
জয়দেবের সাধনায় তৃপ্ত হয়ে মা গঙ্গা এলেন কদমখণ্ডীর ঘাটে। মিথ পুরাণে জড়ানো কেঁদুলি
বীরভূম জেলার সদর সিউড়ী হইতে চব্বিশ মাইল এবং অণ্ডাল-সাঁইথিয়া লাইনের দুবরাজপুর স্টেশন হইতে বার মাইল দক্ষিণে একেবারে অজয় নদীর উত্তর তীরের উপর জয়দেব-কেন্দুলী বা কেন্দুবিল্ব গ্রাম অবস্থিত।
প্রাচীনকালে এই স্থান বীরভূমের সংস্কৃত শিক্ষার কেন্দ্র ছিল বলিয়া অনুমান হয়। এখানে পূর্ব্বকালে সংস্কৃত চতুস্পাঠী ছিল এবং কবি জয়দেবের অনুপ্রেরণায় ইহা একটি সংস্কৃত শিক্ষার কেন্দ্ররূপে গড়িয়ে উঠিয়াছিল।
জয়দেব গোস্বামী গ্রামের পশ্চিম দিকে কদমখণ্ডীর ঘাটে রাধামাধব বা রাধাদামোদর বিগ্রহ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। অনেক সময় তিনি এই ঘাটে আসিয়া থাকিতেন। প্রবাদ আছে যে, জয়দেব গোস্বামী কেন্দুবিল্বে শ্রীরাধাদামোদর বিগ্রহের প্রতিষ্ঠা করেন এবং বৃন্দাবন যাত্রাকালে সেই বিগ্রহযুগল সঙ্গে লইয়া যান। কিন্তু আমাদের মতে তিনি কোন ঠাকুর প্রতিষ্ঠা করেন নাই; তিনি রাধাদামোদর বিগ্রহের সেবা-অর্চনাদি করিতেন ও কেন্দুলীতে অবস্থিতিকালে ঐ বিগ্রহের সেবা তাঁহার বরাবরই ছিল।
কবি জয়দেব যে অষ্টদল পদ্মাঙ্কিত আধারে (প্রস্তর খণ্ডে) অভীষ্ট দেবতার অর্চ্চনা ও মন্ত্র জপ করিয়া সিদ্ধ হইয়াছিলেন, সেই প্রস্তর খণ্ড বর্ত্তমানে অজয় তীরবর্ত্তী কুশেশ্বর শিব মন্দিরে রক্ষিত আছেন। অনেকে ইহাকে ‘ভুবনেশ্বরী যন্ত্র’ বলিয়া অভিহিত করেন। কিন্তু ইহার সত্যতা আমরা উপলব্ধি করিতে পারি নাই।
কহিত আছে যে, জয়দেব গোস্বামী প্রত্যহ প্রাতে উঠিয়া কেন্দুবিল্ব হইতে ৩৬ মাইল দূরবর্ত্তী কাটোয়ার নিকট ভাগীরথীতে স্নান করিতে যাইতেন। অত দীর্ঘ পথ নিত্য যাতায়াতে ভক্তের বিশেষ অসুবিধা দেখিয়া গঙ্গাদেবী জয়দেব গোস্বামীর উপর সদয় হন এবং বলেন- “তোমাকে আর কষ্ট করিয়া এতদূর রাস্তা স্নান করিতে আসিতে হইবে না। দৈনিক বেলা দশ দণ্ড পর্য্যন্ত চিরকাল আমি ঘাটে অধিষ্ঠান থাকিব, তথায় ঐ সময়ের মধ্যে স্নান করিলে গঙ্গাস্নানের ফল হইবে।” এই প্রবাদ বহুজনসম্মত বলিয়া হোরেস হেমস্ উইলসন সাহেব কর্তৃক সংগৃহীত হইয়াছে এবং রজনীকান্ত গুপ্ত স্বরচিত “জয়দেব” গ্রন্থের ৪০ পৃষ্ঠায় তাহার প্রমাণ স্বরূপ উদ্ধৃত করিয়াছেন। জাহ্নবী দেবী ভগীরথের তপস্যা-বলে পূর্ব্বপুরুষদিগের উদ্ধার জন্য যেরূপ তৎকর্ত্তৃক মর্ত্তভূমে আনীত হইয়া ভাগীরথী নামে খ্যত হইয়াছেন এবং লোকে ভগীরথ গঙ্গায় স্নান করিয়া যেরূপ পূণ্য অর্জ্জন করে, তদ্রূপ কেন্দুবিল্বের কদমখণ্ডীর ঘাটে গিয়ে গঙ্গাদেবীর স্তব করিলে তিনি তথায় তাঁহাকে দর্শন দেন এবং অজয় নদীর উক্ত ঘাটের জল উজান বহিতে দেখেন। অদ্যাবধি বেলা দশ দণ্ড পর্য্যন্ত গঙ্গাদেবী এই ঘাটে অধিষ্ঠিত থাকেন। কদমখণ্ডীর ঘাটের আট-দশ রশি পূর্ব্বে পদ্মাসনে বসিয়া তিনি গঙ্গাদেবীর দর্শন লাভ করেন। উক্ত কারণে বহু দূরদেশ হইতে আগত হিন্দুগণ কদমণ্ডীর ঘাটে স্নান এবং গঙ্গাতীরে শবদাহর সমফল হইবে মনে করিয়া এই ঘাটে শবদাহ করিয়া থাকে। এই মহাশ্মশানে প্রতিনিয়তই শবদাহ হইতে দেখা যায়। এই ঘাটের অল্প উত্তরেই কাঙ্গাল ক্ষেপাচাঁদ সিদ্ধিলাভ করেন।।
এই স্থান দেখিতে একটি কুঞ্জবনের মত। এখানে যে সমস্ত সমাধি দৃষ্ট হয়, তাহা জয়দেব গোস্বামীর, পদ্মাবতীর ও অপরাপর বৈষ্ণব বাবাজীদের সমাধি বলিয়া কথিত হয়।
(গৌরীহর মিত্র রচিত ‘বীরভূমের ইতিহাস’ বই থেকে নির্বাচিত অংশ)
