
‘মাদার মেরির কোলে আমার শিশু যিশু দোলে’
যে পথে আরাকান প্রদেশ থেকে রোহিঙ্গারা এলেন চট্টগ্রামে, হেঁটে-সাঁতরে-নৌকায়, সে পথেই নোঙর করেছিল পর্তুগিজরা। শোনা যায়, ১৬২১ নাগাদ গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলে দস্যুবৃত্তিতে ধরা পড়া অপরাধীদের খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষা দেন পর্তুগিজরা। এর কিছু সময় পরে যশোরের ভূষণা'র নিম্নবর্ণের রাজপুত্র ২০,০০০ প্রজা সহ ধর্মান্তরিত হন। খ্রিষ্টধর্মের প্রাথমিক নিয়ম ও উপদেশ শিখিয়ে নতুন কেন্দ্রগুলিতে নয়া খ্রিষ্টানদের অভিবাসী হিসেবে পাঠানো হত। ‘মাইরি’- আম বাঙালির শপথ নেওয়ার বা দিব্যি করার এই শব্দটি নাকি পর্তুগিজ। যা আসলে মাদার 'মেরি'।
এ সময় কলকাতার আশেপাশে বেশ কিছু গির্জা তৈরি হয়েছে। ১৫৯৯-এ তিন বছর ধরে কাজ চলার পর আকবরের কাছ থেকে হুগলিতে পাওয়া জমিতে প্রথম পর্তুগিজ গির্জা হয়। ৩২ বছর পর শাহজাহানের আক্রমণে তা ধ্বংসও হয়। ১৭৫৭-য় সিরাজদৌল্লার পতনের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রভাব যত বেড়েছে, ততই আসতে শুরু করেছেন স্কটিশ, ডেনিস সহ অন্যান্য পশ্চিমী ধর্মযাজকরা।
কৃষ্ণ পাল। কলকাতার এই মানুষটি ১৮০০ সালের ২৮ ডিসেম্বর জাতপাত অর্থাৎ বর্ণাশ্রমের বিরোধিতা করে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষা নেন। পরের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর শ্যালিকা জয়মণিও ধর্ম বদলান। কলকাতার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রথম বাঙালি হিসেবে খ্রিষ্টান হওয়ার তকমা পান এই দু'জন। উল্লেখ্য,এই বছরই ডেনিশ যাজক উইলিয়াম কেরীর উদ্যোগে পঞ্চানন বর্মা প্রথম বাংলা বাইবেল প্রকাশ করেন।
মূলত জাতপাত, ৪ বর্ণের ৩৬ রকমফেরে তিক্ত হয়ে বাগ্মী, পণ্ডিতরা যখনই খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন, তৎকালীন নাগরিক সমাজে ততবারই হইহুল্লোড় হয়েছে। ১৮৩২ সালে একযোগে ব্রজমোহন ঘোষ, কালীমোহন ব্যানার্জ্জী ও জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুর ধর্মান্তরিত হন। এই ব্রজমোহন ঘোষ আবার বঙ্গদেশের প্রথম ব্যারিস্টার। ১৮৩৯-এ সাগরদাঁড়ির মেধাবী মধুসূদন দত্ত খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করলে বিতর্ক চরমে যায়। উকিল বাবা রাজনারায়ণ দত্ত ত্যাজ্যপুত্র করতে সময় নেননি। বছর তিনেক পর বর্ণবাদ ও ব্রাহ্মণবাদের চূড়ান্ত সমলোচক পণ্ডিত, ব্যাকরণবিদ, সমাজ সংস্কারক কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ – কলকাতার নাগরিক সমাজে ঝড় তুলেছিল। দীর্ঘ এই সময়ে কলকাতায় গণ-ধর্মান্তরের ঘটনা নেই। কারন অবশ্য হিন্দু ও ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের বিরোধ।
