
‘ইহাতে বর্ষার সমস্ত অন্তর্বেদনা নিত্যকালের ভাষায় লিখিত হইয়া গেছে’-রবীন্দ্রনাথ
হাবিবুর রহমান স্বপন
কালিদাসের কবি-প্রতিভার চূড়ান্ত নিদর্শন ‘মেঘদূত’। রামগিরি থেকে হিমালয় পর্যন্ত প্রাচীন ভারতের এক খণ্ড কিন্তু অনন্য চিত্রে সমুজ্জ্বল এই ক্ষুদ্র গীতিকাব্য। কেতকীবেষ্টিত উপবন, পাখিদের নীড়, গ্রামচৈত্য, উজ্জয়িনী, অবন্তী, বিদিশা প্রভৃতি নগর, বিন্ধ্যা, কৈলাস, দেবগিরি প্রভৃতি পর্বত এবং রেবা, শিপ্রা, বেত্রবতী ইত্যাদি নদী, সুপ্ত নগরসৌধ, পরিত্যক্ত রাজপথ, হর্ম্যবাতায়ন থেকে ভেসে আসা পুরবধূদের কেশ সংস্কারধূপের ঘ্রাণ – সব মিলিয়ে অতীত, অবলুপ্ত ভারতের এক সজীব চিত্র মেঘদূত কাব্যে চিরবিধৃত। বহিরঙ্গ পরিচয় এই কাব্যের শেষ কথা নয়। এই কাব্যে ধ্বনিত হয়েছে সর্বকালের মানুষের অতলস্পর্শ বিরহ। এক অর্থে প্রতিটি মানুষই নির্বাসিত, বিরহী যক্ষ। ‘মানুষেরা এক-একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো, পরস্পরের মধ্যে অপরিমেয় অশ্রুলবণাক্ত সমুদ্র।’
অনুকরণীয় ভাষায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কালিদাস ও ‘মেঘদূত’ কাব্যের মূল্যায়ন করেছেন: ‘উৎসবে যে মাটির প্রদীপের সুন্দর দীপমালা রচনা হয় পরদিন তাহা কেহ তুলিয়া রাখে না। ভারতবর্ষে আনন্দ-উৎসবে নিশ্চয়ই এমন অনেক মাটির প্রদীপ, অনেক ক্ষণিক সাহিত্য নিশীথে আপন কর্ম সমাপন করিয়া প্রত্যুষে বিস্মৃতিলোক লাভ করিয়াছে। কিন্তু প্রথম তৈজস প্রদীপ এখনো আমাদের ঘরে রহিয়া গেছে। আমাদের উজ্জয়িনীবাসী পিতামহের প্রসাদশিখরে তাহা প্রথম জ্বালিয়াছিল, এখনো তাহাতে কলঙ্ক পড়ে নাই।”
‘মেঘদূত’ স্বরবৈচিত্র্য, ধ্বনি গাম্ভীর্য, অতুলনীয় চিত্রকল্পের সমাবেশ এক অনন্য বর্ষাকাব্য। মন্দাক্রান্তা ছন্দে রচিত এর প্রত্যেকটি শ্লোক আপনাতে আপনি সমাপ্ত। প্রতিটি শ্লোক স্বতন্ত্র হীরকখণ্ডের মতো উজ্জ্বল এবং সমস্ত কাব্যটি হীরকহারের মতো সুন্দর। এই কাব্যে কালিদাস একই সঙ্গে প্রকৃতির কবি মানুষের কবি।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন:“মেঘদূত ছাড়া নববর্ষের কাব্য অন্য কোনো সাহিত্যে কোথাও নাই। ইহাতে বর্ষার সমস্ত অন্তর্বেদনা নিত্যকালের ভাষায় লিখিত হইয়া গেছে। প্রকৃতির সাংবাৎসরিক মেঘোৎসবের অনির্বচনীয় কবিত্বগাথা মানবের ভাষায় বাধা পড়িয়াছে।”
‘মেঘদূত’-এ গল্প নেই। যেটুকু আছে তা অতি সূক্ষ্ম এবং প্রচ্ছন্ন। প্রভুশাপে নির্বাসিত এক যক্ষ, বর্ষার মেঘকে তাঁর বিরহিনী প্রেয়সীর কাছে বার্তা পৌঁছে দেবার জন্য অলকাপুরীতে যেতে কাতর অনুরোধ অনুনয় জানিয়েছে। কাব্যের প্রথমার্ধে যক্ষ মেঘকে অলকাপুরী যাবার পথ নির্দেশ করেছে। দ্বিতীয়ার্ধে সে অলকার বর্ণনা দিয়েছে, তার সৌধাবলী যক্ষবধূ সব কিছুর কথা বলে পরিশেষে সে তার বার্তা জানিয়েছে। মঙ্গলাচরণসহ কাব্য শেষ হয়েছে। মঙ্গল আচরিত হয়েছে মেঘের প্রতি যক্ষের এক আশীর্বাণীতে- ‘ক্ষণকালের জন্যও যেন বিদ্যুৎ প্রিয়ার সঙ্গে যেন বিচ্ছেদ না ঘটে।’
