
কমল বলছেন, তিনি হিংসার বদলে সৌভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলার উদ্দেশ্যেই লেখাটি লিখেছিলেন
কেউ যখন কোনও নিবন্ধ লেখেন তখন তিনি ভেবেচিন্তে লিখেছেন বলেই ধরতে হবে। বিশেষ করে এমন কেউ যিনি রাজনীতিতে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হতে চাইছেন। কারণ, সারাক্ষণ বিতর্কিত মন্তব্য করে চলেছেন এমন কাউকে মানুষ খুব একটা নির্ভরযোগ্য বলে মনে করেন না।
রাজনীতিতে আসছেন বলে জানানোর পরেই কমল হাসান ‘আনন্দ বিকতন’ নামের তামিল পত্রিকায় একটা নিবন্ধ লিখেছিলেন। তাতে তিনি হিন্দু হিংসার কথা বলেন। যে শব্দটি তিনি ব্যবহার করেছিলেন ইংরাজিতে তার নিকটতম শব্দ সন্ত্রাস। ইংরাজি সংবাদমাধ্যমে শব্দটি ‘সন্ত্রাস’ হিসাবেই উল্লেখিত হয়। এবং প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া হয়। পরে কমল বলেন, তিনি দক্ষিণপন্থী হিংসার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছিলেন। ঘটনা হল, তিনি কিন্তু ‘হিন্দু’ শব্দটাই ব্যবহার করেছেলেন। মাদ্রাজ হাইকোর্টে কর্মরত জনৈক জি দেবরাজন এখন হাইকোর্টে একটি আবেদন করে বলেছেন, কমল হাসান নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য হিন্দুদের সন্ত্রাসবাদী বলে দেখাতে চাইছেন। কিন্তু, কোনও ধর্মই হিংসা শেখায় না। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই এধরনের মন্তব্য করে কমল তামিলদের ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করতে চাইছেন বলে তাঁর অভিযোগ। এর আগে তিনি এনিয়ে এফআইআর দায়ের করার জন্য গত ৪ তারিখ চেন্নাই পুলিস কমিশনার এবং ৬ তারিখ তেনাপেট থানায় গিয়েছিলেন। ফল না মেলায় আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। ‘আনন্দ বিকতন’–এর সম্পাদকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছেন দেবরাজন। মাদ্রাজ হাইকোর্ট চেন্নাই পুলিস কমিশনারকে এক সপ্তাহের মধ্যে অভিযোগ নিয়ে বক্তব্য জানতে চেয়েছে। আর কমল বলছেন তিনি হিংসার বদলে সৌভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলার উদ্দেশ্যেই লেখাটি লিখেছিলেন।
কমল হাসানের লেখার ওপর কোনও মামলা হওয়া উচিত নয়। এই ধরনের মামলার একটা প্রবণতা এদেশে বেশ কিছুদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে। মতপ্রকাশের অধিকারকে সীমাবদ্ধ করে দেওয়াই এর লক্ষ্য প্রকৃষ্ট পথ হল, যা লেখা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে পাল্টা লেখা ছাপানো বা জনমত তৈরি করা। হতে পারে, কমল হাসানের বিরোধীরা জনমত গড়ে তোলার জন্যই মামলা করেছেন যাতে বিষয়টা নিয়ে বিতর্ক বাড়ে। যাই হোক, যে বিষয়টি নিয়ে আবেদনকারী আপত্তি তুলেছেন, তার কিন্তু রাজনৈতিক সারবত্তা আছে। সারা পৃথিবীতে ইসলামতন্ত্র তৈরির লক্ষ্যে কিছু মারাত্মক শক্তি সক্রিয় রয়েছে। এদেশেও, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তাদের প্রভাব বাড়ছে। এখনও অবশ্য তা খুবই সীমিত। ঠিক এই সময় হিন্দুদের আঘাত করলে লিবারেলদের খুশি করা যাবে ঠিকই, কিন্তু সৌভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলা যাবে কিনা তাতে ঘোর সংশয় আছে। হিন্দু সন্ত্রাস বলে কিছু যদি থেকে থাকে, তার সমালোচনা করতে হবে। একইসঙ্গে কিন্তু ইসলামিতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আইএসের মতো সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের নিন্দাও করতে হবে। তা না হলে হিন্দুদের মধ্যে ‘ভিকটিম সিনড্রোম’ তৈরি হবে, যা দেশের ভবিষ্যতের পক্ষে বিপজ্জনক।
কমল হাসান বলেছেন, তাঁর আগের মন্তব্যের জন্য যদি আদালতে যেতে হয় তাহলে তিনি প্রস্তুত। কিন্তু হিন্দুদের নিয়ে নিজের বক্তব্য ব্যাখ্যা করতে ‘আনন্দ বিকতন’ পত্রিকায় আবারও একটি নিবন্ধ লিখতে হয়েছে তাঁকে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, দেশে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। পরিবারের বড় ভাইয়ের মতো। তাই বড় ভাইয়ের মতোই হিন্দুদের উচিত সংখ্যালঘু কোনও সম্প্রদায় যদি কোনও ভুল বা অন্যায় করে তাহলে তাদের সংশোধন করে তাদের বুকে টেনে নেওয়া। এটা পরিবারের বড় ভাইয়ের দায়িত্ব এবং কর্তব্য দুটোই। একইসঙ্গে কমল বলেছেন, আদালতের কাজ দোষীদের শাস্তি দেওয়া। সেই কাজ আদালতকেই করতে দেওয়া উচিত। এবারের বক্তব্য কিন্তু অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। সংখ্যালঘুদের সংশোধন করা কীভাবে সম্ভব, সেই কাজটাও অবশ্য এরপর তাঁকে করে দেখাতে হবে। নিজেই নিজের দায়িত্বটা বাড়ালেন।
মনে হয়, তাঁর বিতর্কপ্রীতি রাজনৈতিক জীবনে বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তামিল সিনেমার নায়ক বা চিত্রনাট্যকারেরা রাজনীতিতে এলেই সাফল্য পাবেন, এমন কিন্তু নয়। শিবাজি গণেশন রাজনীতিতে এসে কোনও সাফল্যই পাননি। তামিলনাড়ুর এখনকার বদ্ধ রাজনৈতিক জলাশয়ে নতুন দিশা দেখাতে না–পারলে কমল হাসানের সাফল্যের সম্ভাবনাও কিন্তু কমে যাবে।
