যাওয়া এখানে সম্ভব নয়। ইচ্ছা অনুযায়ী একদিন পৌঁছে গেলাম রাষ্ট্রপতির হেঁশেলের খবর নিতে। গিয়ে দেখি সে এক এলাহি কারবার। বড় কোনো হোটেলের থেকে কম নয়। বিশাল রান্নাঘরে চলছে সর্বদা কর্মযজ্ঞ। দেখা পেলাম প্রেসিডেন্টের শেফের। এখানে রান্না করেন শেফরা। রান্না ও পরিবেশন করার ধরনের মধ্যে আছে একটা রাজকীয় ভাব। সেটার নমুনা পেলাম যখন তিনশো লোকের ব্যাঙ্কোয়েট হলে খাবার পরিবেশনের ছন্দময়তাকে দেখেই। খাবারগুলি অতিথিদের থালায় চলে আসছে সমানতালে।
অতিথিদের বসতে হয় নাম লেখা নির্দিষ্ট আসনে। সাদা ধপধপে পোশাক পরা শিল্পীরা নিমেষের মধ্যে তৈরি করে ফেলছে এক একটি খাবার। শুধু খাবার তৈরিই নয়, এই রন্ধশালার প্রয়োজনীয় সব উপাদান অর্থাৎ শাক-সবজি আসে রাষ্ট্রপতি ভবনের ‘ডালিখানা’র বাগান থেকে। আর পাউরুটি, বিস্কুট, মিষ্টি সবই হোম প্রোডাকশন। রাষ্ট্রপতি ভবনে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের খাবার তৈরির জন্য রাজ্যভিত্তিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কুক আছে। সেইসব দেশীয় খাবার পরিবেশন করা হয় বিদেশি অতিথিদেরও। আমরা যখন রাষ্ট্রপতি ভবনে ছিলাম তখন সেখানে এসেছিলেন ইজিপ্টের প্রেসিডেন্ট। ইজিপ্টের প্রেসিডেন্টের ব্যাঙ্কুয়েটে গিয়ে দেখি বিদেশি অতিথিকে পরিবেশন করা হয়েছে বাংলার খাবার ইঁচড়ের ডালনা। আসলে শুধুই একজন বাঙালি হিসাবে নয়, দেশীয় সংস্কৃতিকে তুলে ধরার এই প্রচেষ্টা আমার মনকে আকর্ষণ করেছিল।
রাষ্ট্রপতি ভবনের শেষ রাত্রে আমাদের সঙ্গে ছিলেন বিশিষ্ট বাঙালি অতিথি। আর সঙ্গে ছিল বাঙালির প্রিয় সরষে ইলিশ, ভেটকি কলাপাতুরি ও আলুপোস্ত। ফিশফ্রাই। প্লেটের উপর কলাপাতা পেতে দেওয়া হল নুন ও লেবু। কী অপূর্ব পরিবেশনা! মনে থাকবে অনেকদিন। রাষ্ট্রপতিভবনের বাঙালি খাবারের স্বাদ যেন এখনও মুখে লেগে আছে।