রবীন্দ্রনাথের ওপর হাইনে-র প্রভাব

হাইনের হৃদয়ের মর্মান্তিক কষ্টই স্পর্শ করেছিল তরুণ রবীন্দ্রনাথ-কে

প্রকৃতি চক্রবর্তী

প্রথম প্রকাশের পরে পাঠকপ্রিয়তার কারণে বাউরিংয়ের করা হেইনরিখ হাইনের কবিতার অনুবাদের বেশ কয়েকটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। আর সে-বইটি তখন বাংলার কবি ও কবিতা প্রেমিক তরুণদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তাঁরা হাইনের কবিতার ভক্ত হয়ে ওঠেন। সেরকম একটি বই হাতে এসেছিল তখনকার তরুণ কবি রবীন্দ্রনাথের। সে-বইটি থেকে তিনি প্রথম বাংলায় হাইনের কবিতা অনুবাদ করেন। ইংরেজি অনুবাদের আঠারো-উনিশ বছরের মধ্যে বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়। অল্প কয়েক বছরের মধ্যে জার্মান ভাষা থেকে ইংরেজি, ইংরেজি থেকে বাংলায় হাইনের কবিতার আবেদন পৌঁছে যাওয়া সত্যিই চমকপ্রদ। অনেক পরে ১৯২৪-এ চীন ভ্রমণের সময় এক নৈশভোজের বক্তৃতায় এ-বিষয়ের উল্লেখ করে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন – I also wanted to know German Literature and by reading Heine in translation, ‘I thought I had caught a glimpse of the beauty there.’ তিনি উল্লেখ না করলেও ধরা যায় সে-বইটি ছিল বাউরিংকৃত হাইনের কবিতার অনুবাদ। রবীন্দ্রনাথ যতই বলুন তিনি হাইনের কবিতার সৌন্দর্য সামান্যই ধরতে পেরেছিলেন, তা হয়তো নয়। 

অনুবাদগুলি পড়লে তাঁর অন্তরে যে হাইনের ডাক পৌঁছেছিল তা বেশ বোঝা যায়।

তিনি হাইনের Book of Songs ও Pictures of Travel কাব্য থেকে মোট নয়টি কবিতার অনুবাদ করেন। Book of Songs থেকে পাঁচটি, Pictures of Travel থেকে চারটি কবিতার বাংলা অনুবাদ ১৮৮৫ সালের এপ্রিল সংখ্যা সাধনা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, হাইনে তাঁর Youthful Sorrows-এর কবিতাগুলি Book of Songs-এ অন্তর্ভুক্ত করেন। ১৮১৭ থেকে ১৮২১-এ লেখা বেশিরভাগ কবিতার কোনো শিরোনাম ছিল না। সংখ্যা ছিল এগুলির পরিচয়ের সূচক। অনেকগুলি ছিল মাত্র চার লাইনে লেখা। ওইরকম একটি কবিতা Book of Songs-এর Youthful Sorrows অংশ থেকে রবীন্দ্রনাথ অনুবাদ করেন। হাইনের কবিতা –

First methought in my affliction,
I can never stand the blow –
Yet I did – strange contradiction!
How I did, ne’er seek to know.
রবীন্দ্রনাথ কবিতার প্রথম লাইনটি শিরোনাম হিসেবে ব্যবহার করেন। ‘প্রথমে আশাহত হয়েছিনু’ – এ-নামে তাঁর অনুবাদ –
প্রথমে আশাহত হয়েছিনু
ভেবেছিনু সবে না এ বেদনা
তবু তো কোনোমতে সয়েছিনু
কী করে যে সে কথা শুধায়ো না।

এছাড়া Book of Songs-এর চারসংখ্যক কবিতা ‘আঁখিপানে সবে আঁখি তুলি’, চবিবশসংখ্যক কবিতা ‘স্বপ্ন দেখেছিনু প্রেমাগ্নি জ্বালায়’, বত্রিশসংখ্যক কবিতা ‘নীল বায়লেট নয়ন। দু’টি করিতেছে ঢল ঢল’ নামে কবি অনুবাদ করেন। হাইনের হৃদয়ের অমরত্মহীন দুঃখের কঠিন দহনই এ-কবিতাগুলির যেমন, তেমনি কাব্যটিরও মূলভাব। রবীন্দ্রনাথ হাইনের শিরোনামসহ কোনো কবিতা অনুবাদ করেননি। আবার দীর্ঘ কবিতাও বাদ দিয়েছেন। কিন্তু হাইনের কবিপ্রতিভার পরিচয় রবীন্দ্রনাথের কাছে এমনভাবে ধরা পড়েছিল যে, মাত্র কয়েক লাইনের কবিতায় তিনি কবির বেদনাবিধুর হৃদয়টি সকলের কাছে সহজে তুলে ধরতে পেরেছেন। তিনি বোঝাতে পেরেছেন, Book of Songs-এর ‘গভীর রাগিণী’ উঠে বাজি বেদনাতে’।

