৮৭ বছর পেরিয়ে, বাংলা মাধ্যম স্কুল হিসেবে আজও জনপ্রিয় যাদবপুর হাইস্কুল

সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ৩৪

যাদবপুর হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৩৫ সালে। সূচনাকালে এই স্কুলের নাম ছিল যাদবপুর কলোনি প্রাইমারি স্কুল। দর্মার বেড়া ও টিনের চাল দিয়ে ছাওয়া ছিল স্কুলটি। নামমাত্র উদ্বাস্তু পরিবারের ছাত্রছাত্রী স্থানীয় কিছু শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গ এই স্কুলটি গড়ে তোলেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক গুণীব্যক্তি এই কর্মযজ্ঞে সামিল হয়েছিলেন।

ভারত যে বছর স্বাধীন হয়, সেই বছর অর্থাৎ ১৯৪৭ সালে এই স্কুলটি সরকারি অনুমোদন লাভ করে। ১৯৪৭ সালে স্কুলটি হাইস্কুলের স্বীকৃতি পায়। ওই বছরই স্কুলটির নাম যাদবপুর কলোনি প্রাইমারি স্কুল থেকে পরিবর্তিত হয়ে যাদবপুর হাইস্কুল নাম নেয়। ক্রমে ছাত্রছাত্রী সংখ্যা বাড়তে থাকলে ১৯৫২-‘৫৩ সালে যাদবপুর হাইস্কুল থেকে মেয়েদের বিভাগটি আলাদা হয়ে যায়। পুরোনো জায়গায় ছেলেদের স্কুলটি যাদবপুর হাইস্কুল নামেই থেকে যায়, মেয়েদের স্কুলের ভবনটি স্থান পরিবর্তন করে কাছেই একটি জায়গায় চলে যায় যাদবপুর হাইস্কুল, গার্লস নামে। যাদবপুর হাইস্কুলের জমিটি দেয় যাদবপুর এস্টেট লিমিটেড নামে একটি সংস্থা। স্কুল তৈরির এই তথ্য জানালেন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা শুভ্রা পুরকাইত।দর্মার বেড়া ও টিনের চাল নিয়ে শুরু হওয়া সেই যাদবপুর হাইস্কুলের ভবনটি এখন চারতলা। ২৫টি শ্রেণিকক্ষ। যাদবপুর হাইস্কুলে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি, ভূগোলের ল্যাবরেটরি আছে। দু’কক্ষের একটি লাইব্রেরি আছে, যেখানে ৫০ জন ছাত্র একত্রে বসে পড়তে পারে। রয়েছে দু’টো কম্পিউটার ল্যাবরেটরি এবং একটি সেমি-স্মার্ট ক্লাসরুম। বঙ্গদর্শন.কম-কে প্রধান শিক্ষিকা বললেন, “আমরা সেমি-স্মার্ট ক্লাসরুম বলছি কারণ, আমরা প্রজেক্টর দিয়ে ক্লাস নিই, আমাদের স্মার্ট টিভি নেই, সেটা কেনার চেষ্টা চলছে, সেই কাজটা এগিয়েছে ৫০ শতাংশ। স্মার্ট টিভি এলেই সেমি-স্মার্ট ক্লাসরুমটি স্মার্ট ক্লাসরুমে পরিণত হবে। তখন ওয়াই-ফাই দিয়ে কানেক্ট করে স্মার্ট টিভি সচল করে স্মার্ট ক্লাসটি সঠিকভাবে চালাতে পারব।” 

যাদবপুর হাইস্কুলে একাদশ, দ্বাদশে সায়েন্স, আর্টস,কমার্স পড়ানো হয়। এছাড়াও স্কুলের চারতলায় ২০০ ছাত্রর বসার মতো একটি হলঘর রয়েছে। বর্তমানে স্কুলের ছাত্র সংখ্যা ১০২০ জন। পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ৮টি ক্লাসে ৩টি করে মোট ২৪টি সেকশন চলে। স্কুলে শিক্ষক ২৯ জন, শিক্ষিকা ১৪ জন, লাইব্রেরিয়ান ১ জন, শিক্ষাকর্মী ৪ জন, একজন আইসিটি টিচার আছেন। ২ জন ভলান্টারি সার্ভিস দেন, তাঁদের একজন কম্পিউটার শিক্ষার জন্য অন্যজন গ্রুপ ডি স্টাফ। সব বিষয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকা আছেন, অনুমোদিত পদের মধ্যে একটি পদ খালি আছে শরীরশিক্ষার।

