রবীন্দ্রনাথ ও একটি রাজনৈতিক নাটক
“প্রজারা: মাননীয় বিচারপতি! আমরা জানতে চাই, হেমের সঙ্গে মহারাজের এই যে যুদ্ধ – এ কি ন্যায়সঙ্গত?
বিচারক: আরে! শোনো কথা! তিনি যে রাজা!
প্রজারা: সে জন্যই তো তিনি হবেন ন্যায়ধর্মের পালক!
বিচারক: ন্যায় অন্যায় রাজাই জানেন । আমরা কী করতে পারি!
প্রজারা: আমরা মনে করি, যতক্ষণ মহারাজ ন্যায়ের অনুশাসন মেনে চলবেন ততক্ষণই তিনি আমাদের রাজা।
বিচারক: কিন্তু রাজার ইচ্ছার কাছে আমাদের নতশির হতেই হবে।
প্রজারা: সে ইচ্ছা যদি অন্যায় হয়, অধর্ম হয় – তবু?
বিচারক: হ্যাঁ, তবু ।”
রবীন্দ্রনাথ তৃতীয়বার ইংল্যান্ডে যান ১৯১২ সালে। দেশভ্রমণের অবকাশে তাঁর অনূদিত গীতাঞ্জলির একাধিক ইংরেজি কবিতা প্রসঙ্গে আলোচনা করেন সমসাময়িক বিদেশি কবিদের সঙ্গে। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি গ্রন্থের জন্য তাঁর নোবেল পুরস্কার লাভ। সে সময় দেশে, তাঁর বাসভূমে শান্তিনিকেতনের বিদ্যার্থীরা রবীন্দ্রভাবনা-অনুসারী হয়ে সার্বিক শিক্ষালাভে নিবিষ্ট ছিলেন। জুন ১৯১২ থেকে সেপ্টেম্বর ১৯১৩ – এই সময়কালের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ, ইংল্যান্ডে বসবাসকালে তাঁর আশ্রম পড়ুয়াদের জন্য লিখে পাঠালেন ইংরেজি নাটক ‘কিং অ্যান্ড রেবেল’। জানা যায়, ১৯১৩ সালে গরমের ছুটি পড়ার আগে আশ্রমের পড়ুয়ারা এই নাটকটি প্রথমবার মঞ্চস্থ করেছিলেন। নির্দেশক ছিলেন অন্যতম আশ্রমিক অজিতকুমার মুখোপাধ্যায়। রাজা (কিং), বিদ্রোহী (রেবেল), সেনাপতি (জেনারেল), রক্ষী (পোলিসম্যান), মন্ত্রী (মিনিস্টার), বিচারক (চিফ জাস্টিস), সৈনিক সমূহ (সোলজার্স) ও প্রজাগণ (সিটিজেন)– এই ছিল নাটকের চরিত্রাঙ্কন। বিশ্বভারতী থেকে মুদ্রিত ‘রবীন্দ্রবীক্ষা’ পত্রিকার সহসম্পাদক শ্রী জগদিন্দ্র ভৌমিক ১৯৭৭ সালে নাটকটির ইংরেজি থেকে বাংলায় রূপান্তর করেন। নাম দেন- ‘রাজা ও রাজদ্রোহী’।
‘রবীন্দ্রবীক্ষা’-র সম্পাদক শ্রী কালীপদ রায়, পরবর্তীকালে তাঁর শান্তিনিকেতনে পাঠের অভিজ্ঞতা সম্পর্কিত বক্তৃতায় ও গ্রন্থে উল্লেখ করেন- “বাচনিক অভ্যাসের সঙ্গে সঙ্গে আঙ্গিক অভিনয়-যোগে উপস্থিত প্রসঙ্গের অর্থ বুঝে মনে রাখাই ছিল গুরুদেবের নিজস্ব শিক্ষা প্রণালী। নানাদিক থেকে এই প্রণালীর প্রয়োগ ও পরীক্ষা তিনি করেছিলেন শান্তিনিকেতনে। King and Rebe। সেই পরীক্ষারই একটা উদাহরণ মাত্র…।” ইংরেজি শিক্ষার এই পদ্ধতিকে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং, প্রত্যক্ষ পদ্ধতি (Direct Method) হিসাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। অর্থাৎ অন্যভাষীদের ইংরেজি শিক্ষা দেওয়ার সময় ইংরেজি মাধ্যমই প্রয়োগ করা। ‘কিং অ্যান্ড রেবেল’ রচনার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল এই-ই, যাতে পাঠ ও অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে সহজাত স্বতঃস্ফূর্ততায় ছেলেমেয়েরা ইংরেজি উচ্চারণে এবং ইংরেজি ভাষায় ভাবপ্রকাশে স্বচ্ছন্দ হয়ে ওঠে।
