বিদ্যাসাগরের জেলা মুর্শিদাবাদ

তিল তিল করে নতুন নারী-নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে এই প্রত্যন্ত মানুষ গড়ার ল্যাবরেটরিতে

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ‘বাল্যবিবাহের দোষ’ লেখায় বলেছিলেন, সকল সুখের মূল যে শারীরিক স্বাস্থ্য, তাহা বাল্যপরিণয়ে ক্ষয় পায়। বিদ্যাসাগরের এই কথা বলার পর শতবর্ষ কেটে গিয়েছে। কিন্তু বাল্যবিবাহের সমস্যা আমাদের এই বঙ্গপ্রদেশে মেটেনি। ফলে বিদ্যাসাগরের প্রয়োজনও ফুরিয়ে যায়নি। তবে নতুন প্রজন্মের বিদ্যাসাগররা পূর্ব মেদিনীপুরের (তৎকালীন হুগলি) বীরসিংহে জন্মায়নি। তারা জন্মেছে পশ্চিমবঙ্গের ‘পিছিয়ে পড়া’ জেলা মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়ায়। হরিহরপাড়ায় এমনই ৩২ জন খুদে বিদ্যাসাগরকে দেখে এলাম।

দারিদ্র তাদের নিত্যসঙ্গী। শরীরে স্পষ্ট অপুষ্টির ছাপ। শুধু উজ্জ্বল চোখগুলো বলে দিচ্ছে, পাঁচজনের থেকে এই কিশোরী বাহিনী কোথায় যেন আলাদা। গোটা এলাকায় ওদের কোনও নাম নেই। পরিচয় ওদের একটাই, কন্যাশ্রী যোদ্ধা। এরাই ভবিষ্যতের কেউ বেগম রোকেয়া, কেউ প্রীতিলতা। তিল তিল করে নতুন এক নারী-নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে হরিহরপাড়ার এই প্রত্যন্ত মানুষ গড়ার ল্যাবরেটরিতে।

বললাম বটে নাম নেই। কিন্তু নাম নেই বললে তো হবে না। আসলে, নামে ওদের যত না লোকে চেনে, যোদ্ধা হিসেবে চেনে তার চেয়ে ঢের বেশি লোকে। আর ওদের বয়স? ১৫ থেকে ২২। বড় অংশই এখনও পিঠে ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যায়।

সারা দেশ জুড়ে অসহিষ্ণুতার এই সময়ে, যখন প্রতিনিয়ত মাপজোক চলছে ধর্মের, তখন এই কিশোরী যোদ্ধাদের নামের যে তালিকা হাতে এল, তাতে দেখা যাচ্ছে, শাহিনা আখতার বানুর পরেই নাম আশাপূর্ণা বিশ্বাসের। তারপরই নাম সঙ্গীতা বিশ্বাস, শম্পা হাজরা, বিউটি দত্ত, মল্লিকা খাতুন, মরিয়ম খাতুনের। ওদের কাজ, উৎসাহ দেখে, ওদের স্বপ্নের গল্প শুনে মনে হল, চার পাশে যতটা অন্ধকার আছে বলে আমরা হায় হায় করে থাকি, আসল ছবিটা ততটা কালো নয়। ইস্কুল পেরোয়নি। প্রায় সবারই পিঠে ব্যাগ। প্রখর রোদ্দুর। হাতে ঘাম মোছার রুমাল। সবার পরনে নীল কামিজ, সাদা সালোয়ার, সাদা ওড়না। এটাই হল কন্যাযোদ্ধাদের উর্দি। কোথায় যেন অদ্ভুত মিল। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে হাতে রেডবুক নিয়ে স্কুল ছাত্র রেড গার্ডরা গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছিল। আজ এই স্কুলছাত্রী যোদ্ধারা একই ভাবে ছুটে চলেছে গ্রামে-গ্রামান্তরে। হরিহরপাড়াই তাদের প্রথম ‘মুক্তাঞ্চল’। ওরা অবশ্য যে যত পড়ে সে তত বোকা হয় স্লোগান দিচ্ছে না।উলটো কথাই বলছে। স্কুলছুট ছাত্রীদের বলছে বই ধরো, ইস্কুলে ফেরো। বাল্যবিবাহ কখনও নয়। নারী নির্যাতন দেখলেই প্রতিবাদ করো। কন্যাশ্রী একটি সরকারি প্রকল্প। সরকারি প্রকল্প মানে, সরকার দেয়, বাকিরা নেয়। এমনই চলে এসেছে। কিন্তু এই কন্যাশ্রী যোদ্ধারা যতটুকু নিচ্ছে, ফিরিয়ে দিচ্ছে তার হাজার গুণ বেশি।

