
আজও কেউ ভাল ফিল্ডিং করলে তুলনা করা হয় জন্টির সঙ্গেই
ফিল্ডিং শব্দটা ইদানিং একটা অন্য ব্যঞ্জনা পেয়েছে। সেটাও আবার একটা বয়েসের ছেলেমেয়েদের কাছে। পাঠক, বুঝতেই পারছেন কি বলতে চাইছি, সিনেমা টি ভি দেখে সেইসব নায়ক নায়িকা হিসেবে কারো সামনে নিজেকে প্রেজেন্ট করা এবং ব্যাপারটাকে ঘনিয়ে তোলা আর কি । এই fielding- টার্ম টা আমার খুব মজার লাগে এ ক্ষেত্রে। অমুকে তমুকের সাথে ফিল্ডিং দিচ্ছে—ফিল্ডিং শব্দটাই এসছে ফিল্ড থেকে, ফিল্ড – মাঠ জমি , ক্ষেত্র বিশেষে ক্ষেত্র, আবার রণক্ষেত্র এরকম একাধিক মানে নিয়ে শব্দ টা আসে। প্রত্যেকটা জায়গায় ফিল্ডিং আলাদা, চাষি যেটা করে সেটাও ফিল্ডিং মানে চষে ফেলা, কুরুক্ষেত্রে কর্ণ – অর্জুনের ফিল্ডিং আলাদা। কুরুক্ষেত্রে আরেক ভদ্রলোক নিজের আম্পায়ার সত্তা বজায় রেখে অর্জুনের পেছনে নিজেকে ইনভেস্ট করে গেলেন তাঁর ফিল্ডিং ও আলাদা, বোধহয় সব থেকে ইউনিক।
এই ভদ্রলোকের ক্ষেত্রেই কেউ কোনোদিন জিজ্ঞেস করেনি, ওঁর রান কত, কটা উইকেট পেলেন সারাজীবনে। জন্টি রোডস। নামটা শুনলেই একটা ছবি ভাসে, বুকে S A জার্সি পরা একটা লোক বাজ পাখির মত উড়ে একটা বল গ্রিপ করার চেষ্টা করছে।
খুব বেশী হলে ১০ বছর ক্রিকেট খেলেছেন, ১৯৯২-২০০৩। তার মধ্যে ২০০০ সালে টেস্ট থেকে অবসর নিলেন। ফিল্ডিং ভালো করলে লোকে এখনো জন্টি বলে ডাকে খেলোয়াড়কে। ব্যাটিং এর অনেক অপশান আছে, কেউ বলে ওহ শচীনের মত কেউ, কেউ বলে সৌরভের মত। ফিল্ডিং এ সেটা হয় না এখনও হয় না। ২০০৩ সালে অবসর নেবার পর বা সেই সময় থেকে বিশ্ব ক্রিকেটে, যুবরাজ, কাইফ, রিকি পন্টিং থেকে হালের জাদেজা অবধি প্রচুর ভালো ফিল্ডার এসছেন। কিন্তু জন্টি একজনই।
ওঁর কিন্তু ফিল্ডার সত্তা ছাড়া আর কোনও সত্তা ছিল না। যাঁদের নাম উল্লেখ করলাম তাঁরা দারুণ ব্যাটসম্যান / বোলার এটা নিজেরাও জানেন, বিশ্বেও প্রমাণিত। জন্টি সেটা নন সেটা উনি নিজেই জানেন। ২৯৭ টা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে ৫ টা শতরান। কবিতার সাথে ১৫/২০ বছর থাকতে থাকতে কিছু লোক ৫/১০ কবিতা বা কবিতার মত কিছু লিখে ফেলেন, সেরকম আর কি। তাঁরা হয়তো খুব ভালো অধ্যাপক বা খুব ভালো ইঞ্জিনিয়ার বা খুব ভালো চিত্রকর। জন্টি তাই, সেটা স্বীকার করেছেনও । একজন বোলার তার ছ টা বলের ছটায় ব্যাটসম্যানকে ঝলসে দিয়ে, ডিপ ফাইন লেগে গিয়ে একটু রিল্যাক্স করতে পারেন, বা মিড অফের কাছে দাঁড়িয়ে একটু জল খেতে পারেন। আবার পরের ওভারে দাপট দেখাতে আসবেন।