২১২০ সাল – লকডাউনের একশো বছর

ভয়াবহ লকডাউনের একবছর পর আমরা কী কী শিখলাম আর কী কী হারালাম

বিশ্বজুড়ে লকডাউনের এক বছর, দু’বছর, তিন বছর পূর্তি করতে করতে একশো বছরের দোড়গোড়ায়। ২১২০ সাল। শালগাছের টঙে পাখিদের কো-এড স্কুলে চলছে মাধ্যমিক পরীক্ষা। একটা ডাল ছেড়ে ছেড়ে সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট। খুব কড়াকড়ি। সঙ্গে প্রখর সার্ভেইল্যান্স, ঈগল ম্যাম আকাশে চরকি দিতে দিতে গার্ড দিচ্ছেন। পাতায় পাতায় রোল নম্বর সাঁটানো। কারচুপির কোনও চান্স নেই। বাংলা পরীক্ষা আজ। আর, পরীক্ষায় এসেছে একদম আউট অফ সিলেবাস, আনকমন রচনাঃ ‘লকডাউনের ১০০ বছর’। বেচারা রাত জেগে জেগে কত রচনাই না মুখস্থ করেছিল প্যাঁচা। এ বছর ‘লুপ্তপ্রায় প্রাণী’ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে মানুষ। তাই ‘একটি মানুষের আত্মকথা’, ‘মানবসভ্যতাঃ আশীর্বাদ না অভিশাপ’, ‘দৈনন্দিন জীবনে মানুষের প্রয়োজনীয়তা’, ‘চাষ করান মানুষ বাঁচান’– এই ক’টা ছিল হংসদার লাস্ট সাজেশনে সম্ভাব্যতম রচনা সমূহ। কিন্তু, সমস্তকে তুড়ি মেরে এভাবে ইতিহাস মার্কা রচনা পড়ে যাবে কে জানত! ফলে, অসহায় ক্লান্ত প্যাঁচা ঢুলছে। ওদিকে, পাক্কা ২০ নম্বর ডানাছাড়া হয়ে যাওয়ার হতাশায় প্রশ্নপত্রে চঞ্চু ঠুকে চলেছে কাঠঠোকরা। শালিখের দল ইতিমধ্যে আলটপকা প্রশ্নের জন্য চেঁচামেচি জুড়ে দিয়েছে। বারবার বাথরুমের জন্য আবেদন করছে তারা। ব্যতিক্রম কেবল টিয়া, চন্দনা, কাকাতুয়া। বাপ-মায়ের ঠাকুরদা-ঠাকুরমা ভায়া তারা অনেকবার গল্পে শুনেছে তাঁদের খাঁচাজীবনের কথা, মানুষকে তাঁরা কত কাছ থেকে দেখেছেন– সেসব। এছাড়াও একদমই আনকমন রচনা হিসেবে পড়ে রেখেছিল ‘বিশ্বের উন্নয়নে করোনার ভূমিকা’। কাকাতুয়া একটু ভেবেটেবে গুছিয়ে নিয়ে লিখতে শুরু করল– 

“কবিঘুঘু তাঁর ‘প্রশ্ন’ কবিতায় লিখেছিলেন ‘ভগবান তুমি যুগে যুগে বাদুড় পাঠায়েছ বারেবারে’। এই বাদুড় হল দূত। যবে থেকে মানুষরা বাকি প্রাণীকুলের জীবন অতিষ্ঠ করে, নিজেদের আখের গোছাতে শুরু করেছে, তবে থেকে শুরু হয়েছে বিপ্রতীপে প্রাণীকুলের অস্তিত্বের সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের অন্যতম যোদ্ধা ‘রাস’। তারা ছড়িয়েছে বিভিন্ন সময়ে এবং মানবসংখ্যা হ্রাস ঘটাতে বিপুল সাহায্য করেছে সংক্রমণের মধ্য দিয়ে। মনুষ্যকুল রাসদের বাগে আনার বিভিন্ন চেষ্টা করেছে, এমনকি ‘ভাই’ সম্বোধন করে ‘ভাইরাস’ উপাধি অবধি দিয়েছে, কিন্তু হস্তগত করতে পারেনি! সেই রাস-দের অন্যতম বাহক হয়ে ঠিক ১০০ বছর আগে আবির্ভাব ঘটে বাদুড় অবতারের। তাকে কেউ নাম দেয় ‘ইউহানিকর’, কেউ ‘করোনা’, কেউ বা ‘কোভিড’। এবং সেই উন্নততম, বৃদ্ধির শিখরে পৌঁছে যাওয়া মানবসভ্যতায় পতনের বাণী এঁকে দেয় আমাদের বীরযোদ্ধা রাসভাইরা। তাদের আটকাতে বিশ্বজুড়ে মানুষকে বাইরে বেরোতে নিষেধ করে দেওয়া হয়। ফলে, নিজেই নিজের বাসায় বন্দি হয়ে যায় মানুষ, তাদের নিজেদেরই বাসা হয়ে যায় তাদের খাঁচা। যার পোশাকি নাম ‘লকডাউন’। এই প্রথম তারা তাদের বানানো স্বর্গে সামগ্রিকভাবে নারকীয়তা টের পায়। 

