কাণ্ডই আসল।… তা-ই সজীব।… পাতা তো আসবেই।… ফুল আসবেই।… আসল হল শিকড়, আসল হল কাণ্ড।
আপনাদের সময়ে শিল্পীদের মূল সমস্যা কী ছিল?
কিছু না… কোনও সমস্যাই ছিল না। আমি যদি ছবি আঁকতে পারি… তাহলে কোনও সমস্যাই নেই। একটা সমস্যা ছিল যে ছবি কীভাবে আঁকব? হ্যাঁ, আর-এক সমস্যা… নারী। তবে সে কথা বাদ দাও (অট্টহাসি)। সমস্যা মিটে গেল। সমস্যা হল উৎপাদন কর, জোগাড় কর।… সে-সব বাদ দিলে সমস্যা মিটে গেল।
আজকের সময়ে শিল্পীদের মূল সমস্যা কী?
ফ্রিডম… ফ্রিডম টু ওয়ার্ক। ফ্রিডম।… কাজ করার ইচ্ছা। (থেমে একটু ভাবেন)… চলে আসবে… চলে আসে।… আর জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক… আমি মানুষ দেখেছি… বামন নিয়ে কী হবে?
আপনি বিবাহ করেননি। এ নিয়ে কিছু বলতে চান?
বিয়ে করব? ঘর-সংসার করব, আমার এ ইচ্ছে কোনও দিনই ছিল না।… খালি কাজ করব, এই-ই লক্ষ্য ছিল।… বিয়ে করলে তা সম্ভব হত না।… ঘর বাঁধার সুখ আমার শিল্পের কাছেই মিটে যায়।… নারী।… নারীর প্রয়োজন আছে। …পুরুষ তো প্রকৃতিরই সৃষ্টি।
আপনার ছবি ও মূর্তি, দুই-ই অদ্ভুতভাবে প্রকৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
মানুষ তো প্রকৃতির মধ্যেই আছে।
প্রকৃতির মধ্যে আবার গাছকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
সজীব।… গাছ।… গাছ হল সজীব।
গাছেরও আবার সব অংশ নয়, রূপের স্তরে কাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্ক বেশি।
কাণ্ডই আসল।… তা-ই সজীব।… পাতা তো আসবেই।… ফুল আসবেই।… আসল হল শিকড়, আসল হল কাণ্ড।
একবার পিকাসো নিজের প্রদর্শনী চলাকালীন দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন প্রকৃতি না-থাকলে শিল্পীও থাকে না। প্রকৃতিকে পুনর্নির্মাণ করতে গিয়ে শিল্পী তাকে অপমানই করে।
অপমান করতে পারবে না।… অপমান নয়।… অপমান করতে পারবে না। সে অনুসরণ করে না।… প্রকৃতি।… প্রকৃতি… লীলা। প্রকৃতি… মায়া।…। খেলা। ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন।… এইভাবে খেলেছেন।… আমাদের খেলতে দেবেন না কেন? আমরাও খেলব। তাঁর খেলায় একটা অনুশাসন আছে… মুক্ত অনুশাসন। খেলা… তুমিও খেলতে পারো। এই সৃষ্টিও খেলা। আমি খেলা করি… নিশ্চিন্ত হয়ে। রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা আছে, ‘তোমারই নাম বলব, বলব নানান ছলে’… (গুনগুনিয়ে শুরু করে ক্রমে দরাজ গলায় গাইতে শুরু করলেন)… ‘বলব মুখের হাসি দিয়ে, বলব চোখের জলে’… আমার হাসিও তাঁর… আমার ভাবও তাঁর।… প্রকৃতি… প্রকৃতি। পিকাসোর সংকোচ আছে তাই এমন বলেছে।… ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন… অকারণে।… শিশু জন্ম দেওয়ারও কারণ আছে।… ঈশ্বর যা সৃষ্টি করেছেন, তার থেকে আনন্দ নাও।… সংঘাত নয়… লড়াই নয়… লীলা।
