
পেটে ডিম থাকলেই যে মাছে স্বাদ হবে না, তা নয়
বাজারে গিয়ে ইলিশ কিনছেন সস্তায়। বাড়িতে এনে জমিয়ে রান্নাও করলেন। কিন্তু খাওয়ার সময় বলছেন, এখনকার ইলিশে আর আগের মতো স্বাদ নেই। ইলিশেও এখন ভেজাল। দোকানি হাঁকছেন পদ্মার ইলিশ। কেউ একটু দাম চড়িয়ে বলছেন, এটা কোলাঘাটের ইলিশ। ইলিশের নাম শুনলেই বাঙালির জিভে জল এসে যায়। তার ওপর যদি একবার পদ্মা বা কোলাঘাট তকমা দেওয়া যায় তাহলে বাঙালি একবারও পকেটের চিন্তা করেন না। মাছ রান্নার পর আপনি জিভে দিয়ে বলছেন স্বাদ নেই। আগে মাছের গন্ধ লেগে থাকত হাতে, হাত ধোয়ার পরও গন্ধ থাকত। সত্যিই তো মাছে কেন আগের মতো স্বাদ নেই?
মৎস্যজীবীরা বলছেন, ইলিশ সমুদ্রে ঝাঁকেঝাঁকে আসে। তীর থেকে ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে এদের খোঁজ মেলে, তবে বড় মাছের খোঁজ পেতে গেলে আরেকটু গভীরে যেতে হয়। ট্রলার থেকেই দেখা যায় ঝাঁক। সমু্দ্রের এই এলাকায় জল স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ। ৫০বছর আগে যেখানে ঝাঁকের দেখা মিলত আজও মাছ পাওয়া যায় সেখানে। দুশো থেকে পাঁচশো মিটার জায়গার পরিবর্তন হতে পারে। দোকানিকে জিজ্ঞাসা করলে উত্তর দেবেন এখন সমুদ্রের জলেও ভেজাল। ঠিক যেমনভাবে বলেন, রুই, কাতলায় এখন আর স্বাদ পান? পুকুরে বা ভেড়িতে না হয় বদ্ধ জল, মাছকে দ্রুত বড় করার জন্য রাসায়নিক দিতে হয়। কিন্তু সমুদ্রের জল তো বদ্ধ নয়, তাহলে স্বাদ নেই কেন? ফলে যখন আপনি বাজারে যাচ্ছেন তখন ঠকছেন কিনা একবার ভাবুন। বাজারে গিয়ে মাছ দেখে কিনবেন। আপনি মাছের গায়ে হাত না দিলে ঠকতে পারেন। দোকানি চায় খারাপটা আগে বিক্রি করতে। তাহলে ভাল মাছ চিনবেন কী করে? মনে রাখবেন যে ইলিশের চোখ লাল দোকানি যেন সেটা আপনাকে না দেয়। ভাল মাছের চোখ হবে নীল। চোখের ওপরের অংশ যেন লাল না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন। ইলিশের মুখ যত সরু হবে সেই মাছে তত স্বাদ হবে। দেহ হবে পানের মতো দেখতে। অর্থাৎ ধড় যত চওড়া হবে তত ইলিশে স্বাদ হবে। পেট শুধু পানের মতো চওড়া হলে হবে না, পেটের দিকটা হতে হবে সমতল। পেট যদি সামান্য উঁচু হয় তাহলে সে মাছে ডিম থাকবে।
দিঘা ফিসার্স ম্যান অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক শ্যামসুন্দর মান্না বলছিলেন, পেটে ডিম থাকলেই যে মাছে স্বাদ হবে না তা নয়। তবে আমরা যে মাছ কিনি তার গড় ওজন ৫০০ থেকে ৭৫০ গ্রামের মধ্যে। এ মাছে ডিম থাকলে খেতে তত সুস্বাদু হবে না। এক কিলো থেকে দেড় কিলো ওজনের মাছে ডিম থাকলে স্বাদে খুব একটা তারতম্য হয় না। কিন্তু সে মাছ ভরা মরশুমে প্রায় অমিল। বাজারে গিয়ে মনে রাখবেন, ধড় চওড়া, মুখ সরু, চোখ নীল, পেট সমতল মাছ কিনবেন, ভুল করেও কখনও লম্বা, সরু মাছ কিনবেন না। অনেকে আবার বাজারে গিয়ে কানকো দেখে মাছ কেনেন। মনে রাখবেন ইলিশে কানকো লাল না অন্য রকম এসব দেখে লাভ নেই। ইলিশ খুব স্পর্শকাতর মাছ। জালে ধাক্কা খেলেই মরে যায়, জল থেকে তোলার সময়টুকু পান না মৎস্যজীবীরা। সমুদ্র থেকে ট্রলার ভর্তি মাছ এনে আড়তে রেখে মাছের গায়ে কাঠি ফুটিয়ে ছিদ্র করে দেওয়া হয়। যাতে সারাক্ষণ তার ভেতরে বাতাসের অক্সিজেন ঢুকতে পারে। মাছ পচে না যায়। ফলে কানকোর রং খুব একটা হেরফের হয় না।
আর মনে রাখতে হবে, কোলাঘাটের ইলিশ মনে করে বাজার থেকে ঠকে আসবেন না। ১০/১২ বছর কোলাঘাটের নদীতে ইলিশ আসে না, যদি দু -একটা মাছ ভুল করে ঢুকে পড়ে, জালে পড়ার পর তা বাজার পর্যন্ত এসে পৌঁছায় না। কোলাঘাটের মৎস্যজীবীরাই মাছের সন্ধানে যাচ্ছেন সমুদ্রে। আর বাংলাদেশের বলে যে ইলিশ খাচ্ছেন তা কী সত্যিই পদ্মা থেকে আসা? নাকি এরাজ্যের মাছ, অথবা এদেশের? মনে রাখবেন এখন বাজারে ইলিশের মতো মাছও রয়েছে। ইলিশ কিনতে গিয়ে তাই ঠকে আসবেন না।
