‘রাজা’ রবীন্দ্রনাথের জীবনে পদ্মাপারের লালা পাগলা, ত্রিবেণী মাঝি, মৌলবী সাহেব

উচ্চবিত্ত পরিবার, অসাধারণ প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথের সহজতা হারিয়ে যায়নি

জোড়াসাঁকো, শিলাইদহ, শান্তিনিকেতন— রবীন্দ্রনাথের জীবনের মূল গল্পগুলো ছড়িয়ে রয়েছে এই তিনটি জায়গায়। কত মানুষের সঙ্গে সংযোগসূত্রে এক রবীন্দ্রনাথের আড়াল থেকে তাঁর জীবনের অনেক কথকতা আলোয় আসে। বর্ণময় চরিত্রের রবীন্দ্রনাথ আত্মপ্রকাশ করেন। উচ্চবিত্ত পরিবার, অনিন্দ্য রূপ, অসাধারণ প্রতিভা কোনোটাই তাঁর মনের সহজিয়া প্রকৃতিকে হারিয়ে যেতে দেয়নি। বরং তিনি অনায়াসে মিশে গিয়েছেন প্রকৃতি ও মানুষের সঙ্গে।

শিলাইদহের মানুষজন সকলেই লালা পাগলাকে চিনত। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপ করার তাঁর খুব ইচ্ছা। অথচ রবীন্দ্রনাথ তাঁকে গুরুত্ব না দেওয়ায় সে তীব্র প্রতিবাদী হল— ‘হুজুর, পাগল বলে আমার সেলামটা নিলেন না!’ সেই কথার সূত্রেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে লালা পাগলার আলাপ পরিচয়। আশ্চর্য সব ছড়া কেটে রবি ঠাকুরকে শোনাতো লালা পাগলা। আবদার একটাই, কেউ যেন ছড়া কাটতে নিষেধ না করে। আবদার মঞ্জুর হলেই দশ ঝুরি মাটি একাই কেটে রাস্তায় ফেলতে পারবে। কোনোদিন রবীন্দ্রনাথের জন্য মস্ত এক আখ নিয়ে হাজির লালা পাগলা। ভাবখানা এমন, রবীন্দ্রনাথ যেন তার পুরোনো বন্ধু। কখনও শীতের চাদর, কখনও একটু কুশল বিনিময় আবার কখনও শিলাইদহের বোটে নিয়মিত খাওয়ার ব্যবস্থা— রবীন্দ্রনাথ এইটুকু করতে পেরেছিলেন। লালা পাগলা তাতেই খুব খুশি। লোকজনকে বলত, সে নাকি রোজ রোজ রবীন্দ্রনাথের বাড়ি নিমন্ত্রণ খেতে যায়। দরাজ মনে রবীন্দ্রনাথকে সে ‘তুই’ সম্বোধন করতে শুরু করেছিল। শিলাইদহের প্রাচীন সময় এমন কত গল্প জড়িয়ে রেখেছে নিজের শিকড়ে। অতীতের রুদ্ধ ঘরে কান পাতলে শোনা যেতে পারে লালা পাগলার গান—

‘আমার দয়াল জমিদার
(হায়) তুলনা নাই তাঁর। 
তাঁর মুখখানি হয় চাঁদের নাগাল
হাতদুটি সোনার।’

নদী, নৌকা, শিলাইদহের প্রকৃতি— রবীন্দ্রনাথের যে স্মৃতি টুকরো ছড়িয়ে রয়েছে! উত্তাল পদ্মা নদীর বুকে বসত করা খুব সহজ নয়। রবীন্দ্রনাথের এই পদ্মাবাস পর্বে ত্রিবেণী মাঝি ছিল বিরাট ভরসার জায়গা। একবার পদ্মার ঝড় তুফানে খুব বিপদে পড়েছিলেন। সেবার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপ হয় ত্রিবেণী মাঝির। ত্রিবেণী প্রায় অর্ধমৃত অবস্থায় রবীন্দ্রনাথের বোটের কাছে পড়ে ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সেই অর্ধমৃত মানুষটিকে বজরায় তুলে এনে চিকিৎসা করেন। সেবা করে প্রাণ ফিরিয়ে আনলেন। লোকটি এক নৌকায় চাকরি করত। নৌকাডুবিতে অর্ধমৃত অবস্থায় তাকে ছেড়ে মনিবরা চলে যায়। ত্রিসংসারে তার কেউ নেই। এই হল রবীন্দ্রনাথ আর ত্রিবেণী মাঝির সম্পর্কের গোড়ার কথা। রবীন্দ্রনাথ হলেন ত্রিবেণী মাঝির বাবুমশায়। রবীন্দ্রনাথের নৌকাটি ছিল যেন  ত্রিবেণী মাঝির প্রাণ। পুরোনো মাঝি তপসী ত্রিবেণীকে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করল। ত্রিবেণী মাঝি বলত, ‘বাবুমশাই আমার জান— হামি তাঁর পায়েই মরব।’ সকলে জানত, রবি ঠাকুর আর ত্রিবেণী মাঝির মায়ায় ঘেরা সম্পর্ক। যখন যখন রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে আসার খবর আসত, ত্রিবেণী মাঝি হলুদ ছোপানো পাগড়ি, ফতুয়া, কাপড় পরে কাজকর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়ত। রবীন্দ্রনাথের পদ্মা, চিত্রা, দুর্গা, আত্রাই বোটগুলি আর ত্রিবেণী রবীন্দ্রনাথের পদ্মাচরের রোম্যান্টিক সত্তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এ যেন অন্য রবীন্দ্রনাথের কাহিনি। 

