পাক আর্মির গুলি থেকে ভাগ্যক্রমে বেঁচেছিলেন হুমায়ূন

‘ভালোবাসা ও ঘৃণা দুটাই মানুষের চোখে লিখা থাকে!’

শাহানা সিরাজী
হুমায়ুন আহমেদ জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার এবং গীতিকার। বলা হয় আধুনিক বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের তিনি পথিকৃৎ। নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবেও তিনি সমাদৃত। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা তিন শতাধিক। বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি সংলাপপ্রধান নতুন শৈলীর জনক। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে, বেশ কিছু গ্রন্থ স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভূক্ত। সত্তর দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে মৃত্যু অবধি তিনি ছিলেন বাংলা গল্প-উপন্যাসের অপ্রতিদ্বন্দ্বী কারিগর। তাঁর সৃষ্ট হিমু, মিসির আলি ও শুভ্র চরিত্রাবলী বাংলাদেশের যুবকশ্রেণীকে গভীরভাবে উদ্বেলিত করেছে। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীও তাঁর সৃষ্টকর্মের অন্তর্গত। বাংলাদেশে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর জনপ্রিয়তা তিনিই শুরু করেন। তাঁর রচিত প্রথম সায়েন্স ফিকশন ‘‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’’।

তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রসমূহ পেয়েছে অসামান্য দর্শকপ্রিয়তা। তবে তাঁর টেলিভিশন নাটকগুলি ছিল সর্বাধিক জনপ্রিয়। সংখ্যায় বেশী না হলেও তাঁর রচিত গানগুলোও সবিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাঁর অন্যতম উপন্যাস হলো নন্দিত নরকে, মধ্যাহ্ন, জোছনা ও জননীর গল্প, মাতাল হাওয়া ইত্যাদি। তাঁর নির্মিত কয়েকটি চলচ্চিত্র হলো দুই দুয়ারী, শ্রাবণ মেঘের দিন, ঘেঁটুপুত্র কমলা ইত্যাদি।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক হিসাবে দীর্ঘকাল কর্মরত ছিলেন। লেখালিখি এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বার্থে অধ্যাপনা ছেড়ে দেন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তাঁকে আটক করে এবং নির্যাতনের পর হত্যার জন্য গুলি চালায়, ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান।

হুমায়ূন আহমেদ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত নেত্রকোণা মহুকুমার কেন্দুয়ার কুতুবপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শহিদ ফয়জুর রহমান আহমদ এবং মা আয়েশা ফয়েজ। তাঁর পিতা একজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তৎকালীন পিরোজপুর মহকুমার এসডিপিও হিসেবে কর্তব্যরত অবস্থায় শহীদ হন। তিনিও পত্র-পত্রিকায় লেখালিখি করতেন। তাঁর রচিত গ্রন্থ ‘দ্বীপ নেভা যার ঘরে’। তাঁর মা’র লেখালেখির অভ্যাস না-থাকলেও একটি আত্মজীবনী গ্রন্থ রচনা করেছেন যার নাম ‘জীবন যে রকম’। তাঁর অনুজ মুহম্মদ জাফর ইকবাল দেশের একজন বিজ্ঞান শিক্ষক এবং কথাসাহিত্যিক; সর্বকনিষ্ঠ ভাই আহসান হাবীব রম্য সাহিত্যিক এবং কার্টুনিস্ট।

বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন এবং রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। ঢাকা কলেজ থেকে বিজ্ঞানে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন এবং প্রথম শ্রেণীতে বিএসসি (সম্মান) ও এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। মুহসীন হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন এবং ৫৬৪ নং কক্ষে তাঁর ছাত্রজীবন অতিবাহিত করেন। পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার রসায়ন বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি লাভ করেন। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ‘তোমার জন্য ভালোবাসা’ রচনা করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। শিক্ষক হিসেবেও ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন।

‘ভালোবাসা ও ঘৃণা দুটাই মানুষের চোখে লিখা থাকে!’-হুমায়ূন আহমেদ। মানুষের চরিত্র বিশ্লেষণে এর চেয়ে নিখাদ সত্য আর কোথাও দেখিনি। যে মানুষ একজনকে ভালোবাসতে পারে ব্যাকুল হয়ে সে মানুষই আবার তাকেই ঘৃণা করতে পারে তীব্রভাবে। স্থান এবং কাল ভেদে মানুষের এ রূপ পরিবর্তন অলৌকিক কিছু নয় বরং এটাই সত্য। ‘যারে দাও ভালোবাসা তারেই কর ঘৃণা’ গানটির প্রতিধ্বনি মতো কথা কটি বুকের মাঝখানে বিঁধে আছে। মানুষকে চিনতে হলে তার চোখ চিনতে হবে। চোখ কোন কিছুই গোপন করে না।