এ ভিন্ন, রবীন্দ্রনাথের নাট্য-রচনার অন্য একটি উদ্দেশ্যও ছিল – ‘তপোবন’-স্থিত বিদ্যার্থীদের মধ্যে কিশোরকাল থেকেই রাজনীতির বোধ চারিয়ে দেওয়া। সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আপাত গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় প্রজাতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের পরস্পর বিপরীতমুখী অভিঘাত চলতে থাকে। রাজা নির্বাচিত হয় প্রজাদের দ্বারাই। অথচ যতক্ষণ তার হাতে রাজদণ্ড থাকে, সামগ্রিক শাসনব্যবস্থা ও প্রশাসনিক পরিকাঠামোকে সে কুক্ষিগত করে রাখে। অত্যন্ত হাস্যকর কারণেও শাসক ও রাষ্ট্র যদি মনে করে কোনও একক ব্যক্তি, কোনও এক গোষ্ঠী অথবা কোনও একটি পন্থা তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করছে কিংবা প্রত্যাখ্যান করছে, তাহলে শাসক ও রাষ্ট তাকে ‘রাজদ্রোহী’ হিসাবে চিহ্নিত করে।
১৯১৩-পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ যখন ইওরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ঘুরে দেখতে থাকেন, তাঁকে ক্রমশ জাতীয়তাবাদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হতে দেখা যায়। ‘কিং অ্যান্ড রেবেল’ নাটকের শেষ অঙ্কে ‘জাস্টিস’, আনজাস্টিস’, ‘জাস্টিফাই’ প্রভৃতি শব্দের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জোর দেওয়া হয়। নাগরিকদের মুখে বসানো হয় তথাকথিত রাষ্ট্রবিরোধী ও আদর্শবাদী সংলাপ- “And that other sentiment is far more dangerous which makes out that the king can do NO harm.” ১৯৯৩-এ প্রকাশিত শঙ্খ ঘোষের ‘ন্যায় অন্যায় জানিনে’ কবিতায় আমরা পুনরায় দেখতে পাই রাষ্ট্রের প্রতি প্রশাসনের অন্ধ-আনুগত্য-
‘তিন রাউন্ড গুলি খেয়ে তেইশ জন মরে যায়, লোকে এত বজ্জাত হয়েছে!
স্কুলের যে ছেলেগুলো চৌকাঠেইই ধ্বসে গেলো, অবশ্যই তারা ছিল সমাজবিরোধী।
ও দিকে তাকিয়ে দ্যাখো ধোয়া তুলসিপাতা
উলটেও পারেনা খেতে ভাজা মাছটি আহা অসহায়
আত্মরক্ষা ছাড়া আর কিছু জানেনা বুলেটরা।
দার্শনিক চোখ শুধু আকাশের তারা বটে দ্যাখে মাঝে মাঝে।
পুলিশ কখনও কোনও অন্যায় করে না তারা যতক্ষণ আমার পুলিশ।’
একটি আদর্শ রাষ্ট্রে যা ঘটে থাকে, যা যা ঘটা কাঙ্ক্ষিত, তেমনটাই ঘটে এই নাটকের শেষ দৃশ্যে। প্রজারা ঐক্যবদ্ধ হয়, সৈনিকরা একে একে রণক্ষেত্র ত্যাগ ক’রে বিপ্লবীর দলে যোগ দিতে থাকে, স্বৈরতন্ত্রী রাজা সিংহাসন ত্যাগ করে। অর্থাৎ ‘কিং অ্যান্ড রেবেল’ একটি গণতান্ত্রিক দেশের স্বপ্নপূরণেরও নাটক, শতাব্দীকাল পর যাকে ফিরে দেখার সময় এসেছে।
[ঋণস্বীকার: সপ্তর্ষি প্রকাশন]
ছবি ১: 'রাজা ও রাজদ্রোহী' নাটকের অলংকরণ, সত্যজিৎ রায়, সন্দেশ পত্রিকা
ছবি ২: মূল পাণ্ডুলিপির অংশ