শিলাইদহের এক পাঞ্জাবি মুসলমান ছিলেন মৌলবী সাহেব। একটি চোখ অন্ধ, অসম্ভব বুদ্ধি। আরবি আর ফার্সি সাহিত্যে সুপণ্ডিত। বেশ বিলাসী। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দিব্যি পরিচয় ছিল তাঁর। শিলাইদহের হিতাকাঙ্ক্ষী হিসেবে মৌলবী সাহেব নিজেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভাবতেন। রবীন্দ্রনাথও তাঁর অনেক প্রস্তাব অনুমোদন করতেন। কিন্তু গল্প তৈরি হল তখন, যখন খোসাল কবিরাজ নামে এক বিচক্ষণ কবিরাজের সঙ্গে মৌলবী সাহেবের দ্বন্দ্ব তৈরি হল। মৌলবী রবীন্দ্রনাথের কাছে সুপারিশ করেছিলেন কবিরাজের কাজ বাড়িয়ে দেওয়ার। রবীন্দ্রনাথ মৌখিক বিনয় দেখালেও মৌলবীর এই অনধিকার চর্চা গুরুত্ব পেল না। তবু ততক্ষণে মৌলবী সারাগ্রামে রাষ্ট্র করে দিয়েছে, কবিরাজ ডাক্তারি ছাড়াও প্রতিদিন দু-ঘণ্টা করে মহাফেজখানায় কাজ করবে। এসব শুনে  রবীন্দ্রনাথ সংযমের সঙ্গেই উত্তর দিলেন, ‘মৌলবীর স্পর্ধার মাত্রাটা বেড়ে গেছে— আমি তার সঙ্গে একটু আলাপ করি বলে। সে আরো ভেবেছে যে আমি কাঁচা ছেলে,— কাব্য কবিতা ছাড়া আর কিছু বুঝি না।’ বুদ্ধিদীপ্ত জমিদার রবীন্দ্রনাথ একথাও বলে দিয়েছিলেন, মৌলবীকে আঘাত দেওয়ার মতো কোনো কাজ যেন করা না হয়। তবে জমিদারির কাজে যেন মৌলবী হস্তক্ষেপ না করে, সেদিকেও যেন নজর রাখা হয়। 

আরেকজনের গল্প বলে আজকের কথকতা শেষ করি। শিলাইদহের গয়লাপাড়ার কৈলাস ঘোষের বিধবা স্ত্রী পলানের মা। তাঁর কলহপ্রিয় স্বভাবের কথা প্রজারা রবীন্দ্রনাথের কাছে গল্প করে বলেছিলেন। পলানের মায়ের বাকি খাজনা মাপ হয়নি। এই নিয়ে তার রাগ। সোজা সে গেল রবীন্দ্রনাথের কাছে। দরখাস্ত লিখেছে নিজের মতো করে— ‘আজ্ঞাধীনা—পলায়নের মাতা—সাং কশবা।’ ‘পলায়নের মাতা’ ঘোষণা করল, তার ছেলে অনাথ অবোধ বালক। তার কেউ নেই সংসারে। সে এত টাকা কোথা থেকে পাবে? রবীন্দ্রনাথ মজা করে বললেন, সে না পারুক, তার মা তো পারবে। পলানের মা কঠিনে কোমলে মিশিয়ে এক লম্বা বক্তৃতা দিল। তারপরেও যখন খাজনা মাপ হল না, সে রবীন্দ্রনাথের সামনেই রণরঙ্গিণী মূর্তিতে বলে উঠল, ‘বাবু, মাপ দিলি না,— এই আমি ডুবে মরলাম।’ বলেই শীর্ণ পদ্মায় ঝাঁপ দিয়ে অল্প অল্প সাঁতার কাটে আর বলে, ‘এই আমি ডুবে মরলাম’। রবীন্দ্রনাথ এই দৃশ্য দেখে খাজনা মকুব করেছিলেন। নাহলে পলানের মায়ের সাঁতার আর বন্ধ হত না। এরপর থেকে পলানের মা রবি ঠাকুরকে দেখলে গলায় আঁচল দিয়ে প্রণাম করত। 

এমন কত মানুষ, তাদের আবেগ ছুঁয়ে জমিদার রবীন্দ্রনাথকে সত্যি তাদের জীবনে দেবতার আসন দিয়েছিলেন। পদ্মানদীর স্রোত হয়তো মনে রেখেছে এই অন্য ঠাকুরের গল্প।

সহায়ক গ্রন্থঃ
সহজ মানুষ রবীন্দ্রনাথ, শ্রীশচীন্দ্রনাথ অধিকারী

Developed by DXDasia