গত পাঁচ মাসে হরিহরপাড়ার এই কিশোরী যোদ্ধারা ২১টি বাল্যবিবাহ রুখে দিয়েছে। এই তালিকায় আছে, সঙ্গীতা বিশ্বাস, ফজিলা খাতুন, বর্ণালী খাতুন, অপর্ণা হালদার এবং আশাপূর্ণা বিশ্বাস। এই পাঁচ কিশোরীর নাম আলাদা করে বলা হল, কারণ, কন্যাশ্রী যোদ্ধাদের সাহায্য নিয়ে এরা নিজেদের বিয়ে নিজেরাই ভেঙেছে। সেখানেই থেমে থাকেনি। পাঁচজনই যোগ দিয়েছে কন্যাশ্রী যোদ্ধাদের সঙ্গে। নতুন করে ভরতি হয়েছে স্কুলে। আরও আছে। মনিরা খাতুনের কথা। ১৪ বছরের মনিরা পাচার হয়ে গিয়েছিল মুম্বাইয়ে।এক দিন সেখান থেকে কাঁদতে কাঁদতে মাকে ফোন করে। মা এসে যোগাযোগ করেন এনজিও সিনি-র কর্মী জাকিরুন বিবির সঙ্গে। তার পর থানা- পুলিশ করে ফিরিয়ে আনা হয় মনিরাকে। মনিরা এখন এক জন কন্যাশ্রীযোদ্ধা। সঙ্গীতা বিশ্বাসকে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছিল। সব ঠিকঠাক। খবর পেয়ে আটকে দিল যোদ্ধারা। সঙ্গীতা এখন ক্লাস এইটে পড়ছে। এবং একজন অন্যতম যোদ্ধা।

সারা দেশে বাল্যবিবাহ এক বড় সমস্যা। গত দশ বছরে গোটা ভারতে ২৯ লক্ষ বাল্যবিবাহ হয়েছে। এর মধ্যে বালিকা বিবাহের সংখ্যা ১৮ লক্ষ।২০১১-র আদমশুমারি থেকে দেখা গিয়েছে, ১৩টি রাজ্যের ৭০টি জেলায় বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি। অন্ধ্রপ্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ ছাড়াও রয়েছে অসম, বিহার, গুজরাট, হরিয়ানা, ঝাড়খণ্ড, কর্নাটক, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ। ন্যাশনাল কমিশন ফর প্রোটেকশন অফ চাইল্ড রাইটস (NCPCR)-এর সাম্প্রতিক রিপোর্টে এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

এই যোদ্ধারাই আসলে এখন ব্লকের ‘জিরো ডায়াল’। মেয়েরা মনে করে, বিপদে পড়লেই ওদের খবর দাও। কীরকম বিপদ? মেয়ে ক্লাস এইটে পড়ে, বাড়ির লোক বিয়ে ঠিক করেছে। মেয়েটি নিজেই, বা পাড়ার কোনও লোক খবর দিয়ে দিল কন্যাশ্রী যোদ্ধাদের। তারপর বাকিটা সিনেমার মতো। যদি জায়গাটা দূরে হয়, বিডিও পূর্ণেন্দু সান্যাল সরকারি গাড়ি দিয়ে দিলেন। গাড়ি চেপে খুদে বিদ্যাসাগরদের দল পৌঁছে গেল ঘটনাস্থলে। তারপর বোঝানো, তর্ক, প্রয়োজনে এলাকার লোককে জড়ো করে বোঝানো, কাউনসেলিং। চলতেই থাকে। তাতেও কাজ না হলে যোদ্ধারা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়। ফোন করে সাহায্য চায় বিডিও পূর্ণেন্দু সান্যালের কাছে। থানার ওসি কার্তিক মাঝির কাছে। প্রয়োজনে দু’জনেই পৌঁছে যাচ্ছেন ঘটনাস্থলে। এখনও এমন একটি ঘটনাও ঘটেনি, যেখানে যোদ্ধারা হেরে গিয়ে ফিরে এসেছে। তবে বিয়ের দিন খবর পেয়ে বিয়ে আটকাতে হলে, পাত্রীর বাবার অনেক আয়োজন জলে যায়। টাকা নষ্ট হয়। যোদ্ধারা বলল, ‘তখন অনেক অভিশাপ নিয়ে আমাদের ফিরতে হয়। আমরা চেষ্টা করি আগেই আটকে দিতে’।