Pictures of Travel কাব্য থেকে রবীন্দ্রনাথ সাতচল্লিশ সংখ্যক কবিতা ‘বিশ্বামিত্র, বিচিত্র এ লীলা!’, ঊনপঞ্চাশসংখ্যক কবিতা ‘তুমি একটি ফুলের মতো মণি’, পঞ্চাশসংখ্যক কবিতা ‘রাণী, তোর ঠোঁট দুটি মিঠি’, দুশো উনিশসংখ্যক কবিতা ‘বারেক ভালোবেসে যে জন মজে’ – মোট চারটি কবিতা অনুবাদ করেন। এ কবিতাগুলিও সংখ্যা চিহ্নিত ছিল।  
হাইনের জীবনে এত দুঃখ, এত বিষাদ নেমে এসেছিল কেন? তিনি নিজের জীবনের ওপর এক রকম বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন কেন, সে-কথা বলতে গিয়ে সবাই দু-দুটো ব্যর্থ প্রেমের কাহিনির উল্লেখ করেছেন। তিনি প্রথম ভালোবেসেছিলেন অমালিকে। ১৮১৭-তে একেবারে তরুণ বয়সে। সে-ভালোবাসা স্থায়ী হয়নি। তিনি গভীর আঘাত পেয়েছিলেন। তাঁর কাছে তখন জীবন একেবারে অকিঞ্চিৎকর হয়ে উঠেছিল। কিন্তু অসাধারণ সব কবিতা রচিত হলো সে করুণ কান্নার উৎস থেকে। তরুণ রবীন্দ্রনাথ Book of Songs এবং Pictures of Travel থেকে এরকম কবিতার অনুবাদ করে হাইনের কবিমানসের স্বরূপ উন্মোচনের চেষ্টা করেছেন। এখানে Book of Songs থেকে একটি উদাহরণ দেওয়া হল।

হাইনের কবিতা –

My songs with poison and fainted
But how could it otherwise be?
My blossoming life thou hast poison’d
And made it hateful to me.

My songs with poison and fainted
But how could it otherwise be?
In my heart many serpents I carry
And thee, too, my dearest love thee.

আট লাইনের এ-কবিতাটির অনুবাদ করেন রবীন্দ্রনাথ, ‘গানগুলি মোর বিষে ঢালা’ নামে –

গানগুলি মোর বিষে ঢালা
কী হবে আর তাহা বই?
ফুটমত্ম এ প্রাণের মাঝে
বিষ ঢেলেছে বিষময়ী।
গানগুলি মোর বিষে ঢালা
কী হবে আর তাহা বই?
বুকের মধ্যে সর্প আছে
তুমিও সেথা আছ অয়ি।

And thee, too, my dearest love thee – হাইনের এ-হাহাকারের মধ্যে তাঁর সমসত্ম বেদনা ও পরাজয়ের দুঃখ ফুটে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ অনুবাদে সে-হতাশহৃদয়ের চিত্রটিই ফুটিয়ে তুলেছেন।

বছর কয়েকের ব্যবধানে হাইনে আবার ভালোবাসেন থেরেসাকে। অমালির ছোট বোন। দেখতে একেবারে অমালির মতো। হাইনের কথা সুধীন্দ্রনাথের ভাষায় বললে দাঁড়ায় –

ভালো লেগেছিল ১৮১৭-তে
যে কিশোরীকে, সে হুবহু তোমার জোড়া,
আকারে প্রকারে এলানো খোঁপার স্রোতে,
তোমার মতোই অপরূপ আগাগোড়া
কবির ভালোবাসা আবার আবর্তিত হলো থেরেসাকে ঘিরে। কিন্তু এবারও তাঁদের সম্পর্ক অচিরে ভেঙে যায়। তার প্রথম কারণ হলো, হাইনের সঙ্গে থেরেসার বয়সের বিস্তর ব্যবধান। দ্বিতীয়টি অমালির সঙ্গে থেরেসার চেহারার এত মিল যে তার মুখের দিকে তাকালে হাইনের মনে পড়ত প্রত্যাখ্যাত হওয়ার বেদনা। ফলে থেরেসার সঙ্গে তাঁর ব্যবহার কখনো সহজ এবং সহৃদয় হয়ে উঠতে পারেনি। হাইনের কথা সুধীন্দ্রনাথের অনুবাদে –