যিনি পোটেন্সিয়াল ফিল্ডার তাঁকে সব সময় সক্রিয় থাকতে হচ্ছে, তৎপর থাকতে হচ্ছে। আর ওঁর মত ফিল্ডারের জায়গা কিন্তু স্লিপ নয়, হয় এক্সটা কভার নয় সিলি মিড অন নয় ফরোয়ার্ড শর্ট লেগ। এরকম জায়গা দাঁড়িয়ে কেউ রিল্যাক্স করতে পারেনা। যেমন জর্জ হ্যারিসনের গানেও লোকের ঘুম আসেনা। বড় ফিল্ডার করেন কি,তিনি জানান দেন তিনি কোথায় আছেন, জন্টি তাই। জন্টি বলতেন আমি চাই, আশা করি প্রতিটা বল আমার কাছে আসুক, না এলে হতাশ লাগে।৫০ ওভার গোটা মাঠ ছুটে ছুটে কেটে যায়।
এই স্টেটমেন্টটাকে ঠিক কমিটমেন্ট বলে না, এটা ইনভলভমেন্ট।এটা ভাবতে পারতেও একটা মন চাই। এই ফাঁকে বলে রাখি, জন্টি প্রথম খেলোয়াড় দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেটে যার ১০০ টা ক্যাচ আছে। ১৯৯২- ১৯৯৩ এর হিরো কাপের ফাইনালে জন্টি ৫ টা ক্যাচ নিয়েছিলেন। খেলার পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্যাপ্টেন রিচি রিচার্ডসন বলেছিলেন, “We suffered from ‘Jontivitis’!”
ফুটবল, হকি আর ক্রিকেট তিনটে খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে জন্টি ক্রিকেট খেলতে এসেছিলেন।হকির জন্যে বার্সিলোনা অলিম্পিক খেলার ছাড়পত্রও পেয়েছিলেন কিন্তু দলটি কোয়ালিফাই করতে পারেনি বলে খেলা হয়ে ওঠেনি।
বড় ফিল্ডারের এটা আর একটা বড় গুণ যে, দুজন আলাদা ব্যাটসম্যানের জন্য দুটো আলাদা জায়গা বেছে নেন দাঁড়াবার। এটা কাউকে বলে দিতে হয় না, উপলব্ধি আর অভিজ্ঞতার ব্যাপার। যার জন্যে স্লিপে জন্টিকে খুব একটা পাইনি আমরা।ওঁর মত ছটফটে খেলোয়াড় দিয়ে স্লিপে ক্যাচ হত না। স্লিপের জন্য আদর্শ লোক মার্ট টেলর মার্ক ওয়া ওঁর মতে। শেষ অবধি একটা চাপা অভিমান নিয়ে ওঁকে রিটায়ার করতে হয়। যেটা অনেকেই জানেন না। জন্টি একটা মাত্র সাক্ষাৎকারে এর উল্লেখ করেছিলেন, ২০০৩ যখন বিশ্বকাপের সময় হাড় ভাঙে ডাক্তারের মত অনুযায়ী দু সপ্তাহ সময় লাগত সাড়াতে, নির্বাচকরা সেটা দিতে চাননি। জন্টিদের এভাবে সরে যাওয়া ক্রিকেটের পক্ষে লজ্জার। যখন দেশটা দক্ষিণ আফ্রিকা। আজ জন্টি ৪৮ বছরে পা দিলেন।ভারতবাসীর জন্টির কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত, ওঁর মেয়ের নাম উনি দিয়েছিলেন INDIA।