‘মাঝে মাঝে আত্মার সম্পর্ক রক্তের সম্পর্ককেও অতিক্রম করে’-হুমায়ূন আহমেদ। প্রাত্যহিক জীবনে আপনজন অনেক দূরে থাকে। বিশ্বাস মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য নয়। অর্জন করতে হয়। অবিশ্বাস ধীরে ধীরে বিশ্বাসে পরিণত হয়। স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক রক্তের নয় আত্মার, বন্ধু সম্পর্ক আত্মার, বিশ্বাসের। এ সম্পর্কগুলো এমন হয় রক্তের চেয়েও বেশি। সেখানে ফাটল ধরলে আর কিছুই থাকে না। মূল্যবোধ হারিয়ে যায়। মূলবোধহীন জীবন তো জড়জীবন!

‘‘মিথ্যা বলা মানে আত্মার ক্ষয়। জন্মের সময় মানুষ বিশাল এক আত্মা নিয়ে পৃথিবীতে আসে। মিথ্যা বলতে যখন শুরু করে তখন আত্মার ক্ষয় হতে থাকে। বৃদ্ধ বয়সে দেখা যায়, আত্মার পুরোটাই ক্ষয় হয়ে গেছে।’’- হুমায়ূন আহমেদ। মহানবীর কাছে একবার এক ব্যক্তি এসে আরজ করলেন, তিনি পাপী। পাপমুক্ত হতে চান। নবী তাকে মিথ্যা কথা বলা পরিহার করার পরামর্শ দিলেন। হুমায়ূন সে মিথ্যাকে আত্মার মৃত্যুর কারণ বললেন। মানুষের মৃত্যু দুভাবে হয়। এক তার বিবেক তথা চেতনার মৃত্যুর পর আরেকবার তার দেহান্তরের পর। মূলতঃ চেতনার মৃত্যুই প্রকৃত মৃত্যু। বাকি সময় কেবল প্রাণযুক্ত জড়জীবন। এ জীবন থাকা না থাকা দুটোই সমান। দেশ-রাষ্ট্র-সমাজের জন্য ভারবাহী জীবন।

‘‘মানুষ যখন মৃত্যুর দিকে এগোতে থাকে তখন সে/ ব্যাকুল হয়ে পেছনে তাকায়। আমার মনে হয় তাই/ হয়েছে। সারাক্ষণই শৈশবের কথা মনে পড়ে। কী /অপূর্ব সময়ই না কাটিয়েছি!’’ -হুমায়ূন আহমেদ। আমার দাদীজানকে দেখেছি একা একা পেছনের কথা যাবর কাটছেন। হাতের কাছে পেলে আঁচল ধরে রাখতেন, কিছুতেই ছাড়তেন না। কোন রকমে পড়িমরি করে যখন পালাতাম তখন কাঁদতো আর বলতো, ‘আমারে ছেড়ে যাস না, একদিন তুইও কাউকে পাবি না।’ তারপর নিজে নিজেই পুরোনো কথাগুলো বলতো। এখন বুঝি দাদী আর হুমায়ূনের এ কথা কত খাঁটি। প্রতিদিন পেছনে যাচ্ছে। সে সাথে স্মৃতির মালা বড় হচ্ছে। যেদিন গত হয় সেদিনের জন্য মন ব্যাকুল হয়। কারণ মৃত্যু বুঝি এক দিন এগিয়ে গেল! মানুষ স্মৃতির মাঝেই লুটোপুটি খেলে।

হুমায়ূনকে কেউ কেউ ফেলে দিতে চায়। তার সংলাপধর্মী রচনাকে সাহিত্য হিসেবে গণ্য করতে চায় না। কিন্তু এটা সত্য যে কথাসাহিত্যে তিনিই কিংবদন্তী। চরিত্র বিন্যাস, অল্প কথায় বিশাল বক্তব্য, সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্র শ্লেষ নিক্ষেপ করায় তিনি নিপুণ হস্ত। ‘শুভ্র গেছে বনে’ উপন্যাসে শুভ্রর হারিয়ে যাওয়া, তারপর পিছিয়ে পড়া জনপদকে টেনে তোলার যে প্রচেষ্টা তা সামাজিক দায়বদ্ধতারই ফল। লেখাপড়া শিখলেই শুধু বড় চাকুরে হতে হবে এমন  কোন কথা নেই, চাইলেই যে কোন জায়গা থেকেই মানুষকে স্বপ্ন দেখানো যেতে পারে তা তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন।