তবু গূঢ় ক্ষেতে চোয়ায় স্মৃতির বিষ
তাকালে তোমার তরুণ মুখাবয়বে।

আর তৃতীয় যে-কারণটি ছিল ঘটনার নেপথ্যে তা হল, হাইনের বোহেমীয় জীবনাচরণ। প্রথম প্রেমের ব্যর্থতায় হাইনের জীবনে যে বিষণ্ণ ঝড় বয়ে গিয়েছিল তার থেকে তিনি কোনোদিন মুক্তি পাননি। তার মধ্যে দ্বিতীয়বারও প্রেমের সার্থকতা আসেনি। এবার ক্ষোভের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে উঠল পরিহাসপ্রিয়তা। নিজের ওপর এ-নিষ্ঠুরতায় অবাক হল সবাই। রবীন্দ্রনাথ এরকম একটি কবিতা অনুবাদ করেছেন। হাইনের কবিতা

He who for the first time loveth
Though his hopeless is a God!
But the man who hopeless loveth,
For the second time’s a fool,
I, a fool like this, and loving
Once more, with no love responsive;
Sun and moon, and stars are laughing
I, too, join the laugh and die.

রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ –

বারেক ভালোবেসে যে জন মজে
দেবতাসম সেই ধন্য,
দ্বিতীয়বার পুনঃপ্রেমে যে পড়ে
মূর্খের অগ্রগণ্য।
 
আমিও সে দলের মূর্খরাজ
দু’বার প্রেমপাশে পড়ি;
তপন শশী তারা হাসিয়া মরে
আমিও হাসি – আর মরি।

আপাত লঘু হাস্যরসের মর্মে দু-দুবার প্রেমের ব্যর্থতার একটি ক্ষত লুকিয়ে আছে। সেখানে বাইরের হাসির মধ্যে ভেতরে চোখের জল বাধাহীন হয়ে উঠেছে। বাধা মানেনি কবির আত্মধিক্কারও। হাইনের হৃদয়ের এই মর্মান্তিক কষ্টই রবীন্দ্রনাথের তরুণ হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।
 
চবিবশ বছর বয়সে হাইনের কবিতা পড়ে রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধ হয়েছেন। তাঁর কবিতার আঙ্গিক বা গঠনশৈলীতে রবীন্দ্রনাথ বেশ প্রভাবিতও হয়েছেন। অনেক পরে তিনি যখন লেখন কিংবা স্ফুলিঙ্গ কাব্যের ছোট-ছোট কবিতা লেখেন তখন স্বভাবতই হাইনের এ-ধরনের কবিতার কথা মনে আসে। রবীন্দ্রনাথ ক্ষণিকা কিংবা  শেষের কবিতায়ই নিজেকে নিয়ে যে-রকম ঠাট্টা করেছেন, মূল কারণ এক না হলেও তা হয়তো প্রথম বয়সে তিনি হাইনের মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন। তখন হাইনের কবিতা তাঁর এত ভালো লেগেছিল যে, বাউরিংয়ের অনুবাদে মন ভরেনি। তিনি মূল কবিতাগুলি পড়ার জন্য জার্মান সংস্করণটি জোগাড় করেছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে তিনি একজন জার্মান মিশনারি মহিলা পেয়েছিলেন, যাঁর কাছে চেষ্টা করে ভাষাটি শিখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনের অধ্যবসায়ের ফলটি মনে হয় সারাজীবনের সঙ্গী হয়েছিল। এই দুই কবির মধ্যে মিলও ছিল। দুজনেই মৃত্যুর কয়েকদিন আগে পর্যন্ত কবিতা লিখেছেন। মৃত্যুর পরে দুজনেরই কবিতার বই বের হয়েছে। হাইনের Posthumous Poems এবং রবীন্দ্রনাথের শেষ লেখা।

(ঋণ – আজকেরবাংলা.কম)

Developed by DXDasia