মেঘদূতে ধর্মের কথাও নেই, কর্মের কথাও নেই। এটি পুরাণও না আবার ইতিহাসও না। যে অবস্থায় মানুষের চেতন-অচেতনের বিচার লোপ পেয়ে যায় এটি সেই অবস্থার প্রলাপ। এতে প্রয়োজনের কথা কিছুই নেই। এটি নিটোল মুক্তা এবং এতে বিরহীর বিদীর্ণ হৃদয়ের রক্তচিহ্ন কিছু লেগেছে, কিন্তু সেটুকু মুছে ফেললেও এর মূল্য কমবে না। এর কোনো উদ্দেশ্য নেই বলেই এই কাব্যখানি এমন স্বচ্ছ এমন উজ্জ্বল।
টীকাকারগণ সঙ্গত কারণে ‘মেঘদূত’ কাব্যকে পূর্ব ও উত্তর এই দুটি ভাগে ভাগ করেছেন। কারণ দুটি অর্ধের চরিত্রগুণ ভিন্ন। প্রথমার্ধে মেঘের পথনির্দেশ প্রসঙ্গে এসেছে বিভিন্ন পাহাড়, নদনদী, নগরী, পল্লী, সেই সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে মেঘপ্রত্যাশী নর-নারীর কথা। অপরার্ধে এই গতি এবং ক্রমিক দৃশ্যান্তর নেই, তার জায়গা নিয়েছে কয়েকটি ভাবময় স্থিরচিত্র; হৃদয়ের কামনার ধন অলকাপুরীর বিবরণ, যক্ষের গৃহপরিবেশ, উদ্যান, ক্রীড়াপর্বত, পোষা ময়ূর আর অবশেষে বিরহবিহ্বলা যক্ষবধূর অশান্ত বিনিদ্র রাত্রিযাপন চিত্র। দৃশ্যাবলীর ক্রমিক বিস্তার যেন ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে এসে সবশেষে পাদপ্রদীপের সবটুকু আলো নিক্ষেপ করেছে ওই প্রণয়বিহ্বলা, প্রত্যুষের চন্দ্রকলার মতো হীনপ্রভা ক্লিষ্টা তরুণীর ওপর।
কালিদাস সবিস্তারে মেঘের বিচিত্র যাত্রাপথের সানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন; শুষ্ক তৃষ্ণার্ত ভূমি, বিরহখিন্না প্রণয়িনীর মতো শীর্ণ অগভীর জলধারাগুলি মেঘের পথ চেয়ে আছে, পথ চেয়ে আছে পর্বতগুলিও তাদের প্রিয় বন্ধু বর্ষার মেঘের জন্য। কৃষকবধূরা এক হাতে শিথিল কেশপাশ সরিয়ে উৎসুক চোখে আকাশের বুকে মেঘের সন্ধান করছে। উজ্জয়িনী প্রমুখ নগরী, সেখানকার নগরবাসিনীরা, গণিকামণ্ডলী এবং মন্দিরে মন্দিরে দেবদাসীদের শ্রান্ত দেহ বর্ষাবারির সস্নেহ চুম্বন লাভের অপেক্ষায়, পরিণত ফলচ্ছায়ে শ্যাম বনান্তভূমি, গ্রামে গ্রামে উদয়ন কথালাপদক্ষ গ্রামবৃদ্ধের দল এই সব কিছুর অনুপম সন্নিবেশনে প্রথমার্ধে যেন ভূমিকা রচনা করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ার্ধে বর্ণনার কেন্দ্রবিন্দুতে দেখা দিয়েছে অলকা, সে এক কল্পজগৎ; সেখানে অশ্রু নেই, দুঃখ নেই, বিচ্ছেদ নেই। চিরযুবা যক্ষেরা সেখানে যথেচ্ছ প্রণয়সুখ ভোগ করে। এই কাব্যময় বর্ণনার পটভূমিতে একদিকে দেখা যায় রামগিরি পর্বতে প্রিয়বিরহী অদেখা যক্ষকে, অন্যদিকে বিরহখিন্না তারই প্রোষিতভর্তৃকা বধূকে।
বর্ষাকাল বিশেষভাবে বিরহ দুঃখজনক। পুরাকালে বর্ষা ছিল কর্মহীন ঋতু, তখন যুদ্ধ বা বাণিজ্য সম্ভব ছিল না। স্থলপথে (এবং জলপথেও) ভ্রমণ ছিল দুঃসাধ্য। তাই বর্ষারম্ভের পূর্বেই প্রবাসী পতিরা ঘরে ফিরতেন। পূর্বমেঘে তার বহু উল্লেখ আছে। বর্ষার সঙ্গে বিরহ বেদনার সম্বন্ধ ভারতের একটি প্রধান কবিপ্রসিদ্ধি। রামায়ণের কিস্কিন্ধাকাণ্ড, মেঘদূত, জয়দেব ও বৈষ্ণব গীতিকা, তারপর রবীন্দ্রনাথ- এমনি করে একটি আবহমান ধারা চলে আসছে এবং আজকের যন্ত্রযুগেও বর্ষার মেঘ আমাদের মনে কীরকম মায়াবিস্তার করে, তার প্রমাণ আছে নজরুল ইসলাম, অতুলপ্রসাদ, জসিমউদ্দিনসহ বহু কবি-সাহিত্যিকের গান, কবিতা ও গল্পে। এক কথায় বলা যায়, কালিদাসের কবি-প্রতিভার চূড়ান্ত নিদর্শন ‘মেঘদূত’।
(‘ভোরের কাগজ’-এ প্রকাশিত লেখকের একটি প্রবন্ধ থেকে নির্বাচিত অংশ)
