সাংবাদিক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়:সার্ধশতবর্ষ পেরিয়ে

দেশের বৌদ্ধিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের মতাদর্শের দর্পণও ছিল এই পত্রিকা

রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়-ভারতীয় সাংবাদিকতার ইতিহাসে সাহসী ব্যক্তিত্বের সঙ্গেই সম্পাদক হিসেবে নিজ বিশ্বাসে স্থির থাকার যত উদাহরণ আছে, তার মধ্যে অন্যতম একজন৷ সাহসিকতা পূর্ণ কর্মজীবনে পরিণতির উপেক্ষা করে, নিজ দর্শন-ভাবনা আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ভিত্তিই ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম চালিকাশক্তি৷

রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় জন্ম ১৮৬৫ সালে৷ মেধাবী ছাত্র রামানন্দ ১৮৯৫ সালে এলাহাবাদে এসে, সেখানকার একাধিক সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন৷ সচ্চিদানন্দ সিংহ-র পত্রিকা ‘হিন্দুস্থান রিভিউ’-এর নিয়মিত লেখক ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়৷ আবার ১৮৯৭ সালে, এলাহাবাদ থেকেই, মাসিক পত্রিকা ‘প্রদীপ’-র প্রকাশ ও সম্পাদনা করা শুরু করেন তিনি, যাতে সমসাময়িক বিখ্যাত লেখকদের তালিকায় ছিলেন কবিগুরুও৷ ১৯০১ সালে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, সাহিত্যধর্মী মাসিক সচিত্র পত্রিকা ‘প্রবাসী’ প্রকাশ করতে শুরু করেন৷ আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, অরবিন্দ ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়-প্রমুখরা এই পত্রিকায় লিখতেন৷ বাংলায় সচিত্র, তিনটি রঙ-সমন্বিত প্রথম পত্রিকা ছিল ‘প্রবাসী’৷ অবশ্য তারই সঙ্গে, দেশের বৌদ্ধিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের মতাদর্শের দর্পণও ছিল এই পত্রিকা৷

রামানন্দের পত্রিকা সম্পাদনায় আরেকটি ব্যতিক্রমী দিক হল, তিনি ঘটনাকে সততার সাথে সংখ্যাতত্ত্ব সহযোগে বিশ্লেষণ করতেন৷ বাস্তবতাবোধের সঙ্গে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গীর এইরকম মিশেল, সেইসময়ে অন্ততঃ ভীষণরকমভাবেই উল্লেখযোগ্য ছিল ৷ আবার তাঁর লেখার ধারা ছিল সম্ভ্রমসূচক, কিন্তু সহজ-সরলও৷ তৎকালীন, চরমপন্থী জাতীয়তাবাদী নেতাদের চিন্তাভাবনার ছায়া তাঁর লেখাতে পড়লেও, সংস্থা-প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তি-র বিষয়ে সুনিশ্চিত বিশ্বাসও কিন্তু তিনি রাখতেন না৷ প্রসঙ্গত উল্লেখ করতেই হয়, ব্রিটিশ শক্তির বঙ্গভঙ্গের সিন্ধান্তে দেশবাসীর ক্ষোভ, বিশেষ করেই তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার আবেগ, স্বাধীনতা আন্দোলনকে এক আলাদা মাত্রা দিয়েছিল৷ এইসময় ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলনও, সংরক্ষণশীল আর চরমপন্থী-দুটো ভাগে ভাগ হয়ে গেছিল ৷ আপামর মানুষের, আবেগের সাথে গঠনমূলক পথ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও দেখা দিল খানিকটা দ্বিধা৷ এবং এর রেশ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল৷ এইরকম সময়ে ১৯০৭সালে, ‘মর্ডাণ রিভিউ’ পত্রিকা প্রকাশ করলেন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়৷ নিজস্ব চিন্তাভাবনার বিস্তৃত পরিসরে, বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তা-ভাবনা প্রসূত সম্পাদকীয় বৈশিষ্ট্যে যে সততা ছিল, তা কোনও সংগঠন-ব্যক্তি-তথ্য বা তত্ত্ব দ্বারা স্বাভাবিকভাবেই পরিচালিত হয়নি৷ পাশ্চাত্য সভ্যতার শিক্ষায় আলোকপ্রাপ্ত রামানন্দ মনে করতেন, জাতীয় ধীশক্তির বিকাশ মানুষের অগ্রগতির একমাত্র উপায়৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-গান্ধীজির মূল্যবোধের পাশাপাশিই, রাজা রামমোহন রায়ের আন্তর্জাতিক অতীত ঐতিহ্যের ওপর ছিল তাঁর পূর্ণ বিশ্বাস৷ তাই ভারতের আন্দোলনকে, আন্তর্জাতিক লড়াইয়ের অঙ্গ হিসেবেই দেখতে চেয়েছিলেন৷ ‘মর্ডাণ রিভিউ’ পত্রিকা তাঁর সেই চিন্তা-ভাবনা-প্রচেষ্টারই অন্যতম কাণ্ডারী ছিল৷ তাঁর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার এই স্বতন্ত্রতা তাই, ‘মর্ডাণ রিভিউ’-কেও করে তুলেছিল স্বতন্ত্র৷