কলকাতার পত্রপত্রিকা ও সাময়িকীর নজর ও আলোচনার বাইরে এ সময় নদিয়ায় ঘটে প্রথম গণ-ধর্মান্তর। কৃষ্ণনগরের আশেপাশে কর্তাভজা সম্প্রদায়ের একটা বড় অংশ খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে। আউলচাঁদ(১৬৯৪-১৭৭০) প্রতিষ্ঠিত কর্তাভজা সম্প্রদায় হিন্দু-মুসলিম কোনও ধর্মকেই মান্যতা দিত না। বৈষ্ণব ও সুফিবাদে ভর করা আউলচাঁদের সমন্বয়বাদী মতবাদ সহজিয়া বাউল-ফকিরদের অন্যতম শিকড়। মহাপ্রভুকে তাঁরা ঈশ্বর, আল্লা বা কর্তা হিসেবে মান্যতা দিতেন। আর সঙ্গীত ছিল তাঁদের মানবসাধনার মূল আধার। কলকাতা, ২৪ পরগনা, সুন্দরবন ও সিলেট অঞ্চলে কর্তাভজা সম্প্রদায়ের সংখ্যা ছিল প্রভূত। নদিয়ায় গণ-ধর্মান্তর প্রক্রিয়ার পর দীর্ঘকাল বাংলার প্রাতিষ্টানিক ধর্মের হাতে আক্রান্তরা কেউকেউ লোকধর্ম ছেড়ে খ্রিষ্টধর্মে পা বাড়িয়েছে। প্রসঙ্গত, ঐতিহাসিকভাবে একথা সত্য যে ফকির আউলচাঁদের নেতৃত্বে কামার, কুমার, তাঁতি, জেলে, কৃষক, মুচি, হিন্দু, মুসলমান, মগ, ফিরিঙ্গি, ওলন্দাজ, ব্রাহ্মণসহ সর্ব স্তরের মানুষ কর্তাভজা সম্প্রদায়ে দীক্ষিত হয়। এ দৃষ্টান্ত প্রমাণ দেয় কর্তাভজা সম্প্রদায়ে সকলের প্রবেশাধিকার সমান ছিল।
আরও পড়ুন
বাংলার লুপ্তপ্রায় পর্তুগিজ শহর
সঙ্গীতময় কর্তাভজা সম্প্রদায়ের একাংশ খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করায়, বাংলার খ্রিষ্ট উৎসবে ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ল একতালের বৈষ্ণব ও ঢপকীর্তন। বাংলার চিরায়ত সুরে চৈতন্যের বর্ণনার ধারায় ঢুকে পড়লেন যিশু। এই ভর পৌষে নদিয়ার চাপড়া, পুঁটিমারি, মালিয়াপোতায় সকালে কান পাতলেই শোনা যাবে – ভেসে আসা প্রভাতী বা আসরে কীর্তনের সুর ও একতালের খোলে বোলে – "পূরব গগনে দেখো গো চাহিয়া/ নব তারা উদয় হল/ জ্যোতির্বিদগণে নিরখি নয়নে/ সেই তারার পিছু ধাইলো।" তারপর গানের গল্প জেরুজালেমের আস্তাবল থেকে মা মেরির খবর নিয়ে দোহারীতে ফের পৌঁছবে নদিয়া। বিশুদ্ধ কীর্তনে একজন গেয়ে উঠবেন "মাদার মেরির কোলে আমার শিশু যিশু দোলে।" কবেকার এই সুরে নাম না জানা গীতিকার লিখেছিলেন – "শচীমাতার কোলে, আমার নদের নিমাই দোলে।" প্রসঙ্গত, দক্ষিণবঙ্গে মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যেও একই সুরে "মা আমিনার কোলে, আমার রসুল নবী দোলে"- আজও শোনা যায়। সুরের ও ছন্দের কাঠামো সর্বত্র একই।
৪০০ বছরের সামান্য বেশি সময়, খ্রিষ্টধর্ম বঙ্গদেশে এল। পিছু ফিরলে পরিষ্কার দেখা যায় – বৌদ্ধ বাংলায় একে একে আসছে মনুবাদী ব্রাহ্মণ্যবাদ, সুফির পথ ধরে ইসলাম। ধীরেধীরে প্রতিষ্ঠানের রূপ নিচ্ছে ধর্ম। লোকাচার গড়ে উঠছে, বদলে যাচ্ছে। রক্তপাত শেষে খোঁজার তাড়নায় নতুন পথের দিকে পা বাড়িয়ে নগর সংকীর্তনে গায়ে গা ঘষে বর্ণাশ্রম মুছে ফেলতে চাইছে চৈতন্যের বাংলা। লালনের উচ্চারণে সংকীর্তন বয়ে আনে কবেকার আহ্বান – "সব দেহ সমান/সব দেহ সমান।"
আজকাল সময়ের গায়ে বড্ড বেশি ‘আমরা-ওরা’। নিধন ফিরছে মৌলবাদীর পোশাকে। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের পরিচিতি ডিঙিয়ে – স্বাভাবিক শীতও আসে। এ বাংলার নতুন ধানের মরশুমে নবান্নের ঢাকের শেষে আজও খোল বাজে সন্ধ্যায়। গান ধরেন বাউল বা ফকির। ওই তো মিলেমিশে একাকার হন কৃষ্ণ-খোদা-আল্লা-যিশু। আর ততদিনে সরল মন জেনে যায় – বড়দিন মানে ‘বড় ভাল দিন’।