২০২৩ সাল থেকে পরিবেশ বিদ্যা বিষয়টি উচ্চমাধ্যমিক পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। স্কুলে সোলার পাওয়ার জেনারেশনের ব্যবস্থা আছে, ১০ কেভি-র গ্রিড যুক্ত। এই গ্রিডের ইনপুট, আউটপুট দু’টোই আছে।যাদবপুর হাইস্কুলের নিজস্ব খেলার মাঠ নেই। তবে যাদবপুর এস্টেট যখন স্কুল তৈরির জমি দেয়, তখন স্কুল সংলগ্ন একটি জমি ছিল, যেটি স্কুলের জমি নয়। তবে প্রথম দিন থেকে এখনও পর্যন্ত সেই জমিতেই স্কুলের ছাত্ররা খেলাধুলা করছে। সরস্বতী পুজোও এখানেই হয়। এই মাঠেই সম্প্রতি বৃক্ষরোপণ অনুষ্ঠান হয়েছে।

প্রধান শিক্ষিকা জানালেন, “মাধ্যমিকে স্কুলের ফল ভালো হয়। উচ্চমাধ্যমিকের ফল আরও ভালো হয়। চলতি বছরে করোনার ফলে মাধ্যমিকের ফল কিছুটা মন্দ হয়েছে। তবে এই বছর উচ্চমাধ্যমিকে ৬ জন ৯০ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়েছে। যাদবপুর এলাকায় যাদবপুর হাইস্কুল বয়েজে উচ্চমাধ্যমিকের বাণিজ্য বিভাগে ফল সবচেয়ে ভালো হয়। তাছাড়া স্কুলের পরীক্ষার ফলও ভালো হয়। আমাদের স্কুলে প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া যেমন আছে, তেমনই শিক্ষিত পরিবারের পড়ুয়াও আছে। ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পড়ুয়া নিম্নবিত্ত পরিবার থেকেই আসে। যেহেতু বিভিন্ন অবস্থা, বিভিন্ন পরিবেশ থেকে ছাত্ররা এই স্কুলে পড়তে আসে, সাধারণ মানের ছাত্রদের ভালো যায়গায় পৌঁছে দিতে আমরা নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তাই, স্কুলের নিজস্ব পরীক্ষার ফলও ভালো-মন্দ মিশিয়েই হয়। প্রতি বছর প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়ার সংখ্যা বাড়ছে। এটা আঞ্চলিক অবস্থার জন্য যেমন হতে পারে, তেমনই অভিভাবকদের মধ্যে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানোর প্রবণতা বাড়ছে, সেটাও একটা কারণ। উচ্চমাধ্যমিকে যারা ইংরেজি মাধ্যমে পড়তে ও পরীক্ষা দিতে চায়, তারা দিতে পারে। তবে সেই অর্থে আমাদের স্কুলে ইংরেজি মাধ্যম নেই। অভিভাবকদের মানসিকতা যদি ইংরেজি মাধ্যমের দিকেই ক্রমে যেতে থাকে, তাহলে পরবর্তী ক্ষেত্রে আমরা হয়তো স্কুলটাকে ইংরেজি মাধ্যম করার কথা ভাবব। আমাদের তেমন শিক্ষক-শিক্ষিকাও রয়েছেন।”

