খুব ছোট বয়সে রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনালে র, ড়, ঢ়-এর উচ্চারণের ফারাক স্পষ্ট করে দেওয়া সম্ভব
এক
টেলিভিশনে একটি সাবানের বিজ্ঞাপনে শুনতে পাই ‘একটু যদ্ন করতে পারত’। কথাটি শুনতে শুনতে ভাবি নতুন প্রজন্ম এই উচ্চারণই শুনবে। এমন করেই বলবে। আমরা প্রবীণেরা একটু হাসব, কেউবা বলব ‘ওরে শব্দটা হল যত্ন। ত্, ন’। ছোটরা শুনবে। কেউ সঠিক উচ্চারণ করবে। কেউ বা, দ আর ন-ই করে যাবে। রং-এর যত্ন নিয়ে ভাবছি কিন্তু ভাষার যত্ন নিয়ে কতটা ভাবছি?
দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছি। ক্রমাগত শুনে আসছি শিক্ষকদের অনুযোগ, উফ! বানানের কী অবস্থা। কী যে লেখে! আমরা কিন্তু এই সব বানান জানতাম।’ কথাটা ভুল নয়। লেখাপড়া জানা মানুষদের রোজকার ব্যবহারের শব্দ লিখতে বড় একটা ভুল হত না। এখন হয়। নিয়মিত খাতা দেখার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এখন অনেক নামী স্কুলের পড়ুয়ারা অবলীলায় লিখছে ‘যখন’ কে ‘জখন’, ‘যদি’ হয়ে উঠছে ‘জদি’। কেন?
এর উত্তরে বেশিরভাগ মানুষ বলে উঠবেন ‘জ’ আর ‘য’-এর উচ্চারণে কোন পার্থক্য নেই, তাই এই ভুল। কথাটা আপাত দৃষ্টিতে ঠিক। কিন্তু উপায় কী? আমার মতে শিশু বয়স থেকে ছোটরা বই পড়ছে না, বা প্রয়োজনের তুলনায় কম পড়ছে। হাতের লেখা তেমন করে লিখছে না। হাতের লেখা লিখতে বসে শিশু একটা লেখার অংশ দেখে দেখে যখন লেখে, তখন একই সঙ্গে তার দুটো কাজ চলে। এক সে দেখছে, আর দেখার সঙ্গে মাথার স্নায়ুতন্ত্রে চলে তার প্রতিক্রিয়া। আরেকটি দিক হল, সে হাত দিয়ে লিখছে। হাতের পেশিগুলি শব্দের এবং বর্ণের ছবি আঁকছে খাতায়। যা চোখের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে মাথায়। এইভাবে, অবশ্যই এক জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শব্দ, বর্ণ মস্তিষ্কে ঠাঁই নেয়।
বাংলা শব্দমালার কিছু শব্দ তিনটি যুক্ত বর্ণের সমষ্টিতে গড়া, কোনওটি দুটি যুক্ত বর্ণ, কোন যুক্ত বর্ণে একটি আবার ‘সাইলেন্ট’ থাকে, দুটি ন, ই-ঈ-কার তো আছেই। সঙ্গে, শ,ষ,স সমস্যায় ফেলে দেয়। বেশ কিছু ছাত্র-ছাত্রীকে দেখেছি নিয়মিত ড়,র নিয়ে গোলমাল পাকায়।এই শব্দগুলি প্রায় সবই সংস্কৃত শব্দ থেকে এসেছে। এই শব্দকে হাতের মুঠোয় আনা যায়। কেমন করে? শিক্ষকদের সাহায্যেই এই কাজটি করা সহজ হয়ে উঠতে পারে। বারবার রিডিং-এর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শিশুরা বোধ দিয়ে অনুভব করবে, শব্দগুলিকে চিনবে। বানান ভুল কম করবে। একই সঙ্গে, খুব ছোট বয়সে রবীন্দ্রসঙ্গীত (যেমন- ঝড়ে উড়ে যায় গো…, ঝরো ঝরো ঝরো ঝরো ঝরে রঙের ঝরনা…, আবার এসছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে ইত্যাদি) শোনালে র, ড়, ঢ়-এর উচ্চারণের ফারাক স্পষ্ট করে দেওয়া সম্ভব।
এর সঙ্গে মনে হয় ইংরেজির ‘স্পেলবী’-র মতো বাংলা বানান নিয়েও নানা ধরনের প্রতিযোগিতা ব্যবস্থা করলে বাংলা ভাষা এবং বানানেরর প্রতি আগ্রহ বাড়তে পারে।