
১৯২৩ সালে স্বামী সারদানন্দ এখানে প্রতিষ্ঠা করেন মাতৃমন্দির
জয়রামবাটি। এক গ্রাম্য ঘরামি চালাতে খড় ছাইছিল। কাজ শেষে সে নেমে এল। মা সারদা বললেন, ‘বাবা অনেক কাজ করেছ এবার একটু খেয়ে নাও।’ ঘরামি বলল – ‘আমি যে মুসলমান!’ সারদা বললেন- ‘আমি সকলের মা।’ মা সারদা ঘরামির কোনো কথা না শুনে তাকে ঘরে বসিয়ে খাওয়ালেন। শুধু তাই নয়, খাবার শেষে তার জায়গাটা অবধি নিজে হাতে মুছলেন।
ভাবলেও অবাক হতে হয়, জয়রামবাটির মত এক প্রত্যন্ত গ্রামে প্রায় শতবর্ষ আগে ধর্মের ছুঁতমার্গকে দূরে সরিয়ে, লোকাচার, শাস্ত্রাচারের তোয়াক্কা না করে সারদাদেবী কিভাবে এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন!
কলকাতা থেকে বাঁকুড়া। প্রায় দুশো কিমি। আর বাঁকুড়া থেকে পঁচাশি কিমি জয়রামবাটি। ১৯২৩ সালে সারদা দেবীর বাসভবনটিতে একটি মঠ নির্মিত হয়, নাম ‘মাতৃমন্দির মঠ, জয়রামবাটী’। এই মাতৃমন্দির মঠ আজ শতবর্ষের পথে। এই মঠের মধ্যে রয়েছে মাতৃমন্দির, মায়ের পুরাতন বাটী ও নূতন বাটী, পুন্যিপুকুর ও সুন্দরনারায়ণ ধর্মঠাকুরের মন্দির।
‘মাতৃমন্দির’ হল মাতৃমন্দির মঠের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত সারদা মা'র মন্দির। ঠিক যে স্থানটিতে সারদা দেবীর জন্ম হয়, সেই স্থানটির উপর এই মন্দিরটি নির্মিত হয়। সারদা দেবীর আদি বাড়িটি ছিল এই জমির ওপর। সেই বাড়িতে তিনি নয় বছর বয়স পর্যন্ত বাস করেছিলেন। এখানেই তাঁর সাথে বিবাহ হয় শ্রীরামকৃষ্ণের।
আরও পড়ুন
যে মন্দিরে পূজিতা হন এক রাক্ষসী
১৯২৩ সালের ১৯ এপ্রিল অক্ষয় তৃতীয়ার দিন স্বামী সারদানন্দ মাতৃমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে মন্দিরে সারদা দেবীর একটি তৈলচিত্র পূজা করা হত। ছবিটি সারদা দেবীর শিষ্য ললিত চট্টোপাধ্যায় লন্ডন থেকে আঁকিয়ে এনেছিলেন। শোনা যায়, সারদা দেবী নিজেও সেই ছবিটি পূজা করেছিলেন। ১৯৫৪ সালে সারদা দেবীর জন্মশতবর্ষ অনুষ্ঠান উদযাপনের সময় ছবির পরিবর্তে একটি শ্বেতপাথরের মূর্তি স্থাপিত হয়। ছবিটি এখন বেলুড় মঠের রামকৃষ্ণ সংগ্রহশালায় রাখা আছে। বর্তমানে পূজিত শ্বেতপাথরের মূর্তিটির তলায় সারদা দেবীর দেহাবশেষ রক্ষিত আছে। মন্দিরের সামনের প্রার্থনা কক্ষটিও সারদা দেবীর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে নির্মিত হয়। মাতৃমন্দিরের চূড়ায় বাংলায় লেখা রয়েছে ‘মা’ শব্দটি, আর দেখা যায় একটি পতাকা সবসময় উড়ছে।
মাতৃমন্দির মঠের প্রধান প্রবেশদ্বারের বাঁদিকে ‘মায়ের পুরাতন বাটী’। সারদা দেবীর পুরনো বাড়ি। ১৯১৫ সাল পর্যন্ত সারদা দেবী এই বাড়িতে বাস করেছিলেন। এখানে অনেক গৃহী, ব্রহ্মচারী ও সন্ন্যাসী ভক্ত তাঁর কাছ থেকে দীক্ষা নিয়েছিলেন।
মাতৃমন্দির মঠে অবস্থিত সারদা দেবীর নতুন বাড়ি ‘মায়ের নূতন বাটী’ নামে পরিচিত। মঠের প্রধান প্রবেশদ্বারের পাশে একটি ছোটো দরজা দিয়ে নতুন বাড়িতে প্রবেশ করা যায়। এই অংশে অনেকগুলি ঘর দেখা যায়। এর মধ্যে বাঁদিকের প্রথম ঘরটিতে সারদা দেবী ১৯১৫ সালের মে মাস থেকে ১৯২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত বাস করেন। এই ঘরেও অনেক গৃহী, ব্রহ্মচারী ও সন্ন্যাসী ভক্ত তাঁর কাছ থেকে দীক্ষা নিয়েছিলেন। পাশের ঘরটিতে সারদা দেবীর ভ্রাতুষ্পুত্রী নলিনী দেবী বাস করতেন। নলিনী দেবীর ঘরের উল্টোদিকের ঘরটিতে সারদা দেবীর জীবদ্দশায় জগদ্ধাত্রী পূজা অনুষ্ঠিত হত।
মাতৃমন্দিরের উল্টোদিকে রয়েছে পুন্যিপুকুর। এই পুকুরের জল সারদা দেবী ব্যবহার করতেন। তাই তাঁর ভক্তদের কাছে এটি অত্যন্ত পবিত্র। পুন্যিপুকুরের পাশে একটি ছোটো ঘরে সারদা দেবীর গৃহদেবতা সুন্দরনারায়ণ ধর্মঠাকুর পূজিত হন। এক সময় এখানে শীতলা ও শালগ্রাম শিলা পূজার রেওয়াজ ছিল। পরে এই মন্দিরে আরও কিছু দেবদেবীর মূর্তি ও ছবি স্থাপন করা হয়।
(ঋণ: বেলুড় মঠ, শ্রী শ্রী মাতৃমন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন সারদা সেবাশ্রম, জয়রামবাটি, বেদান্ত সোসাইটি)