ছাত্রের হাতে শিক্ষাসামগ্রী তুলে দিচ্ছেন প্রধান শিক্ষিকা শুভ্রা পুরকাইত

স্কুলে সরস্বতী পুজো হয় স্কুলের পাশে একটি ভবনে। সেখানে স্কুলের একটি মাল্টি জিম রয়েছে। সরস্বতী পুজো উপলক্ষে প্রীতিভোজের ব্যবস্থা থাকে। ওইদিন স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র, শিক্ষকরা অনেকেই আসোন। শুভ্রা পুরকাইতের কথায়, একটা পুনর্মিলনের মতো পরিবেশ তৈরি হয়, এই দিনটার জন্য সবাই অপোক্ষায় থাকে এবং থাকেন।

ক্রিকেটার সম্বরণ ব্যানার্জি, দূরদর্শনের সাংবাদিক পংকজ সাহা, বামফ্রন্ট আমলের মন্ত্রী কান্তি গঙ্গেপাধ্যায় যাদবপুর হাইস্কুল, বয়েজের প্রাক্তনী। আগে খেলাধুলো বেশ ভালো ভাবেই হত। তবে এখন ততটা হয় না। এই মুহূর্তে স্কুলের ছাত্ররা এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিতে খুব একটা পুরস্কার আনতে পারছে না। তবে হাতের কাজ, নাটক, ক্যুইজ, নাটক, সমাজ সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান, বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য দিনে প্রভাতফেরী, বিজ্ঞান মঞ্চের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, এনসিসি, জয়হিন্দ বাহিনীর অন্তর্ভূক্তি, আবৃত্তি, বিজ্ঞানভিত্তিক মডেল তৈরি ইত্যাদিতে ছাত্ররা অংশগ্রহণ করে বলে জানালেন প্রধান শিক্ষিকা। অভিভাবকরা চান, তাঁদের সন্তানরা এনসিসি এবং জয়হিন্দ বাহিনীতে অংশগ্রহণ করুক। স্কুল চাইছে বিভিন্ন সেচ্ছাসেবী সংস্থার সাহায্যে শনিবার করে স্কুলের ছাত্রদের গান, তবলা, দাবা ইত্যাদির প্রশিক্ষণ দিতে।

স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অভিভাবকরা খুব ভরসা করেন। প্রধান শিক্ষিকা বলছিলেন, “অভিভাবকরা ভাবেন তাঁদের সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিতে পারলে তাঁরা নিশ্চিন্ত। তাই কারও শরীর সামান্য খারাপ হলেও অভিভাবকরা সন্তানকে স্কুলে দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকেন। পরম ভরসায় সন্তানদের আমাদের কাছে ছেড়ে যান। এই বিশ্বাসযোগ্যতা আমরা অর্জন করতে পেরেছি। আমরা অভিভাবকদের নিয়ে মাঝে মাঝে মিটিং করি। শুনতে চাই বাড়িতে ছাত্রটি কি করছে, কতটা পড়ালেখা করছে। পাশাপাশি অভিভাবকদের বলি, সন্তানকে তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে স্কুলের যেমন ভূমিকা আছে, তেমন অভিভাবকদের ভূমিকাটাও অনেক বেশি, সেটা তাঁদের পালন করা জরুরি।”শুভ্রা পুরকাইত গত দু’বছর সময় ধরে যাদবপুর হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব নিয়ে এসেছেন। তবে, এর মধ্যেই যেভাবে   তিনি স্কুলের ছাত্র ও শিক্ষকদের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন, সেটা তাঁর কথাতেই স্পষ্ট হল। তাঁর ইচ্ছে, স্কুলের জন্য অনেক কিছু করার, অনেক স্বপ্ন তিনি স্কুলকে নিয়ে দেখেন। এই স্বপ্নের ব্যাপ্তি অনেক দূর পর্যন্ত। তিনি চান সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে এবং বিশ্বাস করেন এই কাজে তিনি তাঁর স্কুলের সবার সহায়তা এখন যেমন পাচ্ছেন, আগামীতেও তেমন পাবেন। কেন না, বাংলা মাধ্যম হিসেবে এখনো এই স্কুলের চাহিদা আছে ভালো রকম।

তথ্য সূত্র : শুভ্রা পুরকাইত, প্রধান শিক্ষিকা, যাদবপুর হাইস্কুল, বয়েজ
ছবি : সংগৃহীত

*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।

Developed by DXDasia