এই যোদ্ধাদের এক জন পরিচালক হলেন ‘চাইল্ড ইন নিড ইনসস্টিটিউট’(সিনি)-এর কর্মী জাকিরুন বিবি। মেয়েদের অধিকারের জন্য জাকিরুন সব সময় এক পায়ে খাড়া। শুধু এই কারণে জাকিরুন দু’দফায় দীর্ঘ ১৫ মাস শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়ি ছিলেন। জাকিরুনের অপরাধ গুরুতর। তিনি মহিলাদের বাড়ির বাইরে এনে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলতে সাহায্য করছিলেন। ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে ছোট ব্যবসা করতে মহিলাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। জাকিরুন বললেন, এসব অবশ্য পুরোনো কথা, এখন সবাই মেনে নিয়েছে। জাকিরুন জানালেন, শুধু বাল্যবিবাহ আটকানো নয়, কোনও বাড়িতে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে খবর পেলে সেখানেও গিয়ে নির্যাতিতার পাশে দাঁড়ায় এই যোদ্ধারা। প্রয়োজনে প্রশাসনের সাহায্যও নেওয়া হয়। একটা প্রশ্ন মনে আসবে। ‘কন্যাশ্রী যোদ্ধা’ নামটা কোথা থেকে এল? মুর্শিদাবাদ জেলার এডিএম (উন্নয়ন), সমনজিৎ সেনগুপ্ত বাংলা ভাষাকে এই নতুন শব্দবন্ধ উপহার দিয়েছেন। সমনজিৎ নিয়মিত খবর রাখেন, মেয়েরা যোদ্ধাগিরির সঙ্গে সঙ্গে ভালো ছাত্রীও হয়ে উঠছে কিনা। সমনজিৎ জানালেন, কন্যাশ্রী নিয়ে এক বৈঠকে আলোচনা করতে করতে এই নাম তাঁর মাথায় আসে। তার পর তো বাকিটা ইতিহাস। হ্যাঁ, এই যোদ্ধাদের নিয়ে একটি ফুটবল টিমও তৈরি করা হয়েছে। প্রত্যেককে দেওয়া হচ্ছে ক্যারাটে প্রশিক্ষণ। প্রাথমিক নার্সিং ট্রেনিংও নিয়েছে এরা প্রত্যেকেই।

কন্যাশ্রী যোদ্ধা এখন মুর্শিদাবাদে একটা মডেল। সুতি দু’নম্বর ব্লকে গিয়ে পাওয়া গেল সদ্য গড়ে ওঠা ৪০ জনের আর এক যোদ্ধা বাহিনীকে। বাল্যবিবাহ আটকাতে তারাও একই ভাবে কাজ করে চলেছে। বিডিও সন্দীপ ভট্টাচার্য জানালেন, এখানে যেহেতু বিড়ি বাঁধার কাজে প্রচুর শিশু শ্রমিক ব্যবহার হয় ফলে স্কুলছুটের সংখ্যা খুব বেশি। স্কুলছুট মেয়েদের স্কুলে ফেরাতেও কাজ করছে সুতি দু’নম্বর ব্লকের যোদ্ধারা। এছাড়া এখানে অল্প বয়সী ছেলেদের মধ্যে ঢুকে পড়েছে ডেনড্রাইট এবং গাঁজার নেশা। যোদ্ধারা এই নিয়েও কাজ করছে। যোদ্ধা নাজিমা খাতুন জানাল, সে তার নিজের ভাইকেই ডেনড্রাইটের নেশা ছাড়িয়েছে। এখন চেষ্টা চালাচ্ছে ভাইয়ের বন্ধুদের নেশামুক্তি ঘটাতে। যোদ্ধা রুনা খাতুন, নাজমা খাতুনরা জানাল, তাদের কাছে খবর আসে, গ্রামের এক সৎ মা তার চার বছরের সন্তানকে ঘরে আটকে রাখছে। খেতে দিচ্ছে না। যোদ্ধারা তাকেও উদ্ধার করে। এখন সেই চার বছরের ফরিদা প্রাক-প্রাথমিক স্কুলে যায়।

বিদ্যাসাগর বেঁচে থাকলে এই কন্যাশ্রী যোদ্ধাদের প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করতেন। তাই, তাঁর কথা দিয়েই শেষ করি। বাল্যবিবাহ সম্পর্কে তিনি লিখছেন, ‘হায়! জগদীশ্বর আমারদিগকে এই দুরবস্থা হইতে কত দিনে উদ্ধার করিবেন; এবং সেই শুভ দিনই বা কত কালের পর উপস্থিত হইবে। যাহা হউক, অধুনা এতদ্বিষয় লইয়া যে আন্দোলন হইতেছে, ইহাও মঙ্গল’। মনে হল যেন আজই সংস্কৃত কলেজে বসে বিদ্যাসাগর এই কথাগুলো বললেন। তাঁকে প্রণাম।

Developed by DXDasia