কীভাবে
কীভাবে?… তুমি নিজে-নিজেই তার উত্তর পেয়ে যাবে। যদি আমি আনন্দ না-পেতাম, তবে কাজ করতাম না… প্রশ্ন নয়… সব ভুলে যেতে হবে।… খেলা করতে হবে। মনে কোনও অসন্তোষ থাকলে বুঝবে যে তুমি এখনও ভোলোনি।… জন্ম হয় ভবিষ্যতের জন্য।… এই-ই চলবে। দেখি… চিনি… তখন বোধের জন্ম হয়… আনন্দ হয়, সৃষ্টি করি… আনন্দ হয়(খানিকক্ষণ ভাবতে-ভাবতে হারিয়ে যান)… বুদ্ধ। …বুদ্ধ। …বর্তমান… শিশুর জন্ম দেওয়া এক অর্থে পুনর্জন্ম… আমাকে ছাড়া নয়, বরং আমার মধ্য দিয়ে। মায়া… মায়া।
আপনার অধিকাংশ কাজ বীরভূমের সাঁওতাল আদিবাসীদের সঙ্গে সম্পর্কিত।
না… তা নয়। অনেকরকমই তো আছে। (থেমে ভাবলেন) হ্যাঁ, হতে পারে। ওরা শ্রমিকের দল… ওরা কাজ করে… ওদের হাত আছে… সূর্য… রৌদ্রে… খোলা চুল… ঘাম।… ওদের খিদে পায়।… কষ্ট হয়… দুঃখ… দরিদ্র ওরা। (খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে) ওরা অনেক সক্রিয়। কর্মসক্রিয়তা ভালো লাগে আমার।… ললিত… সক্রিয়… জীবন (হাত উঠিয়ে দূরের বসতবাড়ি, অফিসবাড়ির দিকে ইঙ্গিত করে) ডাল লাইফ… ওরা যারা বসে থাকে… কী সব লেখে… কী আছে ওদের?… থাকুক বসে।… ওই যারা ব্যাবসা করে (দূরে বাজারের দিকে ইঙ্গিত করে) ওদের সক্রিয়তা কীসের?… যেখানেই গেছি… যাদের প্রকৃত সক্রিয়তা দেখেছি… তাদের এঁকেছি। তাদের মধ্যে রূপের প্রাচুর্য আছে।
আপনি কখনও নিজের ছবি আঁকেননি?
এঁকেছি… গাঁয়ে এঁকেছি। এখানে আসার আগে… ছোটোবেলায়। কখনও আঁকব হয়তো।… খেয়ালের ব্যাপার।… অন্যেরা করেছে… ভালো-ভালো।
তো আপনি সেলফ্ পোট্রেট করবেন?
শিল্পী যা করে, সবই তাঁর সেলফ্ পোট্রেট।
সৃষ্টি করার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কী?
উন্মুক্ত মন।… মনের উন্মুক্ততা অবশ্য প্রয়োজন।… ফিলিং… ফিলিং…
অনুভূতি, না অভিব্যক্তির জন্য?
অভিব্যক্তি।… অভিব্যক্তির জন্যই বেশি দরকার।
অভিব্যক্তি কীসের জন্য?
নিজের জন্য, তারপর অন্যের জন্য।… রবীন্দ্রনাথ কার জন্য করেছিলেন?… সৃষ্টির জন্য।… পাগলামি থাকে… নেশা থাকে, সে-ই সৃষ্টি করে। (খানিক থেমে) না, বলতে পারি না।… রবীন্দ্রনাথ নিজের সম্পর্কে বলতেন, ‘বাতিকগ্রস্ত, মাথা-খারাপ’।… আনন্দই প্রথম।
ভেবে-বুঝে?
না-ভেবে। যদি জানতে চাও, কেউ কি বুঝবে।… ছবি মানে শুধু ছবি।… রবীন্দ্রনাথ বলতেন, পরোয়া করি না। আমি পরোয়া করি না। আমার যেমন মনে হয়েছে, আমি তেমনই এঁকেছি। আমি আমি চাই না যে আপনি তা বুঝুন। আপনার যা মনে হয় তা-ই ভাবুন।
কাজ করার সময় সবচেয়ে বেশি আনন্দ কবে পেয়েছেন?