এই নারকীয় জীবন মেনে নিতে না পেরে, প্রথমে তারা বিদ্রোহী হয়ে পড়ে। থালা-বাটি বাজিয়ে করোনাদের পথভ্রান্ত করার চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। চেষ্টা করে প্রদীপ জ্বালিয়ে, বোমা ফাটিয়ে একইসঙ্গে অন্ধ ও কালা করে দিতে, সেখানেও তারা ব্যর্থ হয়। এরপর ক্লান্ত হয়ে তারা মেরি বিস্কুটে ক’টা ফুটো আছে, চাঁদের কতগুলো কলঙ্ক আছে, ঘরে ক’টা মশা আছে, আকাশের সাইজ কত স্কোয়্যারফিট– গুনতে শুরু করে। লকডাউনের ২১ দিন অতিবাহিত হলে মানুষ ভাবে, পুরোনো দিন ফিরে এল। ফলে, সাতসকালে তারা চা খেতে বেরিয়ে পড়ে, বাজারে হুমড়ি খায়। এরপর পুলিশের বাড়ি খেয়ে তারা আবার খাঁচায় ঢুকে পড়ে। রাস্তায় চা খেতে না পেরে, তাদের মধ্যে প্রতিবাদী সত্তা পাচকের রূপ ধারণ করে। এবং তারা ডালগোনা কফি বানিয়ে নরকের মধ্যে প্রথম স্বর্গসুখ পাওয়ার চেষ্টা করে। কারও মধ্যে সংক্রমণ ঘটলে, তাদের ব্যঙ্গ করে গেয়ে ওঠে ‘ফুডে গন্ধ নেই, এ তো ভাবতেও পারি না’। সভ্যতার প্রতিভূ এই মানবজাতির স্খলন, ফাটল হুড়মুড়িয়ে খোলসা হয়ে যেতে শুরু করে নিতান্ত হেঁয়ালি থেকে। একদল মানুষ নিজেরই সভ্যতার খাঁচায় ভুখা থাকতে থাকতে, আর সহ্য করতে না পেরে বেরিয়ে পড়ে বাইরে। বাসার সন্ধানে তারা রাস্তায় নামে। আমাদের কিছু পূর্বপ্রজন্মের পাখিদের উপাধি এদের গায়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়। ‘পরিযায়ী’ হয়ে যায় তারা…”

তরতরিয়ে লিখে চলেছে কাকাতুয়া। পাতার পর পাতা নিয়ে চলেছে। একইভাবে চন্দনা, টিয়া, ময়না, বদ্রী– সকলেই। পূর্বতর বন্যপাখিরা লিখছেঃ সেই প্রথম শহর দেখতে গিয়েছিল আমাদের দাদু-ঠাকুমা। ‘চিড়িয়াখানা’ নামের কারাগারে আমার মামা, কাকা, মাসির সঙ্গে বহু বছর পর দেখা হয়েছিল তাদের। কান্নায় ভেঙে পড়েছিল তারা। আনন্দে কাঁপছিল তারা থরথর করে। এবং বনে ফিরে যাওয়ার আগে শুনশান রাস্তায় মোড়ের মাথায় একটা স্ট্যাচুর গায়ে সুলভ করেছিল।

এখন এই পরীক্ষায় ছিল কিছু বানরও। পরবর্তী বিবর্তনে যাতে মনুষ্য ভিন্ন কিংবা উন্নততর কোনও প্রজাতির উদ্ভব হয়, তার জন্য পাখিদের স্কুলে তাদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বড়োই ফাঁকিবাজ তারা। মাথা চুলকোচ্ছে, উকুন বাছছে এবং উঁকি মেরে মেরে টুকলি করছে পাখিদের থেকে। 

কাকাতুয়া লিখছিলঃ এই সময়েই প্রবল ভেদাভেদ তৈরি হয় মানুষের মধ্যে। দূরত্ববিধির খাঁড়া নেমে আসে। কিছু মানুষ এর সুযোগ নিয়ে অন্য অনেক মানুষকে পাঁকে ফেলে, নিজেদের আখের গোছাতে, ভেদাভেদ ঘটাতে শুরু করে। টুকলি করতে করতে গুলিয়ে ফেলা ফাঁকিবাজ বানরা লেখেঃ এই সময়েই প্রবল ভেদাভেদ তৈরি হয় মানুষের মধ্যে। কিছু বানর এর সুযোগ নিয়ে ভেদাভেদ ঘটাতে শুরু করে।

শেষমেশ কাকাতুয়া উপসংহার পয়েন্ট দিয়ে লেখেঃ পৃথিবীটা যে কেবল মানুষের নয়, এই লকডাউনের আয়োজনের মধ্য দিয়েই প্রথম যেন বা বুঝতে শেখে মানুষরা। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এই লকডাউনের অশনি সংকেতকে তারা বুঝেটুঝেও ধরে উঠতে পারে না। আনলক হতে না হতেই আবার তারা সভ্যতার নগ্ননৃত্যে মেতে ওঠে এবং অচিরেই ধ্বংসের পথে শামিল হয়। আজ ১০০ বছর পর তারা লুপ্তপ্রায়। পক্ষীসমাজ কতিপয় জীবিত মানুষকে জঙ্গল কনস্ট্রাকশনে কাজে লাগাচ্ছে। তাদের অভয়াশ্রয় দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে দিকে দিকে। কিন্তু, কয়লাহীন, পেট্রোলহীন, গ্যাসহীন এই বিশ্বে মানুষ বড়োই অসহায় আজ। গত ১০০ বছরে পরের পর অতিমারীতে প্রকোপিত হতে হতে, খাঁচাবন্দি থাকতে থাকতে সূর্যের আলো গায়ে নেওয়ার মতো ক্ষমতা তাদের আর নেই। বাঁচার লোভে তারা এতখানি ঘৃণার আশ্রয় নিয়ে ফেলেছে যে, তারা আজ আর ভালবাসাও বোঝে না।

উপসংহারঃ লকডাউন সবে ১ বছর পেরিয়েছে। ১০০ বছর নয়। কাকাতুয়ার পাখিপড়া উপসংহারে উপনীত হওয়ার ইচ্ছে সম্ভবত আমাদের কারওরই নেই। একটু ভাবতে বসা যাক।

Developed by DXDasia