সূর্যমশাই বসেন পূজায়, পার্টি কেমন ডিগবাজি খায়
এবার পূজা শুরু হওয়ার আগেই সি পি আই (এম) দলের রাজ্য প্লেনাম শেষ হয়েছে। প্লেনামের আয়োজন করা হয়েছিল সংগঠনিক দুর্বলতাগুলিকে চিহ্নিত করতে। সেখান থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নেতা এবং কর্মীদের জনসংযোগ বৃদ্ধি করার জন্য।
সেই সূত্রেই ইদানিং সি পি আই(এম) মহলে জনসংযোগ নিয়ে এক নতুন বোধদয় ঘটেছে। দলের কেউ কেউ বলতে শুরু করেছেন জনসংযোগ বৃদ্ধির একটা বড় উপায় হল বিভিন্ন পূজা-পার্বণের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত রাখা। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে পূজা-পার্বণে সাধারণ মানুষ ব্যাপক ভাবে অংশ নিয়ে থাকে। কিন্তু কথা হল সি পি আই (এম) তথা বামপন্থীরা কী কোন দিন পূজা-পার্বণে বাদ সেধেছে?
বামেরা ৩৪ বছর এই রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল। তখন প্রশাসন তাদের হাতে থাকলেও কোন দিন কোথাও গায়ের জোরে পূজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে শোনা যায়নি। বরং বাম জামানায় আমরা তার বিপরীত চেহারাটাই দেখতে পেয়েছি। সারা রাজ্যের কথা বাদ দিয়ে শুধু কলকাতা শহরের কথা ধরা যাক। বামেদের রাজত্বে এই শহরে দুর্গা পূজার সংখ্যা বেড়েছে অন্তত তিনগুণ। শুধু তাই নয় বাম জমানায় আরও দুই দেবতার কপাল খুলেছে– তার একজন বাবা তারকনাথ এবং অপরজন শনি।
সেখানে প্রণামির থালা উপচে পড়তো এবং আজও পড়ে। আগে সেখানে উড়তো লাল ঝান্ডা, এখন ওড়ে ঘাসফুলের পতাকা। কিন্তু প্রণামি বাবদ প্রাপ্তি কোন কাজে ব্যবহৃত হয়? সেই প্রশ্ন লাল ঝান্ডাও তোলেনি, ঘাসফুলও তোলে না।
তবে শনির এমন রমরমার কারণ কোন বামপন্থী দলের দলিলে ব্যখ্যা করা হয়েছে বলে শুনিনি। নিয়েলসন- মার্গ সংস্থার এক সমীক্ষা থেকে জানা যাচ্ছে যে ভারতে এখন সবচেয়ে বেশী সমীহ পেয়ে থাকেন শনি। কারণ পুরাণের ব্যাখ্যা অনু্যায়ী ভারতীয় দেবতাদের মধ্যে শনির অনিষ্ট করার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি।
এখানে জানিয়ে রাখা দরকার যে একটা সময়ে বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পার্টির অফিস থেকে মাইকে পাঁচ ওয়াকত নামাজ প্রচার করা হত। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছু হয়নি।
পূজোয় গা-ভাসালেই যে জনগণের রাজনৈতিক আনুগত্য পাওয়া যাবে এমন কথাও ঠিক নয়। একটা সময় হিন্দু মহাসভা গিরিশ পার্কে ঘটা করে দুর্গা পুজা করতো। কিন্তু তাতে দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা যায়নি।
কিন্তু তাই বলে রাজনৈতিক দলগুলি কি পূজা-পার্বণ থেকে দূরে থাকবে? কখনই নয়। পূজার নামে, ধর্মের নামে যে অধোগতি শুরু হয়েছে তা রুখে দেওয়ার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলিকেই নিতে হবে। পূজা মানে তোলাবাজি নয়, উপরি কামাই নয়। এক পাড়ায় চারখানা পূজার আয়োজনের মধ্যে মাতব্বরি আছে কিন্তু কোন মাতৃভক্তি নেই। যে কর্পোরেট সংস্থাদের দাক্ষিণ্যে পূজার এই রমরমা সেই তহবিলকে স্থায়ী সামাজিক উন্নয়নের কাজে লাগাতে হবে। পুরোহিত হওয়ার জন্য এফিডেভিড করে ব্রাহ্মণ হওয়ার প্রয়োজন নেই। যে কেউ মায়ের পূজার পুরোহিত হতে পারে। ভুল সংস্কৃতে মন্ত্র পাঠ নয়, মাতৃভাষাতেই মাতৃবন্দনা শুরু হোক। তবে পূজার সূত্রে এই ধরণের কাজগুলিকে রাজনীতির কারবারিরা জনসংযোগ বলে মনে করবেন কি-না সেটা স্থির করার দায়িত্ব তাঁদেরই।