
এগিয়ে এসে রক্ষীকে সরিয়ে সটান ভিতরে ঢুকে গেলেন সুচিত্রা – ‘কী হয়েছে মোহর? দেখো কাদের নিয়ে এসেছি।’
১৯৯০
বিকট এক বন্যা ঘটে গেছে বাংলাদেশে। লক্ষ লক্ষ মানুষ বিপর্যস্ত। শুধু স্বদেশের নয়, এসব সময়ে নানা দেশের অকাতর সাহায্যের দরকার। তাই আমাদেরও কিছু করণীয় নেই? আমাদের, মানে এ-বাংলার শিল্পী-সাহিত্যিকদের?
বড়ো রকমের একটা ত্রাণ-সংগ্রহের পরিকল্পনা হলো তাই। পথে পথে মিছিল করে সাধারণ মানুষজনের কাছ থেকে সাহায্য চাওয়া তো একটা সনাতন পদ্ধতি। সে তো করতেই হবে। কিন্তু সেইটুকু শুধু নয়। ঠিক হলো যে নাট্যদলগুলি সাতদিন ধরে নাট্যাভিনয় করে টাকা তুলবে, সাতদিন ধরে দেখানো হবে বিশিষ্ট কিছু ফিল্ম। শিল্পীরা তাঁদের একটা করে ছবি দেবেন প্রদর্শনীতে, নিলাম হবে সেসব। লেখকেরা তাঁদের রয়্যালটি থেকে দেবেন যিনি যতটুকু পারেন। আর গানের শিল্পী যাঁরা? রবীন্দ্রসদনে এক সন্ধ্যায় নামী শিল্পীরা গাইবেন রবীন্দ্রসংগীত। প্রথমে সুচিত্রা মিত্রের পরিচালনায় সম্মেলক, পরে একক।
কিন্তু রাজি করানো যাবে তো সুচিত্রা মিত্রকে? কেনই-বা যাবে না? দেবেশ আর আমাকে সঙ্গে নিয়ে সুভাষ চৌধুরী চললেন একদিন টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপোর কাছে এক বহুতল ফ্ল্যাটে। প্রস্তাব শুনে ঝলমলে সুচিত্রা এককথায় রাজি। কী হতে পারে তবে সম্মেলক গানটা? আমরা কিছু ভেবে উঠবার আগেই তিনি বলে উঠলেন – ‘নয় এ মধুর খেলা।’ চমৎকৃত আমরা। এর চেয়ে ভালো চয়ন আর কীই-বা হতে পারে। ‘বারে বারে বাঁধ ভাঙিয়া বন্যা ছুটেছে / দারুণ দিনে দিকে দিকে কান্না উঠেছে।’ ঠিক, এই গানেই তো শুরু হওয়া চাই।
গাইবেন কারা? নাম নির্বাচনের সময়ে সুচিত্রা একবার বলে উঠলেন – ‘মোহর এখন বোধহয় কলকাতায়। ধরতে হবে ওকেও।’
‘কিন্তু ওঁকে কি রাজি করানো যাবে? শুনেছি কোনো চিকিৎসার জন্য এসেছেন। তাছাড়া, সভায় আজকাল গাইতেও চান না।’
‘দেখি তো চায় কি না। চলুন সবাই, আজকেই যাই।’
সঙ্গে সঙ্গেই চারজন মিলে অভিযান করা গেল দক্ষিণাপণের পাশে ও-রকমই এক বহুতলে। ফ্ল্যাটের দরজা খুলে একজন জানতে চাইলেন আমরা কাকে চাই। উদ্দেশ্য শুনে দরজা প্রায় বন্ধ করতে করতেই বললেন – ‘উনি অসুস্থ, কারো সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না।’ কথাটা শেষ হতে না-হতে পিছন থেকে এগিয়ে এসে রক্ষীকে সরিয়ে সটান ভিতরে ঢুকে গেলেন সুচিত্রা – ‘কী হয়েছে মোহর? দেখো কাদের নিয়ে এসেছি।’
ঢুকে যাই আমরাও। কিন্তু আমাদের দিকে কিছুমাত্র নজর না দিয়ে চমকিত কণিকা উঠে দাঁড়ালেন তাঁর খাট ছেড়ে। দুই বন্ধু জড়িয়ে ধরলেন দুজনকে, অনেকদিন পর তাঁদের দেখা। কিছু আহ্লাদ-বিনিময়ের পর বসলেন দুজনে খাটের উপরে। সামনের একটি চেয়ারে সুভাষ চৌধুরী, আর কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডান পাশে দেয়ালঘেঁষা দুটো চেয়ারে দেবেশ আর আমি। অবসন্নই দেখাচ্ছিল তাঁকে। কিন্তু সে-অবসাদকে কিছুমাত্র আমল না দিয়ে সুচিত্রা তাঁকে বোঝালেন আমাদের পরিকল্পনা, আর বললেন – ‘সেদিন তোমাকেও গাইতে হবে।’
‘আমি? না না, আমি পারব না। এখন আমি পারি না।’
‘তুমি পারো না? তাহলে আমি পারছি কেমন করে? ওসব হবে না, গাইতেই হবে তোমায়।’
‘না না, আমি না।’
পাশ থেকে দেবেশ হঠাৎ বলে ওঠে – ‘এ-রকম একটা অনুষ্ঠানে মোহরদি থাকবেন না, এ কি হয়। হতে পারে কখনো?’
এতক্ষণে কণিকা চোখ ফেরালেন আমাদের দিকে – ‘এ কী! দেবেশবাবু এসেছেন? আপনারা এসেছেন?’
‘হ্যাঁ, সবাই মিলে এসেছি যাতে আপনি এড়াতে না পারেন।’
‘না না, আমার ভয় করে, নার্ভাস লাগে।’
‘ভয়? গান গাইতে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভয়?’
‘রবীন্দ্রসদন তো! না না, আমি পারব না।’
আর তখন, ছোটো ছেলেমেয়েদের যেভাবে আশ্বাস দেন বড়োরা, সেই স্বরে-সুরে সুচিত্রা বলে ওঠেন – ‘ভয় কী! আমি থাকব তোমার পাশে।’
‘থাকবে? সত্যি থাকবে?’
‘হ্যাঁ, সত্যিই থাকব। তোমার হাত ধরে বসে থাকব।’
‘তাহলে কি যাব?’ অল্প একটু দ্বিধার পর বললেন, ‘না না, পারব না।’
‘পারতে তোমাকে হবেই। এখন আমরা চলি সবাই। সুভাষ এসে নিয়ে যাবে তোমাকে।’
‘থাকবে তো তুমি?’
‘বলছি তো থাকব। তোমার ঠিক পাশেই থাকব।’
ক্ষীণ গলায় বললেন কণিকা – ‘আচ্ছা, যাব তবে। থেকো কিন্তু।’
বেরিয়ে আসার পর আদরঝরানো গলায় সুচিত্রা বলেন – ‘মোহরটা সেই একইরকম থেকে গেল।’
লক্ষ্যপূরণ হয়েছিল সে-অনুষ্ঠানের। কণিকাও গেয়েছিলেন কণিকারই মতো গান। কথা রেখেছিলেন সুচিত্রাও, ছিলেন তাঁর পাশেই।
এই শেষটুকু অবশ্য আমার শোনা-কথা। কেননা, অনুষ্ঠানের সেই দিনটায় আমি ছিলাম নার্সিংহোমে।
(শঙ্খ ঘোষের ‘নিরহং শিল্পী’ বইয়ের নির্বাচিত অংশ)