১৯০৮ সালে এলাহাবাদ ছেড়ে রামানন্দ চলে আসেন কলকাতায়৷ বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন আরও চরমপন্থী হয়ে উঠেছে সেইসময়৷ সম্পাদক ও ব্যক্তি রামানন্দের অবস্থান সব ধরণের আন্দোলনকে সর্মথন করলেও, তাঁর কাগজ কিন্তু তৎকালীন দল-নেতা-ব্যক্তির মুখপত্র হয়নি; তিনি সেভাবে ব্যবহার করেননি বা করতে দেনও নি৷ সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা-আবেগ-অচলাবস্থা-মানুষের দাবী বা হিংসাত্মক কার্যকলাপের মধ্যেও তিনি মেনে চলতে চেয়েছেন, একজন নিরপেক্ষ সাংবাদিকের ধর্ম৷ বস্তুত সময়ের দোলাচল, একজন পেশাদার সাংবাদিককে ভালো কিছু করার জন্য উৎসাহিত করলেও, পেটের সাথে মনের দ্বন্দ আজও এই পেশার কার্য্য-গতিপ্রকৃতি নির্ধারণের নিয়ন্তা৷ সময় বিশেষে পরিণাম পরিবর্তিত হয়, যেমন হয়েছিল রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের৷ তাঁর নিজস্বতাবোধের মাত্রার সীমা ব্রিটিশ শক্তিকেও আতঙ্কিত করেছিল৷ একটি প্রবন্ধের জন্য, ১৯২৮সালে জেলে যেতে হয় এবং বিচারে আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় তাঁর ২০০টাকা জরিমানাও হয়৷

ব্যতিক্রমী পথের পথিক, নিজ গুণেই আলাদা জায়গা করে নেন৷ সাংবাদিকতায় অর্থনৈতিক ও শিক্ষা-সংক্রান্ত বিষয়কে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর সংখ্যাতত্ত্বের প্রয়োগ- কৌশলের প্রবর্তন এইরকমই একটি নতুন ধারা ছিল৷ একই সাথে রামানন্দের জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গীকে, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে প্রয়োগও ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের৷ বিষয়কে বৈচিত্র্য-সহযোগে, ব্যাপক আকারে উপস্থাপনার সাথেই তার বিশ্লেষণ, ঘটনার গতি-প্রকৃতির পূর্বাপর বিশ্লেষণ, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের উচ্চ-শিক্ষিত মানুষ সমন্ধে বিশ্লেষণ-প্রভৃতি সব প্রেক্ষিতগুলির উপস্থাপনার মধ্যেই, কাজ করেছিল তাঁর জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গীর সাথেই সম্পৃক্ত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাবোধ। ‘মর্ডাণ রিভিউ’ পত্রিকা রামানন্দের যে বিপ্লবী আবেগকে প্রচার করেছিল, তা আসলে সারা পৃথিবীর কাছেই ভারতবাসীর রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনাকে জানানো৷

প্রকৃতপক্ষে, মানুষের আদর্শ কিংবা দৃষ্টিভঙ্গীকে অনেকসময়ই সংজ্ঞা দিয়ে বা এককথায় বোঝানো সম্ভবপর হয় না৷ সঠিক-সত্য সিন্ধান্তের যতটা সম্ভব কাছাকাছি আসতে গেলে, মানুষটির কর্মজীবন,অন্যান্য ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গী-পদচারণায় সাবলীলতা এবং আরো নানান প্রেক্ষিত থেকেও, তাকে অনেকসময় বিস্তৃতভাবে যাচাই করে দেখতে হয়৷ রামানন্দ প্রসঙ্গেও বিভিন্ন বিশ্লেষণে, আমরা অনেকসময় পরস্পর-বিরোধী মতামত পাই৷ ধর্মের দিক দিয়ে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ব্রাহ্মণ হলেও, তিনি রীতি-আচার বিশেষ পালন করতেন না৷ সাহিত্যের ক্ষেত্রে ছিলেন আধুনিক, আর শিল্পের ক্ষেত্রে বিকাশপন্থী৷ স্বদেশী আন্দোলনের পর্বে, হিংসাত্মক বিচ্ছিন্নতাবাদী কাজকর্মকে সর্মথন না করলেও,অসহযোগ আন্দোলনকে সর্মথন করেছিলেন৷ রাজনীতির প্রসঙ্গে যিনি উদারপন্থী এক সংস্কারক, তিনিই উল্টোদিকে স্বাধীনতার প্রসঙ্গে অনমনীয়-আপসহীন ব্যক্তিত্ব্৷ তাই, এটাই বাস্তব যে পরস্পর-বিরোধী চরিত্রের এই সংমিশ্রণই কিন্তু তাকে, সাংবাদিক-রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে দিয়েছিল স্বতন্ত্র মর্যাদা৷

Developed by DXDasia