বাংলা কথাসাহিত্যে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এক ধরনের সামাজিক চিত্র এঁকেছেন, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহও তৎকালীন সমাজব্যবস্থাকে এঁকেছেন। হুমায়ূনের লেখায় আছে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার মৌলিক কৌণিক দিকগুলো। হিমু চরিত্রের মাধ্যমে একজন আদর্শ মানুষ তৈরী করতে চেয়েছেন। যার ভেতর হিংসা-লোভ-অহংকার থাকবে না। যে কেবল পরোপকারীই হবে। তার অঢেল সম্পদের প্রয়োজন নেই। মানুষকে ভালোবাসার ভেতর রয়েছে ঈশ্বরের আরাধনা। সে যা বলে তা কোন না কোন ভাবে ফলে যাবেই। আসলে মানুষ ভালো কাজ করতে করতে তাঁর বিচক্ষণতা এত সুপারসনিক স্তরে পৌঁছে যায় তখন তার বিবেক সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেই। মিসির আলী আরেকটি রহস্যময় চরিত্র। সে সব কিছুকে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করে। তার মতে প্রকৃতির রহস্য বলে কোন কিছু নেই। সব কিছুই কোন না কোন কারণে ঘটে। এর ভেতর দিয়ে তিনি ভাববাদকে উপেক্ষা করেছেন। এ জগতে কোন কিছুই কারণ ছাড়া ঘটে না। কারণ অনুসন্ধানই মানুষের কাজ। মস্তিষ্ককে কাজে না লাগিয়ে অহেতুক ভয় পেতে তিনি রাজি নন।

নেগেটিভ চরিত্রকে পজেটিভ করতে তিনি সিদ্ধহস্ত। ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকে বাকের ভাই সন্ত্রাসী হওয়া সত্ত্বেও তার জন্য মানুষের হৃদয়ে তৈরী করেছেন ভালোবাসা। আমরা মানুষকে বাইরের অংশে দেখি। প্রতিটি মানুষের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকে একটি অতি মানুষ। যার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই ‘বাকের’ চরিত্রে। এমনি অনেক চরিত্র আছে যা হুমায়ূনকে অমর করে রাখার জন্য যথেষ্ট। যারা তার সৃষ্টিকে উপেক্ষা করতে চায় আসলে তারা নিন্দুক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জীবনে একটি নাতিদীর্ঘ উপন্যাস রচনার মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য জীবনের শুরু। এই উপন্যাসটির নাম ‘নন্দিত নরকে’। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ। তাঁর রচনার প্রধান কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অন্যতম হলো ‘গল্প-সমৃদ্ধি’। এছাড়া তিনি অনায়াসে ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে অতিবাস্তব ঘটনাবলীর অবতারণা করেন যাকে একরূপ যাদু বাস্তবতা হিসেবে গণ্য করা যায়। উপন্যাস দিয়ে একটি শ্রেণিকে কীভাবে মাতাল করে রাখা যায় তা হূমায়ূন দেখিয়ে দিয়েছেন। বই মেলা মানেই হুমায়ূন। তাঁর লেখার ধরণ এমন যে বাবা মা সন্তান একই সাথে কাড়াকাড়ি করে পড়ছে। সুনীলের ‘প্রেম নয় ভালোবাসা’ বইটি পড়ার পর আমি সেল্ফের পেছনে নিয়ে রেখেছি যাতে আমার কিশোর দুছেলের হাতে তখনি না পড়ে। কিন্তু হুমায়ূনের বই আমার ছেলেরা পড়ার পর আমি পড়েছি। তাঁর গল্প ও উপন্যাস সংলাপপ্রধান, বর্ণনা পরিমিত এবং সামান্য পরিসরে কয়েকটি মাত্র বাক্যের মাধ্যমে চরিত্র চিত্রণের অদৃষ্টপূর্ব প্রতিভা তাঁর রয়েছে। সকল রচনাতেই একটি প্রগাঢ় শুভবোধ ক্রিয়াশীল থাকে; ফলে ‘নেতিবাচক’ চরিত্রও তাঁর  লেখনীতে লাভ করে দরদী রূপায়ণ। এ বিষয়ে তিনি মার্কিন লেখক স্টেইনবেক দ্বারা প্রভাবিত। অনেক রচনার মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধির প্রচ্ছাপ লক্ষ্য করা যায়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত উপন্যাস ‘মধ্যাহ্ন’ অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা হিসেবে পরিগণিত। এছাড়া “জোছনা ও জননীর” গল্প আরেকটি বড় মাপের রচনা, যা ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ অবলম্বন করে রচিত। সাধারণত তিনি সমসাময়িক ঘটনাবলী নিয়ে লিখেছেন।

(ঋণ – ‘সন্ধ্যা’)

Developed by DXDasia