সব সময়। সব… সব সময়। (মুখে হালকা হাসি ফুটে ওঠে) ছোটবেলা থেকে সব সময়।
আপনি সব মাধ্যমেই কাজ করেছেন?
খেয়াল।… যখন যা হাতের কাছে মেলে।
কাজের বিষয় কি আগেই ঠিক করে নেন? কীভাবে এগোন?
কখনও ঠিক থাকে, কখনও থাকে না।… না-ভেবে… শুধু অনুভব করি আর কাজ করে যাই। আপনা-আপনিই চলে আসে… নিজের থেকে।
কোনও কাজ কি কখনও এতটাই সম্পূর্ণ হয় যে পরে তাতে আর নতুন কিছু জোড়া, বাদ দেওয়ার দরকার পড়ে না?
না। একেবারে শেষ কখনওই হয় না। ওতে আবার কাজ করি… করতেই পারি। ক্লান্ত হয়ে পড়লে হয়তো ছেড়ে দিই।… নতুন ভাবনা এলে… ছেড়ে দিই।… অসন্তুষ্টি থেকেই যায়। যতক্ষণ আকাশ শূন্য… ততক্ষণই সন্তুষ্টি। …নয়তো বদলাতেই থাকে। আবার কর… শেষ করে যাও।… তারপর আবার কর, করতেই থাকো, তো সম্পূর্ণ বদলে যাবে। আবার কর… আর-একটা কর।
রবীন্দ্রনাথ পাঁচ হাজার কবিতা লিখেছিলেন, পরে আবার ছবি আঁকতে শুরু করলেন। কেন, কেন করলেন?… আবার করলেন। ইচ্ছেটা থাকেই। এই সবই শিক্ষা দিয়ে গেছেন… তাই শিখতে পেরেছি।… আবার একটা করেছি… আগেরটা ছেড়ে দিয়েছি… দ্বিতীয়টা শুরু করেছি।
কাজ করবার জন্য সবচেয়ে জরুরি কী মনে হয়?
ফিলিং ফর এভরিথিং।… ফিলিং। যদি ফিলিং দুর্বল হয়, তবে শুধুই নিরাশা। …ফিল।… ধ্যান ঠিক হলে ফিলিং হবে।
আজকাল আপনি প্রায়ই অসুস্থ থাকেন, তা-ই ছবি এঁকে চলেছেন, বিশ্রাম করতে ইচ্ছে হয় না?
(ব্যঙ্গ করে) কী করলে বিশ্রাম পাব? (হাসতে-হাসতে) কিছু-না-কিছু তো করতেই হবে… কী করব? গান করব?… গপ্পো করব?… সময় খুব কম। সময় কোথায়?… সত্তর বছর পেরিয়ে এসেছি… কোথায় কে জানে সময় চলে গেছে।… না?
কাজ। নতুন কাজ। নতুন কথা।
সবসময় নতুন করে দেখা… যদি চোখ খোলা থাকে তো কত জিনিস সব একসঙ্গে দেখা যায়।
কখনও কি এমন মনে হয়নি এই শিল্পকাজের বিনিময়ে দেশ তথা সমাজ আপনাকে কী দিল?
(রুক্ষ গলায়) আমি সেরকম ভিখারি নই।… কিছু চাই না…। আমি সব কিছুই আমার কাজ থেকে পাই।
শেষ প্রশ্ন, এরকম আর কতদিন কাজ করে যেতে চান?
যতদিন পারি।… শেষ পর্যন্ত।… যখন কাজ হয়ে যাবে… তখন ধ্যানও শেষ হয়ে যাবে।… তখন… শূন্য… আকাশের সমান।… আকাশ।… আকাশ।
(এই সাক্ষাতকারটি নিয়েছিলেন জওহর গোয়েল )